মহামতি দিলীপ ঘোষ বললেন, ‘‌করোনা চলে গেছে!‌ তবু মমতা ব্যানার্জি কড়াকড়ি করছেন, যাতে আমরা আন্দোলন করতে না পারি!‌’‌
কী বলছেন।‌ দেশ থেকে করোনা চলে গেছে?‌ এর মধ্যেই মোট আক্রান্ত ৫৪ লক্ষ। দৈনিক সংক্রমণ প্রায় ১ লক্ষ। মৃত ৮৪ হাজার। চলে গেছে?‌ তাহলে দেশ জুড়ে এত দুশ্চিন্তা কেন?‌ প্রধানমন্ত্রী বলছেন কেন, টিকা না–‌আসা পর্যন্ত ঢিলেমি নয়?‌ লকডাউন ঘোষণার সময়ে মোদি বলেছিলেন, ২১ দিনে এই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে। ১৯২ দিন হয়ে গেছে, তবু দৈনিক সংক্রমণ প্রায় ১ লক্ষ কেন?‌ দলের এক সাংসদ তথা রাজ্য সভাপতি এমন কথা বলছেন, অনুমোদন করেন প্রধানমন্ত্রী?‌
তাহলে কি দিলীপবাবু বলছেন, যে, বাংলা থেকে করোনা চলে গেছে?‌ সন্দেহ নেই, বেশ কিছু সূচকে গোটা দেশের তুলনায় বাংলার অবস্থা কিছুটা ভাল। এই ‘‌কিছুটা ভাল’‌ নিয়ে সন্তুষ্ট হয়ে বসে থাকতে রাজি নন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলছেন, লম্বা লড়াই, সতর্ক থাকতে হবে। যথাসাধ্য করছেন, আত্মসন্তুষ্ট নন। সুস্থতার হার দেশে ৭৮ শতাংশ, বাংলায় ৮৭ শতাংশ। পজিটিভিটি রেট–‌এর হিসেবেও বাংলা অপেক্ষাকৃত ভাল জায়গায়। বেশ, দিলীপবাবু তাহলে বলুন, এত ভালভাবে লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী, এত ভাল কাজ করেছে সরকার, যে, বাংলা থেকে করোনা চলে গেছে!‌ মুখ্যমন্ত্রীকে এক লাইনের অভিনন্দন–‌পত্র পাঠান।
‘‌করোনা চলে গেছে’,‌ তবু কেন মমতা এত সতর্কতার কথা বলছেন?‌ কেন ন্যূনতম কড়াকড়ি?‌ বিজেপি যাতে আন্দোলন করতে না পারে!‌ সে কী, আমরা তো দেখছি, জেলায় জেলায় অবৈধ সমাবেশ করছে বিজেপি। দূরত্ব বিধি মানা হচ্ছে না। পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করে গোলমাল পাকানো চলছে। স্বয়ং দিলীপ ঘোষ নিয়মিত ‘‌চায় পে চর্চা’‌ করছেন। চায়ের দোকানে ভিড় করে বসে ডায়ালগ ছাড়ছেন। অনেকের মাস্ক নেই। তঁার সঙ্গে থাকা কয়েকজন সংক্রমিত হওয়ার পরেও তিনি কোয়ারেন্টিনে যাননি। নিজে নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছেন, অন্যদের ‘‌উৎসাহ’‌ দিচ্ছেন।
অপকর্মের অনেক দিক। অতিমারীর বিরুদ্ধে লড়াই, তার মধ্যেই আমফান, অক্লান্ত যোদ্ধা মমতা। সতর্ক, সজাগ। কঠিন সময়ে পাশে দঁাড়াল কি দিলীপবাবুদের কেন্দ্রীয় সরকার?‌ আর্থিক সহায়তার নামগন্ধ নেই। উল্টে কেন্দ্রীয় দল পাঠিয়ে রাজ্যকে উত্ত্যক্ত করা। রাজ্যপালকে দিয়ে দুঃসময়ে বিষাক্ত আক্রমণ। লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিককে দুঃসহ কষ্ট পেয়ে ফিরতে হল অপরিকল্পিত লকডাউনের ফলে। মহা সমারোহে স্পেশ্যাল ট্রেনের ঘোষণা করা হল। ভাড়া মেটাতে হল রাজ্যকে। কেন্দ্রের কাছে পাওনা ৫৩ হাজার কোটি টাকা। জিএসটি খাতেও প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ আসছে না। যথাসম্ভব বিপাকে ফেলা, যাতে মুখ পোড়ে রাজ্য সরকারের। দিলীপ ঘোষের সাম্প্রতিক রোমাঞ্চকর বাণী একটা নতুন মাত্রা যোগ করল।
সাহায্যের ছিটেফোঁটা নেই। পাশে দঁাড়ানো নেই। কুৎসা আছে। নিজেরা তো কুকথা বলছেনই, সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যা। তবু, কী মুশকিল, মুখ্যমন্ত্রী লড়াইটা দিচ্ছেন। বুদ্ধি ও সাহসের সঙ্গে। লড়াইটাকে ভেস্তে দেওয়ার জন্যই কি মন্তব্য— ‘‌করোনা চলে গেছে’‌?‌ যাত্রাভিনেতাকে দিয়ে ‘‌মরে যাচ্ছি, কিছু করুন মুখ্যমন্ত্রী’‌ বলানো হল। পাড়ায় পাড়ায় বিষাক্ত অপপ্রচার। এত করেও যখন সুবিধে হচ্ছে না, মানুষকে বিপজ্জনক আশ্বাস— ‘‌করোনা চলে গেছে’‌। আবার বলি, তা যদি সত্যি হয়, মেনে নিন যে চূড়ান্ত সফল বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। লড়ছেন, কিন্তু মমতা স্বয়ং বলছেন, যুদ্ধটা চলছে। চলবে, যতদিন কোভিড–‌দানব থাকবে।
সীমিত রাখার চেষ্টা অব্যাহত, কিন্তু এখনও যায়নি করোনা। তাহলে, কী গেছে?‌ গেছে ওঁদের কাণ্ডজ্ঞান। গেছে ওঁদের মনুষ্যত্ব। গেছে সৌজন্য। গেছে মানবিকতা। গেছে ন্যূনতম সততা। গেছে দায়িত্বজ্ঞান। গেছে বিশ্বাসযোগ্যতা। গেছে চক্ষুলজ্জা। আমরা অবশ্য একটা কথা ভাবতে পারি, ওঁদের এসব ছিল কবে, যে, ‘‌চলে গেছে’‌?‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top