শীর্ষ বন্দ্যোপাধ্যায়—ভারতের মতো একটা আধা রক্ষণশীল দেশ থেকে বিদেশে যাওয়ার পর নানা ব্যাপারেই সাংস্কৃতিক ধাক্কা লাগে। ‘‌কালচারাল শক’‌। কিন্তু সমকামীদের ওই সোচ্চার উপস্থিতি, প্রকাশ্যে তাঁদের ওই সমবেত উচ্ছ্বাস রীতিমতো চৈতন্যে ধাক্কা লাগিয়েছিল ১৯৯৮ সালের সেই গ্রীষ্মে।
ক্রিস্টোফার স্ট্রিট ডে প্যারেড। যার আসল দিনটা ২৮ জুন। নিউ ইয়র্ক–ম্যানহাটানের গ্রিনউইচ ভিলেজে, ক্রিস্টোফার স্ট্রিটের ওপর স্টোনওয়াল ইন নামে এক পানশালায় সমকামীদের সঙ্গে নিউ ইয়র্ক পুলিসের ধুন্ধুমার মারপিট বেধেছিল ১৯৬৯ সালের যে দিন। সেই প্রথম আমেরিকায় নিজেদের অধিকারের দাবিতে মারমুখী হয়ে উঠেছিলেন সমকামীরা। খুব কম রেস্তোরাঁ–পানশালা ছিল তখন নিউ ইয়র্ক শহরে, যেখানে ঢুকতে দেওয়া হত সমকামীদের। স্কুল–কলেজে সমকামীরা পড়ার সুযোগ পেতেন না। কোনওমতে পড়াশোনা করলেও খুব কম চাকরি রাখা থাকত তঁাদের জন্য। যঁারা ঘোষিত সমকামী, প্রকাশ্যে সেই পরিচয় জানান দিতে চান, তঁাদের ব্যাপারে ঘোর অসহিষ্ণু ছিল হোমোফোবিয়ায় আক্রান্ত মার্কিন সমাজ। এবং পুলিসও নিয়মিত হানা দিত সমকামীদের গোপন আড্ডাগুলোয়। প্রথমে একধারসে পিটিয়ে হাতের সুখ করত। তার পর ধরপাকড়, জেল–জরিমানা। কিন্তু ওই দিন, ১৯৬৯ সালের ২৮ জুন হঠাৎই ধৈর্য হারিয়েছিলেন সমকামীরা। পাল্টা মার দিতে শুরু করেছিলেন। 
কুখ্যাত ওই স্টোনওয়াল ইন দাঙ্গাই ছিল সেই স্ফুলিঙ্গ, যা থেকে বিশ্ব জুড়ে সমকামীদের সমান অধিকারের দাবিতে আন্দোলনের আগুন ছড়াতে শুরু করে। ১৯৭০ সালের ২৮ জুন, বর্ষপূর্তির দিন ক্রিস্টোফার স্ট্রিট লিবারেশন ডে প্যারেড হয় নিউ ইয়র্কের রাস্তায়। ক্রমশ সেই মুক্তির উদ্‌যাপন ছড়ায় আমেরিকার অন্যত্র, ইউরোপেও। দু’‌দশক পর জার্মানির বার্লিন, হামবুর্গ, কোলন শহরে ক্রিস্টোফার স্ট্রিট ডে রীতিমতো এক উৎসবের দিন। ততদিনে ‘‌এলজিবিটি’‌ এক পরিচিত এবং জনপ্রিয় শব্দ। শুধুই সমকামী নয়, তঁাদের মধ্যেও যে ভিন্নতা এবং বৈচিত্র্য আছে, তারও স্বীকৃতি। লেসবিয়ান, গে, বাই–সেক্সুয়াল এবং ট্রান্সজেন্ডার। নারী এবং পুরুষ ছাড়াও যঁারা উভকামী এবং রূপান্তরকামী, তঁারাও তখন এক ছাতার তলায়। ক্রিস্টোফার ডে–র মিছিল তঁাদের সবার আত্মপরিচয় ঘোষণার দিন। এমন নয় যে, বছরের বাকি দিনগুলো ওঁরা মুখ লুকিয়ে থাকেন। ওঁদের বাড়ির লোক জানে, পাড়া–প্রতিবেশী জানে, সহপাঠী বা সহকর্মীরা জানে। বিশ শতকের শেষভাগে পৌঁছে তখন আর ওঁদের মুখ লুকিয়ে থাকতে হয় না। রাস্তাঘাটে হামেশাই চোখে পড়ে— দুই পুরুষ বন্ধু হাতে হাত ধরে, বা গলা জড়িয়ে হঁাটছে। অথবা দুই নারী মাঝরাস্তায় দুনিয়া ভুলে গভীর চুম্বনে মত্ত। ভালবাসা যে লিঙ্গবৈষম্য–নিরপেক্ষ, সেই সহজ সত্যিটায় ততদিনে অভ্যেস হয়ে গেছে।
তার পরেও ’‌৯৮ সালের সেই জুলাইয়ের দুপুরে কোলন শহরে ক্রিস্টোফার স্ট্রিট ডে প্যারেড শুরুতেই সাংস্কৃতিক ঝটকা দিয়েছিল। যে কোনও মিছিলের মতো সেই মিছিলের শুরুতেও ছিল একখানা পুলিসের গাড়ি। তার চালকের আসনে বসে দাড়ি–গেঁাফওয়ালা যে দশাসই পুলিসকর্মী, তঁার ঊর্ধ্বাঙ্গে মহিলাদের অন্তর্বাস, ঠেঁাটে চড়া লিপস্টিক!‌ আর তঁার ঠিক পাশেই সিটের ওপর পা ফঁাক করে দঁাড়িয়ে যে সুন্দরী, তঁার মাথার পুলিসের টুপি এবং হঁাটু অবধি উঁচু বুট দেখে মনে হচ্ছে তিনি পুলিস, কিন্তু তিনিও অন্তর্বাস পরে আছেন!‌ আর তঁার ঠিক পেছনে হাসিমুখে যে মহিলা পুংদণ্ড–সদৃশ বিশাল বেলুনটি নাড়িয়ে যাচ্ছেন সোৎসাহে, তাঁর পরনে জার্মান পুলিসের গাঢ় সবুজ প্যান্ট, কোমর থেকে ঝুলছে বন্দুক, ব্যাটন, হাতকড়া। কিন্তু ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত তঁার। এমনকি কোনও ভানও নেই সেই নগ্নতা ঢাকা দেওয়ার!‌ বিস্ময় কাটতে না কাটতেই গাড়ির পেছনে হেঁটে আসা এক সার পুলিসকর্মী। প্রত্যেকেই পুরোদস্তুর উর্দি পরা। কিন্তু দুই মহিলা পুলিস হঁাটতে হঁাটতেই ক্ষণে ক্ষণে চুমু খাচ্ছেন একে অন্যকে। দুই পুরুষ পুলিসকর্মী এমনভাবে পরস্পরের কোমর জড়িয়ে ধরে হঁাটছেন, যেন সদ্য প্রেমে পড়েছেন!‌
এরা নিশ্চয়ই পুলিস সেজেছে?‌ প্রশ্ন করেছিলাম সঙ্গী সহকর্মীকে, যিনি আমাকে সেদিনের ওই প্যারেড দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। খুব অবাক হয়ে তিনি জবাব দিয়েছিলেন, সাজবে কেন!‌ ওরা সবাই সত্যি পুলিস!‌ না হলে এভাবে উর্দি পরে হঁাটতে পারে নাকি!‌
কিন্তু পুলিসরা এভাবে, মানে এরকম প্রকাশ্যে, মানে.‌.‌.‌ আমার প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন কী বলতে চাইছি। একগাল হেসে বলেছিলেন, আজকের দিনের সেটাই তো শেষ কথা। আমি পুলিস হই বা সরকারি আমলা, মন্ত্রী হই বা পাড়ার মাতব্বর, তার সঙ্গে আমার যৌনতার কোনও সম্পর্ক নেই। আমার জীবন, আমার যৌনতা একান্তভাবেই আমার পছন্দ। আমার ব্যাপার। সেখানে সমাজ বা রাষ্ট্রের কোনও খবরদারি থাকতে পারে না। তার পর সেই সহকর্মী আঙুল তুলে দেখিয়েছিলেন, ওই যে দমকলকর্মীরা আসছেন, তঁাদের পেছনেই যে সেনাকর্মীরা, ওঁরা সবাই কিন্তু ঘোষিত সমকামী। পেশাগত পরিচয়ের সঙ্গে ওঁদের লিঙ্গ পছন্দের যে কোনও সম্পর্ক নেই, থাকার কথাও নয়, সেটা মনে করিয়ে দিতেই আজকের দিনে ওঁরা এই মিছিলে শামিল।
এর পর ২০০২ সাল। কলকাতা। সেই বছরই প্রথম এই শহরে ক্রিস্টোফার স্ট্রিট ডে–র মিছিল হবে। কোরিওগ্রাফার সুদর্শন চক্রবর্তী এলজিবিটি সম্প্রদায়ের কথা তুলে ধরতে ‘‌এলিয়েন ফ্লাওয়ার’‌ নামে যে নৃত্যনাট্য সাজিয়েছেন, তা মঞ্চস্থ হবে জ্ঞান মঞ্চে। তার আগে ছোট করে মিছিল, আলোচনাসভা, নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া। জার্মান রেডিও ‘‌ডয়চে ভেলে’র সাংবাদিক হিসেবে সেই অনুষ্ঠান কভার করতে গিয়ে আলাপ হল একটি ছেলের সঙ্গে। দৃশ্যতই ‘‌এফিমিনেট’‌ সে। হাবভাব, কথাবার্তা, হাত–পা নাড়ায় ভয়ঙ্কর ‘‌মেয়েলি’‌, কিন্তু কী অসম্ভব সপ্রতিভ, কী তুখোড় কথাবার্তা। কেন কলকাতাতেও এই ক্রিস্টোফার স্ট্রিট ডে উদ্‌যাপন দরকার, এখানেও কেন সমকামীদের, রূপান্তরকামীদের অন্য লিঙ্গ পরিচয়ের স্বীকৃতি জরুরি, অসম্ভব ভাল বোঝাল সে। তা হলে রেডিওর জন্যে একটা সাক্ষাৎকার রেকর্ড করে নিই?‌ না। রেকর্ডার বের করার আগেই হাত চেপে ধরল ছেলেটি। নিজের পরিচয় দিয়ে, নিজের গলায় কিছু রেকর্ড করতে তার আপত্তি আছে। অসম্ভব হতাশ হয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, যদি এই সঙ্কোচ কাটিয়ে না উঠতে পারে এই শহরের সমকামী সম্প্রদায়, তা হলে এই উদ্‌যাপনে কী লাভ!
সেই আড়ষ্টতা কিন্তু ক্রমশ কেটেছে। প্রতিটা মুহূর্তে সংশয়ের খোলস ছেড়ে বেরিয়েছেন সমকামী, রূপান্তরকামীরা। সমাজ–জীবনের মূল স্রোতে মিশেছেন, আত্মপরিচয় নিয়েই মাথা উঁচু করে বেঁচেছেন। পছন্দের পেশায় নিজেদের যোগ্যতাতেই সুযোগ পেয়েছেন। এখন আর ওঁদের দেখলে সমাজের ততটা ‘‌খারাপ’‌ লাগে না। সর্বোচ্চ আদালতের এই রায়, সমকামিতাকে অপরাধের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত আসলে ওই সব ছোট–ছোট অর্জনকেই বৈধতা দিল। সুদর্শন চক্রবর্তীকে মেসেজ করলাম— এলিয়েন ফ্লাওয়ার তা হলে আর বিশ্বসংসার–বহির্ভূত থাকল না!‌ সুদর্শনের উচ্ছ্বসিত জবাব— ভাবিনি বেঁচে থাকতে এই দিনটা দেখে যাব!‌ তবে আমাদের প্রজন্ম কিন্তু এটা সম্ভব করল শেষ পর্যন্ত। আমাদের প্রজন্ম, যারা হারতে শেখেনি!

জনপ্রিয়

Back To Top