১৯৮৮। হালকা শীত। আগরতলায়। প্রথম দর্শনেই ভাল লাগা। ছোট্ট শহর। তবু নিজস্বতা। সেই প্রথম আগরতলা বইমেলায় আজকাল। সবে ক্ষমতায় এসেছে কংগ্রেস। সন্ধেয় বইমেলা চত্বরে আলোচনা সভায়, হঠাৎ প্রসঙ্গের বাইরে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী সুধীররঞ্জন মজুমদার বললেন, মানহানি বিল এনে ঠিক করেছেন রাজীব গান্ধী। সাংবাদিকদের অসভ্যতা আটকাতে আইনটা দরকার ছিল। সোজা মাইক্রোফোনের কাছে গিয়ে বললাম, ‘‌সাংবাদিকতার অপমান সহ্য করতে পারি না। এই অনুষ্ঠানে থাকব না।’‌ সামনে, সঙ্গী সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, সুরজিৎ সেনগুপ্ত, পূর্ণেন্দু পত্রী। আজকাল স্টলের সামনে পাঠক–‌পাঠিকাদের সঙ্গে কথা বলছি, এক দঙ্গল যুবক হাজির। সুধীররঞ্জন এমনিতেই কথা বলতেন জড়িয়ে–‌জড়িয়ে‌। এই যুবকদের জড়ানো কথার কারণ আলাদা। পোশাক সাদা, চোখ লাল। তর্জন, মুখ্যমন্ত্রীকে অপমান করেছেন, ক্ষমা চাইতে হবে। বললাম, ‘‌ক্ষমা তো চাইবেন মুখ্যমন্ত্রী। আর, চোখ রাঙিয়ে লাভ হবে না।’‌ পাশে খ্যাতকীর্তি কার্টুনিস্ট পিকেএস কুট্টি। দারুণ মানুষ। যেন, হামলা হলে রুখে দাঁড়ানোর জন্য প্রস্তুত। দঙ্গল ফিরে গেল। কারও কারও আশঙ্কা, বেরোনোর সময় আক্রমণ হতে পারে। গুরুত্ব নয়। বইমেলার সময় শেষ হল, বেরোলাম। দেখি, পুলিশ এসকর্ট, দুটো গাড়ি। না তাকিয়ে হোটেলে। আধ ঘণ্টা পর এলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সমীররঞ্জন বর্মন। বললেন, ‘‌সরকারের হয়ে ক্ষমা চাইছি। সুধীরবাবু এরকমই, সত্যি।’‌ তাঁকে একটাই অনুরোধ, ‘‌সমীরবাবু, পুলিশ রাখবেন না, প্লিজ।’‌ আরও তিনদিন বইমেলায়। ফেরার দিন দেখি, সেই পুলিশ ভ্যান। ওই যুবকদের দেখেই সন্দীপন বলেছিলেন, ‘‌এরা পাঁচ বছর পর হারবেই। থাকবে না।’‌ তাই–‌ই হল। ১৯৯৩ সালে গুঁড়িয়ে গেল কংগ্রেস। প্রায় আড়াই দশক সরকারে বামফ্রন্ট। ২০১৮, বিজেপি ক্ষমতায়। নিশ্চিতভাবে বলে দেওয়া যায়, ২০২৩ সালে ক্ষমতায় থাকবে না। কারা আসবে, দেখা যাবে।
প্রথমেই পরিচয় করিয়ে দেওয়া যাক মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে। বিপ্লব দেব। কী কাজ করেছেন, বলছি। তার আগে, তাঁর কিছু মন্তব্য। মণিমুক্তো। রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার ত্যাগ করেছিলেন। .‌.‌.‌ গৌতম বুদ্ধ হেঁটে জাপানে গিয়েছিলেন। .‌.‌.‌ মহাভারতের যুগে ইন্টারনেট ছিল, বিজ্ঞানীরা মেনে নিয়েছেন। .‌.‌. সিভিল সার্ভিসে আসা উচিত শুধু সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের। .‌.‌.‌ সরকারি চাকরি বাড়লে জিডিপি কমে। বাংলাদেশে এই সব মন্তব্য নিয়ে একটা সুদৃশ্য বই ছাপা হয়েছে। বিপুল কাটতি।
বিজেপি জোট করেছিল উপজাতি সংগঠন আইপিএফটি–‌র সঙ্গে।
সুদীপ রায়বর্মনরা কংগ্রেস থেকে তৃণমূলে, তৃণমূল থেকে বিজেপি–‌তে। দরকার ছিল বিজেপি–‌র। মন্ত্রিসভা গড়ার সময়ে অর্ধেক, বাকিটা পরে বুঝলেন অভিজ্ঞ সুদীপ। তাঁকে স্বাস্থ্য দপ্তর দেওয়া হল, কিন্তু কাজ করতে দেওয়া হল না। তারপর, সরিয়েই দেওয়া হল। শরিক আইপিএফটি–‌কে ব্যবহার করে, ক্ষমতায় অপ্রাসঙ্গিক করে রাখা হল, স্থানীয় ভোটে কিছু ছাড়া হল না। ফঁুসছেন নেতারা।
শপথ নেওয়ার আগে থেকেই মূর্তি ভাঙা। মার্কস, লেনিন। ভাঙা হল একের পর এক পার্টি অফিস। বিরোধীদের একটাও কর্মসূচি করতে দেওয়া হল না। পুলিশ কিছুটা, গেরুয়া গুন্ডারা বেশি তৎপর। ভাঙচুরের সময় কেন্দ্রীয় নেতারা বললেন, ওরকম একটু হয়!‌ একটু?‌ পঞ্চায়েত স্তরের বিরোধী প্রতিনিধিদের ইস্তফা দিতে বাধ্য করা হল। নৃশংস আক্রমণ। পঞ্চায়েত ভোটে বিরোধীদের প্রার্থী দিতে দেওয়া হল না ৮৬ শতাংশ আসনে (‌বিজেপি কিন্তু চিৎকারে গলা ফাটায়, বাংলায় ৩৪ শতাংশ আসনে ভোট হয়নি, ৮৬ নিয়ে চুপ)‌।
আইনশৃঙ্খলার সাড়ে বারোটা বেজেছে। রাজধানী আগরতলাতেও হু হু করে বেড়েছে খুন, ধর্ষণ, ডাকাতি। একটা ছোট্ট সুন্দর রাজ্যকে তছনছ করে দেওয়ার নিখুঁত ব্যবস্থা!‌ ১৭ মাসে তিনজন মুখ্যসচিবকে সরানো হয়েছে, না, কেউ অবসরে যাননি, সরানো হয়েছে। ডিজি বাধ্যতামূলক ছুটিতে। অনেকে বরখাস্ত। বদলি শত শত। তিতিবিরক্ত এক আইএএস অফিসার ইস্তফা দিলেন।
বিপ্লব দেবের হাতে আছে ২৭টি দপ্তর। রেকর্ড অপূর্ব। ২৭টিতেই নিরঙ্কুশ ব্যর্থ। ১৭ মাস রাজনীতি করে মুখ্যমন্ত্রী। পরের ১৭ মাসে বুঝিয়ে দিয়েছেন, তিনি ব্যর্থ থাকতে বদ্ধপরিকর!‌ কেউ তাঁকে টলাতে পারবে না। ঝুড়ি ঝুড়ি প্রতিশ্রুতি ছিল। যথা, বিজেপি ক্ষমতায় এলেই ঘরে ঘরে চাকরি হবে, মিসড কল দিলেই চলবে। চাকরি হয়নি, উল্টে বিপুল কর্মী সঙ্কোচন। প্রতিশ্রুতি, শিল্পের জোয়ার বইবে, মাথার ওপর মোদিজি আছেন। একটাও না। প্রতিশ্রুতি, সব ডিএ মিটিয়ে দেওয়া হবে, এক টাকাও বকেয়া থাকবে না। ১৭ মাসে একবারও বর্ধিত ডিএ ঘোষণা হয়নি।
জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। বেড়েই চলেছে। জ্বালানির দামও বাড়ানোর ক্ষেত্রে অবদান রাজ্যের। পুরকর বেড়েছে। আগরতলা ফ্লাইওভারের কাজ আগের সরকার যাওয়ার আগেই ৯৫%‌ হয়ে গিয়েছিল। বাকি ৫%‌?‌ একই জায়গায়। রাজ্যবাসীর ধারণা, তিন বছরেও হবে না। একটা, একটা প্রকল্পও হয়নি। হ্যাঁ, একটা উদ্যোগ স্পষ্ট। মদের দোকান দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বিজেপি নেতা বিধানসভায় বুঝিয়েছেন, কতটা মদ্যপান স্বাস্থ্যের পক্ষে প্রভূত উপকারী। স্বাস্থ্যের উপকার?‌ তা, কী করেছে ‘‌বিপ্লব’‌ সরকার?‌ সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত, গরিব মানুষের বিনামূল্যে চিকিৎসা কার্যত তুলে দেওয়া হল (‌মুখ্যমন্ত্রী অবশ্য এখনও বলেননি, সরকারি চিকিৎসায় জিডিপি কমে!‌)। ঠিকাদার বেছে দিচ্ছে দিল্লি, নাগপুর। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা সর্বার্থেই পথে বসেছেন। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সম্পর্কে আরও একটা তথ্য। ১৭ মাসে ডাক্তার নিগ্রহ বিপুলভাবে বেড়েছে (‌মুখ্যমন্ত্রী অবশ্য এখনও বলেননি, ডাক্তারদের মারলে জিডিপি বাড়ে!‌)‌।
ছোট্ট সুন্দর প্রতিবেশী রাজ্যের এই অবস্থা। এই বিজেপি বাংলায় ক্ষমতায় আসতে চাইছে। নিরন্তর অপপ্রচার, ধর্মীয় বিভেদের কুৎসিত রাজনীতি, এজেন্সি, অঢেল টাকা। ত্রিপুরার জনসংখ্যা ৩৭ লাখ, বাংলায় ১০ কোটি, ২৭ গুণ। ওরা পেরে উঠবে না। তবু, যাঁরা বিভ্রান্ত, তাঁরা আজকের ত্রিপুরার দিকে তাকান। বুঝুন।  ‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top