শান্তনু বসু: বিগত একশো বছরে কেরলে এই ধরনের বৃষ্টিপাত ও বন্যা দেখেনি। ভারতীয় আবহ দপ্তরের হিসেবে ১ জুন থেকে ১৬ আগস্টের মধ্যে কেরলে সঞ্চিত বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ২২২২.‌৭ মিলিমিটার, যা স্বাভাবিকের থেকে শতকরা ৩৭.‌৪৯ ভাগ বেশি। কিন্তু বৃষ্টিপাত যদি শতকরা ১৯ ভাগ বেশি বা কম হয়, তাহলেও সেটাকে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত বলা চলে।
মধ্য কেরলের ইড্ডুকিতে সঞ্চিত বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৩২১১ মিলিমিটার অর্থাৎ শতকরা ৮৩.‌৫৯ ভাগ বেশি। এর্নাকুলাম, পালাক্কাড, তিরুবন্তপুরম, কোল্লাম, কোট্টায়াম, মালাঙ্গরমে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের চেয়ে শতকরা ৪০ ভাগ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। ইসরোর প্রাক্তন চেয়ারম্যান জি মাধবন নায়ার বলেছেন, যে বৃষ্টিপাত কেরলে হয়েছে, সেটা এককথায় অভূতপূর্ব এবং এশিয়ার বৃহত্তম ধনুকাকৃতি বঁাধ ইড্ডুকি তার ৫টি শাটার বা গেটকে খুলে দিতে বাধ্য হয় এবং প্রতি সেকেন্ডে ৮০ লক্ষ লিটার জলকে বার করে দেওয়ার জন্য। যে কারণে নিম্ন অববাহিকাও ভীষণ ভাবে প্লাবিত হয়ে যায়। এই বন্যার একমাত্র তুলনা হয়েছে ১৯২৪–‌এর ভয়ঙ্করতম বন্যার সঙ্গে। তখন কেরল আলাদা রাজ্য হিসাবে স্বীকৃতি পায়নি। গোটা পেরিয়ার নদী সমগ্র কেরলকেই ভাসিয়ে দিয়েছিল, কারণ তখন প্রতি সেকেন্ডে ১৮০০ কিউবিক মিটার জল ছাড়া হচ্ছিল। এবারের বন্যায় ৮০টি বঁাধের গেটগুলোকে খুলে দেওয়া হয়েছিল। এই ভয়ানক তথ্য দিয়েও বোঝা যেতে পারে যে, কী ভয়ঙ্কর বৃষ্টিপাত কেরলকে আঘাত করেছে। মালামপুঝা বঁাধের গেট খুলে দেওয়ায় পালাক্কাড জেলার বিস্তীর্ণ অংশ জলে ডুবে যায়। তাছাড়া চুল্লিয়াড়, ওয়ালিয়ার বঁাধও খুলে দেওয়া হয়েছে। শুকিয়ে যাওয়া ভরতপুঝার জলও বিপদসীমার ওপর দিয়ে বয়ে চলেছিল। নীলগিরির ভবানী নদীর বঁাধ আটকে রাখায় সেখানে আবার বন্যা দেখা দেয়। বঁাধ খুললেও, নিম্ন অববাহিকায় বন্যা বঁাধ আটকালেও উল্টোদিকের জনপদে বন্যা।
ইড্ডুকিতে অবিশ্রাম বৃষ্টিপাতের কারণে চেরুথানি বঁাধের মোট ৫টি গেটই খুলে দেওয়া হয়েছিল। প্রথমে ৬০০ কিউবিক মিলিয়ন প্রতি সেকেন্ডে জল ছাড়া হয়েছিল। বৃষ্টিপাতের তীব্রতার সঙ্গে সঙ্গে সেটাকে বাড়িয়ে ৭০০ কিউবিক মিলিয়ন প্রতি সেকেন্ডে নিয়ে যাওয়া হয়।
১৪ আগস্টের আগের রাত্রে জলস্তর মুল্লা পেরিয়ারে ১৩৬ ফুট উচ্চতায় পৌঁছনোর পর বঁাধের নিম্ন অববাহিকায় বাসিন্দাদের সতর্ক করা হয়। কিন্তু গত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে বঁাধের জলস্তর বেড়ে যায় ১৩৫.‌৪০ ফুট থেকে ১৩৭ ফুটে। আর এই বঁাধের সর্বোচ্চ জলধারণ ক্ষমতা ১৫২ ফুট পর্যন্ত। তার পরই এখান থেকে ইড্ডুকির ধনুকাকৃতি বঁাধে জল ছাড়া শুরু হয়। মুল্লাপেরিয়ার বঁাধের জলধারণ ক্ষমতা এবং জল ছাড়া নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক দেখা দিয়েছে। জলস্তর ১৩৬ ফুটে পৌঁছনোর পরেই প্রতি সেকেন্ডে ২২০০ কিউবিক ফুট করে জল ছাড়া হতে থাকে। আর বঁাধে জল জমা হতে থাকে ৪৪১৯ কিউবিক ফুট করে। মাত্তুপেত্তি বঁাধ থেকে মুথিরপুঝা নদীর জল ছাড়বার পরপরই মুন্নার শহর জলে ভেসে যেতে থাকে।
এই অবিশ্রান্ত বৃষ্টিপাতে পেরিয়ার নদীর ওপর মুল্লাপেরিয়ার বঁাধের গঠনগত নিরাপত্তা নিয়েই প্রশ্ন উঠে যায় যে, ১৪২–‌১৪৩ ফুট জলস্তরের উচ্চতা সে সহ্য করতে পারবে কিনা। ১৮৮৭ সালে তৈরি ১৭৩ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট এই বঁাধকে শুধু এশিয়াতেই নয়, গোটা বিশ্বেই এক আশ্চর্য দ্রষ্টব্য বলে ধরা হয়। কেরল রাজ্য গঠনের পর পূর্ব দিকের তামিলনাড়ুতে ভাইগাই নদীতে এর জলপ্রবাহকে নিয়ে যাওয়া হয়। ১৮৮৬ সালে ব্রিটিশ মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি এবং ত্রাভাঙ্কর রাজ্যের মধ্যে এক চুক্তি সম্পাদনের পর এটা ঠিক হয় যে, দক্ষিণ মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির স্থায়ী খরাকে মোকাবিলা করার জন্য এক জলকে সেই দিকেই নিয়ে যাওয়া হবে এবং কেরলে এই বঁাধটা অবস্থিত হলেও, তামিলনাড়ুই এই বঁাধের ‘‌মালিক’‌। ১৭৩ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট এই বঁাধের সর্বোচ্চ জলধারণের ক্ষমতা ১৫২ ফুট। তড়িঘড়ি করে এই জলস্তরকে ১৪২ ফুট এবং শেষে ১৩৬ ফুটে নামিয়ে আনা হয়। কিন্তু কেরল বন্যার হাত থেকে সামান্য বঁাচবার জন্য ১৩৬ ফুটে জলস্তরকে নিয়ে যাওয়ার জন্য চাপাচাপি করতে থাকে অর্থাৎ কিছুটা জল যেন তামিলনাড়ু নিয়ে নেয়। অথচ তামিলনাড়ুর শঁাখের করাত;‌ জল বেশি ছাড়লে দক্ষিণ তামিলনাড়ু ভেসে যাবে, আবার জল আটকে রাখলে বঁাধের নিরাপত্তা ক্ষুণ্ণ হবে। এই দুই প্রশ্নের সমাধানের জন্য কেরল সুপ্রিম কোর্টের শরণাপন্ন হয়। এটা ইতিহাসের এক নির্মম পরিহাস যে, বিগত দেড় যুগে তামিলনাড়ু, কর্ণাটক, কেরল কাবেরীর জলবণ্টন নিয়ে শুধু যে সুপ্রিম কোর্টেরই বারবার শরণাপন্ন হয়েছে তাই নয়, কর্ণাটক এবং তামিলনাড়ু একাধিকবার রক্তক্ষয়ী সঙ্ঘর্ষেও লিপ্ত হয়েছে। এখন কেরল বলছে বঁাধের শাটার বন্ধ করে জল ছাড়া থামাও। আবার জল যদি ধরে রাখা হয় অর্থাৎ স্লুইস গেট বা শাটার যদি নামানো হয়, তখন জলস্তর উচ্চতর হয়ে যাবে, সেক্ষেত্রে বঁাধের নিরাপত্তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। বঁাধ যদি সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সেটা হবে এক প্রলয়ঙ্করী ঘটনা যা কেরলের পক্ষে বা গোটা ভারতের পক্ষে চিন্তা করাও বিপজ্জনক। এই মুল্লাপেরিয়ার বঁাধ নিয়ে কেরল দীর্ঘদিন থেকেই তার উদ্বোগ জানিয়ে এসেছে। তার মধ্যে একটি বক্তব্য হল— নিম্ন অববাহিকায় আরও একটি বঁাধ তৈরি করা। এখন ব্রিটিশের প্রযুক্তি অনুসরণ করে অথবা আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগ করে বঁাধ নির্মাণ কার্যত অসম্ভব, কারণটা মূলত আর্থিক।
কেরলে যেভাবে ৮০টি বঁাধ থেকে জল ছেড়ে কেরলকে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাতে বঁাধের যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। বিগত এক যুগে কেরল, তামিলনাড়ু, কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা ভয়ানক গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কবলে। কৃষ্ণা, কাবেরী, গোদাবরী, পেরিয়ার, ইড্ডুকি, ভাইগাই প্রভৃতি নদীতে জল বলে আর কিছুই নেই। নদীগুলি শুকোতে শুকোতে এবং নদীর বুকে চড়া পড়তে পড়তে নদী এবং নদীর পাড় প্রায় একই উচ্চতায় পৌঁছে গেছে। আর বৃষ্টিপাত না হলে জলাধারগুলির রক্ষণাবেক্ষণের প্রযোজনও হয় না। কেরলের জলাধারগুলি প্রায় শুকিয়ে কাঠ। ২০১৫–‌১৬, ২০১৬–‌১৭–‌তে কেরল ভয়ঙ্কর খরার সামনে দঁাড়ায়, জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলিও বন্ধ হয়ে যায় এবং পানীয় জলের ভয়ানক সঙ্কট দেখা দেয়।
জুলাই থেকে আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত অভূতপূর্ব বৃষ্টিতে বুজে যাওয়া নদীখাতগুলি আর জল ধারণ করে রাখতে পারেনি, জলে ভাসিয়ে দিয়েছে কেরলকে। যে কোনও বন্যা এবং খরা যদি সহনশীলতার মধ্যে থাকে, তাহলে মানুষের অযাচিত হস্তক্ষেপের কথা আসে না।
এই বিপর্যয়ে কেরলের যে সব অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, উত্তর ও মধ্য কেরলে সেই এলাকাগুলিকে ২০১১ সালে পরিবেশগত ভাবে সংবেদনশীল এলাকা বলে চিহ্নিত করেছিল ওয়েস্টার্ন ঘাট ইকোলজি এক্সপার্ট কমিটি। এই কমিটির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সের গবেষক মাধব গ্যাডগিল। তার অনেকগুলি সুপারিশের মধ্যে একটি ছিল পশ্চিমঘাট পর্বতমালার ১ লক্ষ ৪০ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকাকে তিনটি ভাগে ভেঙে দেওয়া। কোথাও আবার জঙ্গল কেটে রিসর্ট বানাতে আপত্তির কথা জানানো হয় গ্যাডগিল কমিটির রিপোর্টে। কিন্তু গ্যাডগিল রিপোর্টকে বিদায় করেছিল কেরল সরকার। একটি প্রস্তাবও মানা হয়নি। উল্টে জঙ্গল কেটে একের পর এক রিসর্ট তৈরির অনুমোদন দিয়েছে প্রশাসন। শহরগুলির বর্জ্য দিয়ে বোজানো হয়েছে নদীখাত, তারপরে সেই নদীখাতে গড়ে উঠেছে পর্যটন কেন্দ্র, হোটেল, রেস্তোরঁা। তবে এগুলি নতুন কথা নয়। উত্তরবঙ্গের জলদাপাড়ার গভীর অরণ্য সাফ করে তৈরি হয়েছে পর্যটন কেন্দ্র, যার নাম ভোরের আলো। পর্যটনকে চাঙ্গা করলেই বেকারির কিছুটা সমাধান হয়ত হবে বলে শাসকরা মনে করেন। যেমন ভুটান থেকে শুরু হওয়া এশিয়ান হাইওয়ে আবার চ্যাংরাবান্ধা পর্যন্ত চলে যাওয়া সার্ক রোড, লুকইস্ট পলিসির জন্য তৈরি হওয়া উত্তর–‌পূর্বের রাস্তাঘাট নির্মাণের পিছনেও সেই একই কথা— বৃক্ষছেদন আর বৃক্ষনিধন। শুধু মাধব গ্যাডগিলের নেতৃত্বাধীন কমিটিই নয়, অসংখ্যা কমিটি বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষা করেই উন্নয়নের পক্ষে সওয়াল করেছেন, নইলে সমূহ বিপদ। আগস্টের ২১ তারিখ পর্যন্ত কেরলে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা।‌‌‌
(‌লেখক মালদহ চঁাচল কলেজের অধ্যাপক)‌

জনপ্রিয়

Back To Top