প্রণম্য কবি ‘‌বেঁধে বেঁধে’‌ থাকার কথা বলেছিলেন। যথাসম্ভব চেষ্টা করেছি। কিন্তু, এখন, ছেড়ে ছেড়ে থাকার সময়। চেষ্টা করছি, কী করে ছেড়ে ছেড়ে বেঁধে বেঁধে থাকা যায়।
রণবীর সিং দিল্লির রেস্তোরাঁর হোম ডেলিভারির কাজ করতেন। গ্রামের বাড়ি, ‘‌দেশ’‌, ৩২৫ কিলোমিটার দূরে। কাজ নেই, খাদ্য নেই, ট্রেন নেই, বাস নেই। হাঁটতে শুরু করলেন। ২০০ কিলোমিটার পার হওয়ার পর, আর পারলেন না। পথেই মৃত্যু। এমন হাজার হাজার মানুষ পথে। কত কত মানুষ জানেন না, কাল কী খাবেন। একটু জানি, চিনি না, চিনি না। পরিচিতরা মধ্যবিত্ত, কয়েকজন বেশ সচেতন উচ্চবিত্ত। ফোনে কথা, বেঁধে বেঁধে থাকা। অগ্রজকে ফোন। এত বয়সেও সারাক্ষণ বাড়ির বাইরে, চলে যায় দেশের নানা প্রান্তে। বলল, ‘‌গুহার বাঘের মতো ঘরে হাঁটছি, রাগছি– নিজের ওপর।’‌ বললাম, ‘‌গুহাতে থাকো।’‌ বন্ধু, জাগ্রত ব্যবসায়ী ফোন করতেই বলল, ‘‌সাবধানে আছি।’‌ আসলে সারা দিন ফোন পাচ্ছে ‘‌সাবধানে থেকো।’‌ ফোন ধরেই বলে দিল, আছি।
প্রখর নাট্য–ব্যক্তিত্ব। বলল, ‘‌আচ্ছা, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের ওপর লিখেছিলেন, আবার পড়লাম, এত ক্লোজ ছিলেন, আরেকটু লিখলেন না কেন?‌’‌ জিজ্ঞেস করলাম, ‘‌কী করছ?‌’‌ জবাব, ‘‌শেক্সপিয়রের ওপর একটা প্রবন্ধ লিখলাম। একটা নাটক মাথাতে ঘুরপাক খাচ্ছে। লিখব।’‌
শিল্পোদ্যোগী, ছাত্র আন্দোলনের সময় থেকে চিনি, সচেতন। রোজ ২ ঘণ্টা পড়ে। বলল, বেশি করে শুনছি গানবাজনা। একদিন, শুধু হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়ার বাঁশি। পরদিন, মেহেদি হাসানের গজল। করোনা নিয়ে মূল খবরটুকু দেখছি, তার বেশি না। শুনছি, কত গান, কত বাজনা, কত সুর অধরা থেকে গেছে।’‌ ৯০–ঊর্ধ্ব শাস্ত্রীয় সঙ্গীত সাধক। অনুষ্ঠানে গান করেন, রেডিওতে। কী করছেন?‌ ‘‌নিজে গাইছি, সাধনা শেষ হয়নি। কয়েকজনকে ফোনে শেখাচ্ছি।’
ক্রিকেটার, লড়াকু। এখন বাচ্চাদের শেখায়, মাঠে পড়ে থাকে। বলল, ‘‌মাঠই জীবন। ছেলেরা জিজ্ঞেস করছে, স্যর, কবে যাব?‌ উত্তর নেই। মা–বাবারা বলছেন, ওদের ধরে রাখতে পারছি না, কবে মাঠে যেতে পারবে?‌’‌ জনপ্রিয় সাহিত্যিক। সহযোগী। জিজ্ঞেস করলাম, ‘‌নতুন গল্প–উপন্যাস লিখছ।’‌ বলল, ‘‌ভাবছি। হয়তো পরে আসবে দারুণভাবে।’‌ একসময়ের দুর্ধর্ষ ফুটবলার। বলল, ‘‌বই বাছছি। আজ কী পড়ব, কাল কী পড়ব। গান শুনছি। আচ্ছা, কত ভাল ভাল সিনেমা, সত্যজিতের, অন্যদের, দেখায় না কেন?‌ হবিজাবি ফিল্ম ছেড়ে, ভাল ভাল দেখানো যায় না?‌’‌
বেসরকারি সংস্থার কর্মী। বলল, ‘‌দু–বার বাজারে যেতে হল।’‌ কেন?‌ বলল, ‘‌দ্বিতীয়বার গেলাম টমেটো কিনতে।’‌ বললাম, ঢ্যাড়শ, টমেটো ইত্যাদি না থাকলে পরে নেবেন, এত বাজারে কেন?‌ বাইরে–থাকা তরুণ অধ্যাপক। জেএনইউ–প্রাক্তনী বলল, ‘‌পড়া জমে ছিল। পড়ছি। অনলাইনে ক্লাস চালু হবে, নতুন ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছি। আর ভাবছি, লক্ষ লক্ষ মানুষের কী হবে, অসুখে না হলে অনাহারে মরবেন। ভাবছি, মনে মনে কাঁদছি, রাগছি।’‌ ষোলো বছর বয়সি কিশোরীর বিরুদ্ধে মা–বাবার বিস্তর অভিযোগ, পড়তে চায় না, পড়তে চায় না। আরও ভাল রেজাল্ট না হলে ভাল জায়গায় ভর্তি হতে পারবে না। কিশোরী বলল, ‘‌জেঠু, স্কুলে যেতে ইচ্ছা করছে, ক্লাস করতে ইচ্ছা করছে, বেশি পড়তে ইচ্ছা করছে।’‌
ছোটবেলার কথা মনে পড়ছে উটকো সাংবাদিকের। বাড়িতে থাকত ক্যারম, দু’‌জনে খেলা যায়। নেই। লুডো, সাপলুডো দু’‌জনে খেলা যায়। নেই কারও বাড়িতে। ব্যাগাডুলি, দু’‌জনে খেলা যায়, যেত। সব চলে গেছে। ‌লুডোর খোঁজে বেরিয়েছিলেন নামী ফিজিকাল ট্রেনার,  পাননি। বাড়িতে তাস ছিল, আছে। এখন স্ত্রীর সঙ্গে রংমিলান্তি খেলছেন।
জেনে গেছি, কী কী করতে হবে, কী কী নয়। একবার নয়। বারবার হাত ধুতে হবে। ঘরবন্দি থাকতে হবে যথাসম্ভব। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি দেখিয়ে দিচ্ছেন, গোল গোল দাগ কেটে, কীভাবে ছড়িয়ে দাঁড়াতে হবে। একটা কথা এসেছে বিশ্ব জুড়ে, ‘‌সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং।’‌ সামাজিক দূরত্ব। ব্যাপারটা তা নয়। সামাজিক দূরত্ব নয়, শারীরিক দূরত্ব। ‘‌বাঁচতে হলে, বাঁচাতে হলে, শারীরিক দূরত্ব। তার মানে হতে পারে না ‘‌সামাজিক দূরত্ব।’‌ এই ভয়াবহ সময় শিখিয়ে যাচ্ছে, শারীরিক দূরত্ব রেখেও সামাজিক নৈকট্য ধরে রাখা যায়। স্বাস্থ্যবিধি মানার সঙ্গে সঙ্গে, মানসিক দূরত্ব কমাতে হবে। একটু ফোন, কথা বলা, কণ্ঠস্বর যেন পরস্পরের ভরসা। কথাটা নয়, পরস্পরের গলাটা ভরসা, একসঙ্গে থাকা। ছেড়ে ছেড়ে থেকেও বেঁধে বেঁধে থাকা।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top