বরেণ্য মূকাভিনেতা যোগেশ দত্তের বাড়িতে, অনেক সকাল–‌দুপুরে সান্নিধ্য পেয়েছি পাহাড়ি সান্যালের। কত কী জানতেন এবং বোঝাতেন। সত্যজিৎ রায়ের গভীর অনুরাগী। বলতেন, আমি ভাই সত্যজিতের ভক্ত। কাঞ্চনজঙ্ঘা, অরণ্যের দিনরাত্রি। স্মৃতিচারণে ঝরে পড়ত মুগ্ধতা। এক দুপুরে শুনলাম, আগের সন্ধেয় দেখেছেন ‘‌অশনি সঙ্কেত’‌। এই প্রথম আগে সত্যজিতের কথা নয়। বললেন, ‘‌আহা, আহা। কী অভিনয় করল সৌমিত্র। আর কেউ এরকম পারত না। রাতে ভাবছিলাম, গোটা ছবিটা জুড়ে যেন ছড়িয়ে গেল, কী বলব.‌.‌.‌ আলো।’‌
এই উটকো সাংবাদিকের চেয়ে অনেকে সৌমিত্রকে অনেক বেশি দেখেছেন, জেনেছেন। ১৯৮৮ সালে প্রকৃত আলাপ। তারপর গত ৩২ বছরে যদি ৬৪ বার পেয়ে থাকি তঁাকে, সবই নিখাদ আড্ডায়। ইন্টারভিউ নয়। যতটুকু পেয়েছি, স্মৃতিচারণে কয়েকটা বিষয় আনতে পারি, যা হয়তো বেশি আলোচিত নয়। তর্কযোগ্যভাবে বাংলার চিরশ্রেষ্ঠ অভিনেতার অনুরাগ ও ব্যাপ্তি বিস্ময়কর। প্রথম ‘‌দেখা’‌ অবশ্য ১৯৭০ সালে। ময়দানে রবীন্দ্র জয়ন্তী। পাজামা–‌পাঞ্জাবি, ৩৫ বছর বয়সি মায়াবী নায়ক উঠলেন মঞ্চে। আবৃত্তি, দুরন্ত আশা। ‘‌মর্মে যবে মত্ত আশা সর্পসম ফোঁসে। অদৃষ্টের বন্ধনেতে দাপিয়া বৃথা রোষে’‌.‌.‌.‌। পরে যখন উচ্চারিত হচ্ছে ‘‌ইহার চেয়ে হতেম যদি আরব বেদুইন’‌.‌.‌.‌ চিরস্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে থাকল। দেখেছি কফি হাউসে কয়েকবার। আলাপ নয়।
সত্যজিৎ সম্পর্কে তঁার অগাধ শ্রদ্ধা ও মুগ্ধতার প্রসঙ্গ আসত প্রায় সব আড্ডায়। কখনও খারাপ লেগেছে কোনও কারণে?‌ সৌমিত্র ‘‌হ্যাঁ। মানিকদার সব ছবির প্রথম স্ক্রিপ্ট রিডিংয়ে থাকতাম। সেদিন ‘‌গুপী গাইন বাঘা বাইন।’‌ জিজ্ঞেস করলেন, কী বলছ সৌমিত্র?‌ বললাম, ‘‌একটাই খারাপ, আমার রোল নেই‌!‌’‌ অনেক পরে, এক সন্ধেয় কথা হচ্ছিল সত্যজিৎ–‌সাহিত্য নিয়ে। বললেন, তারিণী খুড়োকেও ফেলে দিতে পার না!‌ আর, কী সব গল্প। ফেলুদা আর শঙ্কু মানিকদার কারেক্টারের দুটো এক্সটেনশন।’‌ পরে, অনেক চাপাচাপির পর লিখলেন ‘‌মানিকদার সঙ্গে’‌।‌ প্রকাশের পরে বললেন, ‘‌টেন পার্সেন্টও বলা হল না!‌’‌
ঘরে ঢুকে দেখলেন গাভাসকারের তিনটে বড় ছবি। মন দিয়ে দেখে বললেন, ‘‌ডিফেন্স নয়, তিনটেই অ্যাটাকিং শট। লোকে শুধু ওঁর ডিফেন্সের কথা বলত।’‌ বলতেন, ‘‌ভারতের সর্বকালের এক নম্বর ব্যাটসম্যান সুনীল গাভাসকার। দু’‌নম্বর বিজয় হাজারে। তিন নম্বর শচীন তেন্ডুলকার।’‌ কয়েক মাস পরে দেখা হতেই বললেন, ‘‌শোনো, প্রথম দুটো ঠিক আছে, কিন্তু থার্ড একজন নয়, জয়েন্টলি শচীন আর দ্রাবিড়।’‌ কিশোর বয়সে হাওড়া থেকে এসে ইডেনে ডেনিস কম্পটনের ব্যাটিং দেখেছিলেন। বলতেন, ‘‌সেই প্রথম বুঝলাম, বড় ব্যাটসম্যান কাকে বলে।’‌
এক আড্ডায় বাড়িতে। আমরা তিনজন। এই অধম, সুরজিৎ সেনগুপ্ত, অলক চট্টোপাধ্যায়। উত্তমকুমারের কথা উঠল। কেউ বোধহয় বলে ফেলেছিলাম, ‘‌আপনার তুলনায় উত্তমকুমার পিছিয়ে। এত ভ্যারাইটি ছিল না।’‌ জীবনে এই একবারই সৌমিত্রদাকে রাগতে দেখেছি। যেন তীরের মতো ছিটকে বেরোলেন, ‘‌কী বলছ তোমরা?‌ পুরোদস্তুর নায়ক বলতে তো ওই একজনই। দশটা ছবির নাম 
বলতে পারি, যেখানে উত্তমদা আনপ্যারালাল। জানো না, বোঝো না, বাজে কথা বল কেন?‌’‌ মুড ফেরাতে পনেরো মিনিট লাগল।
শিশির ভাদুড়ীর কথা ছেড়েই দিন। ছবি বিশ্বাস, কমল মিত্র, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, তুলসী চক্রবর্তী, জহর রায়, উৎপল দত্ত.‌.‌.‌ কথা তুলতে হত না। কী শ্রদ্ধা। এবং বোঝাতেন, কেন ওঁরা বড়। কত কী শিখেছেন ওঁদের থেকে। পরে প্রকাশিত হল ‘‌অগ্রপথিকেরা’‌।‌ বললেন, কিছুই তো বলা হল না!‌
তঁার নাটকের কথা তুললে, অনর্গল। সেই ‘‌নামজীবন’‌ থেকে তঁার প্রায় সব নাটক দেখেছি। একবার ‘‌হোমাপাখি’‌ নিয়ে আপ্লুত হয়ে লিখলাম ‘‌স্যর’‌।‌ সেদিন সকালে ফোন। ‘‌উদ্বুদ্ধ বোধ করছি!‌’‌ ভাবুন এই সামান্য সাংবাদিকের লেখা পড়ে তিনি উদ্বুদ্ধ!‌ ‘‌টিকটিকি’‌ দেখে পাঠালাম ট্র‌্যাক স্যুট। ফোন:‌‌ ‘‌আরে, দারুণ। কাজে লাগবে।’‌
১৯৯৯। ৭ সেপ্টেম্বর। ‘‌নবজাগরণ’‌ সংগঠনের যাত্রা শুরু। সভাপতি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। সবার কথা মন দিয়ে শুনলেন, উইংসের পাশে দঁাড়িয়ে। ‘‌বাংলার মাটি বাংলার জল’‌ গাইলেন ইন্দ্রনীল সেন, গলা মেলালেন সৌমিত্র। সভাপতির ভাষণ। বাঙালিদের ব্যবসা–‌বাণিজ্যেও আসা উচিত, একমত হয়ে ব্যাখ্যা দিলেন। বাংলায় ইতিবাচক কয়েকটা দিক তুলে ধরলেন। বাংলার ধর্মনিরপেক্ষ ঐতিহ্যের কথা বলতে বলতে তঁার মন্তব্য, ‘‌আমাদের উত্তরাধিকার বহন করতে হবে। আর, আর একটা কথা শেষে বলছি, এই বিচ্ছিরি সমাজটাকে পাল্টাতে হবে।’‌ মুগ্ধ শ্রোতারা উঠে দাঁড়ালেন। কী বলব, ছড়িয়ে পড়ল, 
পাহাড়ি সান্যালের ভাষায়— আলো।‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top