প্রচেত গুপ্ত

গত পঁাচ মাসের বেশি সময় ধরে আমরা ‘‌কোভিড ১৯’ থেকে বেরোতে পারছি না। সে আমাদের মুষড়ে রেখেছে। আতঙ্কিত করে রেখেছে। সকাল বিকেল মন খারাপ করছে। ক্ষতি করেছে অনেক, আরও ক্ষতি করবে বলে তৈরি হচ্ছে। কেউ সরাসরি করোনায় আক্রান্ত হচ্ছি, কেউ সর্বক্ষণ ভাবছি, করোনা হলে কী হবে?‌ ভাবছি, বয়স তো বাড়ছে, ভিতরে না জানি কতরকমের অসুখ। সামলাতে পারব তো?‌ ভাবতে ভাবতে আরও মুষড়ে পড়ছি।
তবে কোভিডের থেকে বেশি সর্বনাশের কথা হল, আজও অনেক ‘‌মান্যিগন্যি’‌ বড্ড বেশি ‘‌আহা উহু’‌ করে আরও মন বিগড়ে দিচ্ছেন। তঁারা বলছেন, ‘‌কী ভয়ঙ্কর!‌ কী ভয়ঙ্কর!’‌ আরে!‌‌ ভয়ঙ্কর তো সবাই জানি বাপু। এ আর নতুন কথা কী?‌ ‘‌ভয়ঙ্কর!‌ ভয়ঙ্কর!‌’‌ বলে আর ধুনো দিয়ে কোন উপকারটা হবে?‌ এতে লড়াই করবার মানসিকতাটাই নষ্ট হচ্ছে। ছ’‌মাস ধরে ভেঙে পড়া মানুষকে আরও ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। যেন বলা হচ্ছে, ‘‌অ্যাই তুমি হাসছো কেন?‌ এরকম মন্দ সময়ে কেউ হাসে?‌ ছিছি। আরও মুখ গোমড়া করে থাকো। তারপর একসময়ে বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়ো।’‌
আমি এতে বিশ্বাস করি না। চারপাশে এমন সব মানুষ দেখছি, যাদের দেখে মনে সাহস জুটছে, ভয়ঙ্কর অসুখের বিরুদ্ধে লড়াই করবার জোর পাচ্ছি। এই জোর যদি একজনের মধ্যেও পৌঁছে দিতে পারি, সেটা কম কী?‌ আতঙ্কের ধুনো দেওয়ার থেকে অনেক ভাল।  
একটা চমৎকার উদাহরণ দিই।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। সকলের মতো আমার খুব প্রিয় এবং খুব শ্রদ্ধার মানুষ। ওঁর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত ভাবে পরিচয় বেশ অনেকটা আগে। উনি তরুণ মজুমদারের ‘‌চঁাদের বাড়ি’‌ ছবিতে অভিনয় করে‌ছিলেন। যেহেতু গল্পটা এই অধমের লেখা, শুটিং দেখতে গিয়েছিলাম বারবার। তরুণ মজুমদারের কাজ দেখবার সৌভাগ্য কে ছাড়ে?‌ তার ওপর আবার ছিলেন স্বপ্নের সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। তিন প্রজন্মকে মাতিয়ে রেখেছেন। শুটিংয়ে গিয়ে দেখেছিলাম, কী কঠোর পরিশ্রম করতে পারেন!‌ একটা গানের দৃশ্য ছিল। চঁাদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে। ফ্লোরে ছাদ বানানো হয়েছিল। সৌমিত্রবাবু ঠায় দঁাড়িয়ে ছিলেন। শট নেওয়া হবে, তার আগে সবাই প্রস্তুত হচ্ছিলেন। পজিশন, আলো, ক্যামেরা, সেট। তরুণ মজুমদার ক্রেনের ওপরে বসে লুক থ্রু করছিলেন। সেখান থেকে বললেন, ‘‌‌সৌমিত্রবাবুকে, একটা চেয়ার দাও। উনি দঁাড়িয়ে আছেন।’‌
মনে আছে, সৌমিত্রবাবু বললেন, ‘‌না না, ঠিক আছি। বসব না।’‌
বুঝলাম, শরীরের কষ্টকে গ্রাহ্য না করে উনি অভিনয়ে মনঃসংযোগ করছেন।
এরপর এই মানুষটির সঙ্গে দেখা হল, ‘‌‌মতি নন্দী স্মৃতি পুরস্কার’‌ নিতে গিয়ে। উনি হাতে প্রাইজ তুলে দিয়েছিলেন। একদিকে মতি নন্দীর নামে প্রাইজ অন্যদিকে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়— মনে হচ্ছিল, আমি জেগে নেই। ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছি।
যতবার সৌমিত্রবাবুকে কাছ থেকে দেখেছি, কথা বলেছি মনে হয়েছে, উৎসাহ, তেজ, বুদ্ধিতে ঝকঝক করছেন। বয়সকে তুড়ি মেরে জয় করেছেন।
সেই চির যুবা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে টেলিফোনে কথা হল দু’‌দিন আগে। বিশেষ প্রয়োজনে অল্প সময়ের কথা। মানুষটির মনে আতঙ্কের লেশমাত্র দেখলাম না। একবারও বললেন না, করোনা কী ভয়ঙ্কর। বললেন, নিজের লেখা নাটকের কথা। বললেন, শুটিং শুরু করেছেন। বললেন মজা করেই।
‘‌টুকটুক করে বেরোতে হচ্ছে এবার।’‌  
আমাকে দে’‌জ প্রকাশনার অপুও একদিন বলেছিল, ‘‌সৌমিত্রজেঠু শুটিং করছেন। সবাই খুব সতর্কতা নিয়ে কাজ করছেন।’‌
পরে আজকালে ছবিও বেরিয়েছে।
আমি যেটা বলতে চাইছি, সেটা হল, করোনার চিন্তা কি সৌমিত্রবাবুর নেই?‌ অবশ্যই রয়েছে। নায়কদের বয়স বাড়ে না। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়েরও বাড়েনি।  করোনা তা বোঝে না। তাই চিন্তা থাকাটা স্বাভাবিক। তিনি আতঙ্কিত হয়ে হাত পা গুটিয়ে বাড়িতে বসে থাকতে পারতেন। কই তা তো করেননি!‌ আতঙ্কের কথা না ছড়িয়ে নিজের কাজ শুরু করে দিয়েছেন। নাটক লিখছেন, শুটিং করছেন। তিনি শুটিং করা মানে কত মানুষের রুটিরুজির সংস্থান হওয়া সেটা সবাই বোঝে। তিনি নাটক লেখা মানে শুধু সৃষ্টি নয়, সেখান থেকেও পরোক্ষ ভাবে মানুষের অন্ন সংস্থান হয়। এই দুঃসময়ে এটাই তো বিরাট দায়িত্ব পালন।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো মানুষদের দেখে শিখতে হয়। একটু সময় কথা বলে, আমি নিজেও যেন তরতাজা, চনমনে হয়ে উঠেছি।
কাল শিক্ষক দিবস গিয়েছে। একটু তঁাদের নিয়ে বলি?‌
মাঝে একবার কিছু আহাম্মক প্রশ্ন তুলেছিল, লকডাউনে শিক্ষকরা কেন ঘরে বসে মাইনে পাবেন?‌
আমি খবর নিয়ে জেনেছি, করোনাকালে শিক্ষক শিক্ষিকারা, বিশেষ করে‌ স্কুলে যাঁরা যুক্ত তাঁরা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, করছেন। প্রথম মাস দেড়েক–‌দুয়েক ধাক্কা সামলানোর পর থেকে সরকারি, বেসরকারি সর্বস্তরে মাস্টারমশাই, দিদিমণিদের কাজে নেমে পড়তে হয়েছে। তঁারা সবরকম ঝুঁকি নিয়ে মাঝেমধ্যেই স্কুলে গিয়েছেন এবং যাচ্ছেনও। গিয়ে মিটিং করতে হয়েছে। অনলাইনে কীভাবে পড়ানো হবে তার পরিকল্পনা হয়েছে। অনলাইনে ছেলেমেয়েদের  ক্লাস নেওয়া একটা কঠিন এবং পরিশ্রমের কাজ। পড়ুয়ারা তো এই ব্যবস্থায় অভ্যস্ত নয়। এক ঘণ্টার ক্লাস তিন ঘণ্টা লাগছে। শিক্ষক–‌শিক্ষিকারা বাড়িতে বসে সেই পরিশ্রম করছেন। কোনও কোনও স্কুলে মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা চলেও যাচ্ছেন। ক্লাসরুম থেকেই অনলাইন ক্লাস নিচ্ছেন। এঁদের কাজ বাইরে থেকে দেখা যায় না এবং এঁদের কথা কেউ বলছেও না। কোনও প্রচারও নেই। সরকারি স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকাদের বেশি দায়িত্ব। পড়ুয়াদের জন্য সবকটা সরকারি প্রকল্প চালু রয়েছে। স্কুলে গিয়ে শিক্ষক শিক্ষিকা এবং শিক্ষাকর্মীদের সেই প্রকল্পের তদারকি করতে হচ্ছে। যাঁরা প্রশাসনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত তাঁদের তো শুনেছি প্রায় রোজই যেতে হয়। কিছুদিন ধরে ভর্তিপর্ব চলল। সেই সময়টা ছিল যেমন পরিশ্রমের তেমন ঝুঁকির। কলেজের বেলাতেও অনেক জায়গায় ঘটনা এক। অনলাইন ক্লাস চলছে। তারওপর পরীক্ষা আসছে। তার ব্যবস্থা করতে অধ্যক্ষ, শিক্ষক, শিক্ষিকা, শিক্ষাকর্মীদের স্কুলে ছুটতে হচ্ছে।
যাঁরা ‘‌সর্দি জ্বর’‌ বলে ফঁাকি দিচ্ছেন, তাঁরা দিন। বাকি শিক্ষক শিক্ষিকাদের কী বলব? কোভিড যোদ্ধা বলব না?‌‌ একশোবার বলব।

জনপ্রিয়

Back To Top