‌মানুষটার দোষ অনেক। প্রাথমিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে, সেই দিকে কিছু কাজ করে থেমে যাননি। ‘‌বর্ণপরিচয়’‌ বাঙালির শিক্ষায় বৃহত্তম সহায়ক। শিক্ষক হিসেবে অসাধারণ। ব্রিটিশ রক্তচক্ষুকে অগ্রাহ্য করে শিক্ষা–‌সংস্কারের লক্ষ্যে অবিচল থেকেছেন। এবং সেখানেই তিনি আটকে থাকেননি। সমাজ–‌সংস্কারকে এড়িয়ে শুধু শিক্ষাক্ষেত্রে নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি। বিধবা বিবাহ চালু করার জন্য শুধু লড়াই করেননি, বদলটা ঘটিয়ে ছেড়েছেন। সমাজ সংস্কারের উদ্দেশ্যে দুরন্ত লিখে গেছেন। অক্লান্ত থেকেছেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে বলেছিলেন ‘‌শ্রেষ্ঠ বাঙালি’‌। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। ২০০তম জন্মবর্ষে তাঁর দোষের, ‘‌অপরাধের’‌ শাস্তি দিল বিজেপি গুন্ডারা। বিদ্যাসাগর কলেজে হামলা চালিয়ে ভেঙে দিল তাঁর মূর্তি। সত্তরের দশকে যে–‌তরুণরা বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেছেন, বেশ কিছু ভুল থাকলেও তাঁরা, নকশালপন্থীরা আদর্শহীন ছিলেন না। ব্যক্তিহত্যার রাজনীতি যে জনগ্রাহ্য হতে পারে না, ফলপ্রসূ হতে পারে না, সহজ কথাটা বুঝতে অনেক সময় চলে গিয়েছে। পারস্পরিক সন্দেহ, অসংখ্য ভাগে ভাগ হয়ে যাওয়া, এক সময়ে আন্দোলনকে শেষ করে দিয়েছে। মাও সে তুং বিরাট নেতা। কিন্তু ‘‌চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান’‌ স্লোগান যে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না, ওঁরা বোঝেননি। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থাকে অস্বীকার করতে হবে, ভেঙে পাল্টাতে হবে, এটাও ছিল ঘোষণা। তারই ফলশ্রুতি কলেজ স্কোয়্যারে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা। অনেক শিক্ষিত বাঙালি, যাঁরা ওদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন, মত পাল্টালেন। বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙে বিজেপি–‌ও বাঙালির কাছে অ–‌গ্রহণযোগ্য হয়ে গেল, ক্রমশ আরও হবে। বিগ্রহ নয়, বিদ্যাসাগর এক প্রতীক। শিক্ষা ও সামাজিক আন্দোলনের অগ্রণী নায়ক। তাঁকে ভাঙলে, মূর্তি ভাঙলে ফল পেতে হবে।

জনপ্রিয়

Back To Top