সিদ্ধার্থ জোয়ারদার: পরীক্ষায় ভাল ফল করতে একজন পড়ুয়ার দরকার ভাল পড়াশুনার মাধ্যমে এক ফলপ্রসূ মানসিক প্রস্তুতি। এই সময়ে অমূলক মানসিক ভীতি বা ‘‌টেনশন’‌ নয়, প্রয়োজন অল্পবিস্তর পরীক্ষাজনিত উৎকণ্ঠার। এতে পরীক্ষা দেওয়ার আগ্রহ যেমন বাড়ে, তেমনই পড়ুয়ার ‘‌পারফরমেন্স’‌ ভাল হয়। করোনা ভাইরাস সংক্রমণ মোকাবিলায় জয়ী হতে হলেও চাই সমাজের সব অংশের মানুষের সমষ্টিগত কিছু বিজ্ঞানভিত্তিক কার্যকলাপ। অযথা ভীত–সন্ত্রস্ত না হয়ে স্বাস্থ্য সচেতন হওয়া। সাবধানতার সঙ্গে নিজের কিছু কাজকর্মকে নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করা।
বর্তমান সময়ে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ–এর মতো কিছু সামাজিক গণমাধ্যমের দৌলতে আমরা বিনা কারণেই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছি। অনেককেই দিশাহারা হয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ অতি সক্রিয়তা দেখাচ্ছেন। কোনও কোনও সময়ে বিরক্তিকর পরিস্থিতিও তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীল গণমাধ্যমগুলোর সামাজিক দায়বদ্ধতা পালন একান্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। ব্যক্তিগত ও সামাজিক স্তর অতিক্রম করে আতঙ্ক এখন জাতীয় তথা আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে গেছে।
আমাদের মধ্যে যে ভ্রান্ত ধারণাগুলো এই ব্যাপারে রয়েছে, তা নিরসন করা দরকার। প্রথমত, খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে মোটেই চিন্তিত হবার প্রয়োজন নেই। কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই। নিজেদের খাদ্যাভ্যাস অনুযায়ী যেভাবে রান্না করে (‌সাধারণত ফুটিয়ে ও সেদ্ধ করে)‌ বাড়িতে খাই, সেভাবেই খাব। মুরগি বা অন্য কোনও প্রাণীর মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায় না। তাই নিশ্চিন্তে মাংস ও ডিম চলতে পারে। প্রাণীজ প্রোটিন যেহেতু রোগ প্রতিরোধী সক্ষমতার জন্য জরুরি, আতঙ্কিত হয়ে আমিষ খাওয়া বন্ধ করে দেওয়া একেবারেই যুক্তিযুক্ত নয়।
দ্বিতীয়ত, সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা অভ্যেসে পরিণত করতে হবে। শুধু করোনা ভাইরাস নয়, যে কোনও রোগ–জীবাণু প্রতিহত করার এটাই দাওয়াই। পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন থাকা, নাকে–মুখে অকারণে হাত না দেওয়া এবং হাত ধুয়ে খাবার খাওয়ার অভ্যাস তো প্রত্যেকের ক্ষেত্রে সারা জীবনের জন্য দরকার। অভ্যেস করতে হবে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে খাবার খাওয়ার। এতে জীবাণু–ঘটিত পেটের রোগ থেকে বাঁচা যাবে।
করোনা ভাইরাস যেহেতু আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি, সর্দি থেকে ছড়ায় (‌পরিভাষায় ‘‌ড্রপলেট ইনফেকশন’‌)‌, তাই এ ব্যাপারে বেশি সতর্কতা প্রয়োজন। ভাইরাস সমন্বিত জলকণা বেশি দূরে যেতে পারে না। যায় মাত্র ১–২ মিটার পর্যন্ত। তাই আক্রান্ত ব্যক্তির থেকে চেয়ার, দরজার হাতলের মতো কোনও অজৈব বস্তুর ওপর সহজেই পড়ে যায়। আর জলকণায় অবস্থিত ভাইরাস এই জিনিসগুলোর ওপরের স্তরে বেশ কয়েক ঘণ্টা, এমনকি দুই দিন পর্যন্ত অক্ষত অবস্থায় থেকে যায়। ভাইরাস শরীরের কোষের বাইরে এই রকম নির্জীব অবস্থায় থাকতে পারে। পরবর্তীতে সজীব কোষের সংস্পর্শে সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং কোষের ভিতরে ঢুকে সজীবতা দেখায় ও নিজের অপত্য তৈরির জন্য প্রস্তুত হয়। অর্থাৎ, অজৈব পদার্থের ওপরের স্তর থেকে এই ভাইরাস হাত, রুমাল বা কাপড়ের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
করোনা ভাইরাস অন্যান্য ভাইরাসের মতোই প্রোটিনের একটি কণা মাত্র। এক একটি ভাইরাসকে পরিভাষায় ‘‌ভিরিয়ন পার্টিকল’‌ বলে। এই ভিরিয়ন–এর দেহটি অত্যন্ত সরল। প্রোটিন খোলকের মধ্যে রয়েছে একখণ্ড রাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড বা আরএনএ। আর খোলকের বাইরে স্নেহ পদার্থের একটি চাদর। খোলকের বাইরের দিকে বেরিয়ে আছে পেরেকের মতো ‘‌স্পাইক’‌ প্রোটিন।
সাবান–জলে হাত ধুলে হাতের তালুর ওপর স্তরে থাকা ভাইরাস কণাগুলো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় ভেঙে যায়। এভাবে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তা আর সংক্রামক থাকে না। ইথাইল অ্যালকোহল দ্রবণেও (‌কমপক্ষে ৭০%‌)‌ এই কণা বিনষ্ট হয়। অ্যালকোহলযুক্ত ‘‌হ্যান্ড–রাব’‌ (‌স্যানিটাইজার)‌ ব্যবহার করার উদ্দেশ্য এটিই। ভাইরাস সংক্রমণ রুখতে বারবার সাবান–জলে হাত পরিষ্কার করার কথা বলা হচ্ছে। হাত ধোয়ায় বাতিকগ্রস্ত না হয়ে প্রয়োজনমতো হাত ধোয়ার অভ্যাস অনেকাংশে ভাল। অতিরিক্ত স্যানিটাইজারের ব্যবহারে হাতের ওপরের স্তর শুষ্ক হয়ে খসখসে হয়ে পড়তে পারে। সেটা লক্ষ্য রাখা দরকার।
তৃতীয়ত, করোনা ভাইরাস প্রতিরোধের জন্য সুস্থ সাধারণ মানুষের মাস্ক পরার কোনও প্রয়োজন নেই। রোগ ছড়ানো ঠেকাতে করোনা ভাইরাস আক্রান্ত মানুষের মাস্ক পরা একান্ত জরুরি। হাসপাতালে থাকাকালীন অসুস্থ মানুষের পরিষেবায় যুক্ত ডাক্তার, নার্স ও অন্য স্বাস্থ্যকর্মীদেরও মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক। তবে সেটি কাপড়ের তৈরি অথবা সার্জিক্যাল মাস্ক নয়, কেবলমাত্র আমেরিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ অকুপেশনাল হেল্‌থ অনুমোদিত ‘‌এন–৯৫’‌ অথবা ইওরোপীয় ইউনিয়ন অনুমোদিত ‘‌এফএফপি–২’‌ মাস্ক।
জেনে রাখা ভাল, এইরকম মাস্ক পরা–খোলা ও ব্যবহারের বিশেষ নিয়ম আছে। এইক্ষেত্রে সেই বিধি মানা জরুরি। এককথায় এই যে, সুস্থ সাধারণ মানুষ কাপড়ের তৈরি মাস্ক, সার্জিক্যাল মাস্ক বা নিদেনপক্ষে ‘‌এন–৯৫’‌ মাস্ক কেনার জন্য দোকানে দোকানে ছুটছেন এবং কালোবাজারির শিকার হচ্ছেন, তা একেবারেই অনুচিত। তবে পরিবেশের ধোঁয়া, ধুলো–বালি, ফুলের রেণু (‌পড়ুন, অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী পোলেন)‌ থেকে বাঁচতে কাপড়ের মাস্ক পরা যেতেই পারে।
স্বাস্থ্য বিষয়ক সঠিক তথ্য জেনে ও বিধি অনুসরণ করে তা নিজেদের দৈনন্দিন অভ্যাসে রপ্ত করতে পারলে আমরা অনেক রোগ–সংক্রমণকেই এড়াতে পারব। ভুললে চলবে না, প্রত্যেক ভারতীয়কে যক্ষ্মা, জলাতঙ্ক, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গি, ভাইরাল ডায়ারিয়ার মতো মারণক্ষম রোগের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত লড়তে হচ্ছে। এই সমস্ত রোগের প্রাণঘাতী ক্ষমতা বর্তমান করোনা ভাইরাস সংক্রমণের থেকে বহুগুণ বেশি। তাই অযথা আতঙ্কিত না হয়ে সাবধানতা বজায় রাখুন। বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে নিজেকে সুস্থ রাখার নিয়মগুলোকে অভ্যাসে পরিণত করুন ও তা সারা জীবন মেনে চলুন। ত্রস্ত না হয়ে সুস্থ হয়ে বাঁচুন।
(‌লেখক ‌ভাইরাস বিশেষজ্ঞ ও অধ্যাপক, পশ্চিমবঙ্গ প্রাণী ও মৎস্যবিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়)‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top