আড়াই মাস স্কন্ধকাটা অবস্থায় থাকল ১৩৪ বছরের দল। সভাপতি–‌কেন্দ্রিক দল কংগ্রেস। আড়াইটা মাস কার্যত সভাপতি নেই। নেই, কিন্তু ছিলেন। প্রধানত টুইটে। পদত্যাগ গৃহীত না–‌হওয়া পর্যন্ত রাহুলেরই সভাপতি থাকার কথা। কিন্তু দলের কোনও বিবৃতি বা ঘোষণায় তাঁর নাম নেই। 
কেন পদত্যাগ?‌ ব্যর্থতার দায় নিয়ে?‌ তাহলে তো মানতে হয় তাঁকে, ব্যর্থতাটা সত্যি। মেনেছেন?‌ প্রথমত, যিনি দলের সর্বোচ্চ নেতা, যাঁর নেতৃত্ব নিয়ে দলে সংশয় বা প্রশ্ন নেই, পরাজয়ের পর তাঁর তো ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইটা শুরু করা উচিত। কোথায় ভুল, কোথায় ফাঁক, বুঝে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়াই নেতার কাজ। কর্মীরা তো সেটাই আশা করেন। পদত্যাগ করেছিলেন কেন?‌ আশা, অধিকাংশ প্রবীণ নেতা বলবেন, তাহলে আমরাও ব্যর্থতার দায় নিচ্ছি, নতুনভাবে সংগঠনকে গড়ুন, চাঙ্গা করুন সভাপতি। তেমন কিছু নয়। কয়েকজন বলতে হয় বলে বললেন, রাহুলেরই থাকা উচিত, কিন্তু প্রবীণ কোনও নেতাই পদ ছেড়ে দেওয়ার কথা বললেন না। উল্টে, ওরাঁ সভাপতি কে হতে পারেন, নিজে যদি না–‌ও পারেন, কে হলে নিজের সুবিধা, ভেবে গেলেন, সক্রিয় হলেন। প্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়ায় গেলেন না রাহুল গান্ধী। এমন শোচনীয় পরাজয়ের পর, যখন মাটি কামড়ে পড়ে থাকার কথা, তখন এক সপ্তাহ বিদেশে কাটিয়ে এলেন। ছুটি?‌ সত্যিই কি রাজনীতিক হিসেবে তিনি সিরিয়াস?‌
২০০৪। ২০৬ আসন পেয়ে ইউপিএ সরকার গড়ল কংগ্রেস। বামপন্থীরা ৬০। যার সূত্রে সেই— ‘‌উঠতে বললে উঠবে বসতে বললে বসবে!’‌‌  বাংলায় আসি। তৃণমূল নেমে এল মাত্রই ১ আসনে। দক্ষিণ কলকাতায় মমতা ব্যানার্জি, যাঁকে হারানো যায় না। নিশ্চিত বিপর্যয়, আসন মাত্র ১, মমতা কি হাল ছেড়েছিলেন?‌ নাকি, উল্টে দ্বিগুণ উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়লেন?‌ সিপিএম ভেবেছিল, তৃণমূল ভেঙে তছনছ হয়ে যাবে। কংগ্রেস ভেবেছিল, তাদের সরকার, হতাশ তৃণমূল নেতারা মমতাকে ছেড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে কংগ্রেসেই ফিরবেন। সব আশায় জল ঢেলে মমতা পুনর্নির্মাণে, সংগঠন ধরে রাখায়, বাড়ানোয় মন দিলেন। রাজ্যে ক্ষমতায় আসতে লেগেছে ৭ বছর। পেরেছেন, বিশ্বাসটা ছিল বলেই। তফাত, তফাত। রাহুলের সঙ্গে মমতার তফাত। একজন হার–‌না–‌মানা নেত্রীর সঙ্গে একজন দুর্বলচিত্ত নেতার তফাত।
রাহুল শর্ত দিয়েছিলেন। নেহরু–‌গান্ধী পরিবারের কাউকে সভাপতি করা যাবে না। সেই শর্ত অগ্রাহ্য করে ‘‌অন্তর্বর্তী’‌ সভাপতি হলেন রাহুলের মা, কারণ তিনি জানেন, অন্য কেউ এলে দলটা দশ টুকরো হয়ে যাবে। ৭২ বছর বয়সে যে–‌সাহস দেখাতে পারলেন সোনিয়া, ৪৯ বছর বয়সে সেই চ্যালেঞ্জ থেকে পালিয়ে গেলেন রাহুল। ‘‌অন্তর্বর্তী’‌ সভাপতি সোনিয়া, মানে কি অদূর ভবিষ্যতে অন্য কেউ হবেন?‌ অসম্ভব। কংগ্রেসিরা পরিবারটিকে সত্যিই ভালবাসেন। জওহরলাল নেহরু, ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধী, সোনিয়া গান্ধী। ইউ এন ধেবর, নরসিংহ রাও, সীতারাম কেশরী— কেউই অর্ধেক আনুগত্য পাননি। পরিবারতন্ত্র বলে সমালোচনা হতে পারে, কিন্তু বাস্তবটাও মেনে নিতে হবে। এবং সেই ভালবাসা, আনুগত্য রাহুলও পেয়েছেন। কথা হল, পরিবারের কাউকে সভাপতি করা চলবে না, এই শর্ত নিয়ে কী বলবেন রাহুল?‌
১৯ বছর সভাপতি ছিলেন সোনিয়া গান্ধী। ‘‌বিদেশিনী’‌ হুলে আক্রান্ত। কিন্তু যথার্থ ভারতীয় হয়ে উঠেছেন। প্রণব মুখার্জির মুখে শুনেছি, দুটি গুণ। এক, সোনিয়া মিথ্যা কথা বলেন না। দুই, মন দিয়ে কথা শোনেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন নিজেই। দুটো নির্বাচনে কংগ্রেসকে ক্ষমতায় এনেছেন। ২০০৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও, চমকে দিয়ে মনমোহনকে প্রধানমন্ত্রী করে ‘‌ত্যাগ’‌ দেখিয়েছিলেন। খাদ্যের অধিকার, কাজের অধিকার, তথ্যের অধিকার নিয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দিকে মনমোহন সরকারকে নিয়ে গিয়েছিলেন এই ‘বিদেশিনী’‌, এই ‘‌রিমোট কন্ট্রোল’‌।
আমরা তো পরিষ্কার দেখলাম, শুনলাম, সোনিয়ার প্রত্যাবর্তনের পর কংগ্রেস নেতাদের প্রতিক্রিয়া। ‘‌স্বাগত। এবার দল ঘুরে দাঁড়াবে। দল ছেড়ে চলে যাওয়া বন্ধ হবে।’‌ মানে কী দাঁড়াল?‌ রাহুল থাকলে ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনাই ছিল না। কংগ্রেসের ক্ষয় অব্যাহত থাকত। কোনও হাহুতাশ শোনা গেল কি?‌
এই আড়াই মাসে দুটো বড় ঘটনা। এক, কর্ণাটকে জেডিএস–‌কংগ্রেস সরকারকে ফেলে দিল বিজেপি। রাহুল নিষ্ক্রিয়। দলে তো সভাপতিই নেই। দুই, কাশ্মীর। তাঁর ঘনিষ্ঠ জ্যোতিরাদিত্য, মিলিন্দ দেওরা, জিতিন প্রসাদ প্রমুখ তরুণ নেতারাও কেন্দ্রের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করলেন। দায় ছিল না রাহুলের?‌ কংগ্রেসকে ঐক্যবদ্ধ রাখার?‌ যখন ধ্বংসস্তূপ থেকে দলকে পুনর্নির্মাণ করার কথা তাঁর, তিনি পদত্যাগ ‘‌উপভোগ’‌ করলেন!‌
এত ভালবাসা, নিশ্চিত নেতৃত্ব, আনুগত্য পেয়েও‌ রাজ্য নেতাদের সামলাতে পারেননি। পাঞ্জাবে রাহুল চেয়েছিলেন, অন্তত একটা আসন আপকে ছেড়ে জোট করতে। ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিং মানলেন না। সিধুকে তাড়িয়েই দিলেন, সিধুর সঙ্গে রাহুল–প্রিয়াঙ্কার ছবি এল। রাজস্থানে গেহলট বনাম পাইলট, থামাতে পারলেন না। মধ্যপ্রদেশে কমলনাথ বনাম জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া, মানাতে পারলেন না।
নির্বাচনী প্রচারে এক ঝুড়িতে সব ডিম। রাফাল। অরুণ শৌরি, যশবন্ত সিনহা, এন রাম তথ্য দিয়েছেন। সেটাকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলেন না সভাপতি, শেষ পর্বে আনলেন ‘‌ন্যায় প্রকল্প’‌, যা বিন্দুমাত্র রেখাপাত করল না। বিজেপি–‌কে হারাতে যে ঐক্যবদ্ধ বিরোধী শিবিরের কথা তুলে ধরার দায় ছিল, এড়িয়ে গেলেন। ব্যর্থ ছাড়া আর কী?‌ 
গুজরাটে ৯৯–‌৮০, ভাল। তিন রাজ্যে জয়। এই ফলকে লোকসভায় নিয়ে যেতে পারলেন না। যা বোঝা গেল, তিন রাজ্যে জয় এসেছিল প্রতিষ্ঠান–‌বিরোধী ভোটে। জাতীয় বিকল্প হিসেবে কংগ্রেসকে তুলে ধরা, ধরে রাখা যায়নি। ব্যর্থ ছাড়া আর কী?‌
পদত্যাগ করে একটা নীতিগত উচ্চতা পেতে চেয়েছিলেন রাহুল গান্ধী। হল না। এখানেও, ব্যর্থ ছাড়া আর কী!‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top