দেবেশ রায়: একটা  কথা অনেক দিন ধরেই মনে হচ্ছে। ভাবছিলাম— আমাদের এই শহরে বা রাজ্যে যাঁরা রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে কাজ করেন ও সেই চর্চার জন্য সারা দেশেই স্বীকৃত, তাঁদের কেউ নিশ্চয়ই বিষয়টি আরও বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করবেন। অমল মুখোপাধ্যায়, শোভনলাল দত্তগুপ্ত, পার্থ চট্টোপাধ্যায়, সেমন্তী ঘোষ এই বিষয়টি বিশদ বলতে পারবেন, সন–‌তারিখ দিয়ে। 
আজকের কাগজে পড়লাম সিএনএন নাকি আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সংক্রান্ত একটি খবরে তাঁকে ‘‌চৌকিদার সুষমা স্বরাজ’‌ বলে উল্লেখ করেছেন। লেখক আশঙ্কা জানিয়েছেন— সম্ভবত এই শব্দটি আমরা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন অর্থে ব্যবহারের সুযোগ করে দিলাম, যেমন অতীতে ফরাসি বিপ্লব থেকে ‘‌সিটিজেন’‌ শব্দটি ব্যবহারে এসেছে বা রুশ বিপ্লব থেকে ‘‌কমরেড’‌ শব্দটি। 
বিদগ্ধ ও অনুভূতিশীল লেখককে আশ্বস্ত করতে চাই যে ভারত তার স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে মহাত্মা গান্ধীর চয়িত ‘‌আইন অমান্য’‌, ‘‌অসহযোগ’‌, ‘‌নিরস্ত্র প্রতিরোধ’‌ এই ধারণাগুলি মানুষের সমাবেশ রচনা করে, পদ্ধতি ও উদ্দেশ্যের এক সম্মিলনের কর্মসূচি পৃথিবীর রাজনৈতিক আন্দোলনকে দিয়েছে। মার্টিন লুথার কিং থেকে শুরু করে নেলসন ম্যান্ডেলা পর্যন্ত ও আমেরিকাতে ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী বিখ্যাত সব পদযাত্রায় (‌বিশেষ করে শিকাগো মার্চে)‌ সেই কর্মসূচি ব্যবহৃত হয়েছে। আমরা চৌকিদারের জাত নই— আমরা পৃথিবীর বীভৎসতম চৌকিদারির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের জাত। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ তো বটেই। আমাদের মতো দীর্ঘ আত্মদানময় আত্মহোমের বহ্নি–‌জাগানো স্বাধীনতা আন্দোলন পৃথিবীর কোনও দেশে ঘটেনি। স্বাধীনতা আন্দোলন নিয়ে এদেশ–‌ওদেশের তুলনা করা অনুচিত। তবু, আজ এই সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনের আগে এটুকু মনে রাখা আমাদের কর্তব্য–‌নির্ধারণে সাহায্য করবে যে ১৯৪৭–‌এ ভারতের স্বাধীনতা অর্জন সারা পৃথিবীতে উপনিবেশ মুক্তির নতুন যুগ সূচনা করে। প্রায় সঙ্গে–‌সঙ্গে দক্ষিণ–‌পূর্ব এশিয়ায় নতুন করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আক্রমণের বিরুদ্ধে জনযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। সেই যুদ্ধে ভিয়েতনামের ছিল নেতৃত্বের ভূমিকা। আজ ভুলে যাওয়া অপরাধ হবে যে— সদ্য–‌স্বাধীন ভারত নিজের দেশের অজস্র বিপন্নতা সত্ত্বেও দিল্লিতে স্বাধীনতাকামী সংগ্রামী দেশগুলির নিজের দেশের সংগ্রাম চালানোর জন্য নিতান্ত প্রয়োজনীয় কেন্দ্রীয় অফিস খোলার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল জওহরলাল নেহরুর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে। ভারত সেই দেশ, যে জানত— আমার দেশের স্বাধীনতাও ‌অসম্পূর্ণ‌ থাকবে যদি বিশ্বের উপনিবেশগুলি মুক্ত না হয়। 
তখন, নরেন্দ্র মোদির দল ছিল খানিকটা জনসঙ্ঘ আর পুরোটা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ। তারা আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনে কোনও ভুল পথে গিয়েও কোনও ভূমিকা নেয়নি। বরং ১৯২৫ থেকে স্থানীয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রধান সংগঠক হয়ে ওঠে। সেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থেকেই মুসলিম সমাজেও সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। লিয়াকৎ আলি প্রমুখ মুসলিম নেতারা লন্ডনে স্বেচ্ছানির্বাসিত মহম্মদ আলি জিন্নাকে ভারতে ফিরিয়ে আনেন!‌ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভারত–‌নীতি অনুযায়ী জিন্না ‘‌দ্বিজাতি তত্ত্ব’‌কে ভারতীয় রাজনীতির বিষয় করে তুললেন। 
নরেন্দ্র মোদির আর‌এস‌এস পরোক্ষত ‘‌দ্বিজাতি তত্ত্বে’‌র স্রষ্টা। কিন্তু তখনও জিন্না বা মুসলিম  লিগ দেশভাগের কথা তোলেইনি। কিন্তু কংগ্রেসের ভিতরে কট্টর হিন্দু সাম্প্রদায়িকতাবাদীরা যদি একজাতিতত্ত্ব নিয়ে রাজনৈতিক বিষয় তৈরি করেন (‌মদনমোহন মালব্য প্রমুখ)‌ তবে তার প্রতিক্রিয়ায় দ্বিজাতিতত্ত্ব তো প্রধান হয়ে উঠবেই। সারা ভারতে মুসলিম লিগ ও জিন্নার প্রাধান্য ছিল না। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘই প্রথম বলে যে মুসলমানরা ‘‌পাকিস্তান’‌ চায়। মুসলিম লিগের কোনও প্রস্তাবে তা বলাই হয়নি। অবশেষে লাহোর সম্মেলনে মহম্মদ আলি জিন্না বললেন— আমরা না বললেও ওরা যখন আমাদের নাম ‘‌পাকিস্তান’‌ দিচ্ছে, বেশ, আমরা সেই নামটা মেনে নিচ্ছি। 
নরেন্দ্র মোদি মুসলিম লিগ ও জিন্নার এই কৌশলটা নকল করলেন, ‘‌চৌকিদার’‌ শব্দটি নিয়ে। উনি জননেতা হিসেবে বুঝতে পারলেন ‘‌চৌকিদার চোর হ্যায়’‌ প্রবাদটা লোকের ঠোঁটের আগায় ধরে গেছে। প্রায় অনুরূপ আর–‌একটা প্রবাদ আছে—‘‌চোর মচায়ে শোর’‌।‌ চোরই চোর–‌চোর বলে চেঁচাচ্ছে। নরেন্দ্র মোদি যখন দেখলেন— তাঁকেই একা ‘‌চৌকিদার’‌ বানানো হচ্ছে, তখন তিনি দলের সব নেতাকে বাধ্য করলেন, তাঁরাও নিজেদের ‘‌চৌকিদার’‌ বলেন। বিজেপির উচ্চবর্ণ‌–‌প্রধান ও বর্ণভেদপ্রথার প্রতি নিবিষ্ট মনোযোগী নেতারা সকলে নিজেকে ‘‌চৌকিদার’‌ বলতে রাজি হননি। কিন্তু ক্ষমতার সামনে তাঁরা মাথা নীচু করেছেন। এখন সিএনএনও আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ‘‌চৌকিদার সুষমা স্বরাজ’‌ ‌বলছেন।‌
কিন্তু মোদির এই নকলি কৌশলটাও উল্টে গেল। 
ভেবেছিলাম, যাঁরা এই ইতিহাসের খুঁটিনাটি জানেন, তাঁরা মোদির ফন্দি ফাঁস করে দেবেন। 
কিন্তু ইতিহাসের রসবোধ অননুমেয়। 
ঘটনা যা দাঁড়িয়েছে তাতে মোদির সব কথারই উল্টো মানে হয়ে যাচ্ছে। ‘‌তথ্য’‌ শব্দটির আভিধানিক অর্থ ‘‌মোদি’‌ বদলে দিয়েছেন। যা কিছু বলছেন, তার উল্টোটা সত্যি হয়ে যাচ্ছে।  বললেন যুদ্ধ জাহাজে রাজীব গান্ধীর প্রমোদভ্রমণের কথা। নৌবাহিনীর তৎকালীন প্রধান জানালেন— ওটা ছিল নির্ধারিত সরকারি কর্মসূচি, সস্ত্রীক প্রধানমন্ত্রী ছাড়া কেউ যুদ্ধ জাহাজে পা রাখেননি। 
২৩ মে সম্ভবত বিজেপি উচ্চবর্ণের নেতারা স্বস্তির নিঃশ্বাস 
ফেলবেন যে ‘‌চৌকিদার’‌ একবচন শব্দ ও একজনই চৌকিদার ও সে–‌ই–‌ই চোর। ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top