অসম থেকে সুমনা চৌধুরি ফেসবুকে না লিখলে জানা যেত না। চল্লিশ লক্ষ মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকণ্ঠিত আমরা। কিছুটা বিদ্রুপের সুরেই সুমনা লিখেছেন, ‘‌অসমের ইতিহাস, অসম চুক্তি, অসমিয়া–‌অনসমিয়া সম্পর্ক, বিজেপি, কংগ্রেস, আসুর রাজনীতি, ইত্যাদি নতুন করে চর্চা, আলোচনা–‌সমালোচনা ইত্যাদি চলছে। চলুক। আপত্তি নেই। কিন্তু যে কথাগুলো কেউ বলছে না, সেটা হল সাধারণ মানুষ কী ভয়ঙ্কর সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে, হচ্ছে এবং সম্পূর্ণ তালিকা প্রকাশ না হওয়া অবধি হবেও!’‌ ইতিমধ্যেই তালিকায় নাম না থাকার আশঙ্কায় বেশ কিছু মৃত্যু হয়েছে, সেই সংখ্যাটা কতয় গিয়ে দাঁড়াতে চলেছে? গুরুতর প্রশ্ন সন্দেহ নেই। প্রথম খসড়া প্রকাশের সময় যাঁদের নাম আসেনি, যাঁদের লিগ্যাসি ডেটা, বংশবৃক্ষের তথ্যে কিছু ভুল হয়েছিল বা এনআরসি কর্মীদের সন্দেহ হয়েছিল, তাঁদের ডাকা হয়েছিল সেন্টারে। ধরুন একজনের বাড়ি উত্তর করিমগঞ্জ ব্লকে, তাঁর ডাক পড়েছে গুয়াহাটি, জোরহাট, হোজাই সেন্টারে। দক্ষিণ করিমগঞ্জের অনেক মানুষের সেন্টার পড়েছিল উত্তর করিমগঞ্জ অথবা বদরপুর অথবা হাইলাকান্দি, কাছাড়ে। করিমগঞ্জ থেকে গুয়াহাটি যেতে বাসে, ট্রেনে এগারো ঘণ্টা সময় লাগে। রামকৃষ্ণনগর থেকে কালীগঞ্জ আসতে গাড়িতে তিন ঘণ্টা। উত্তর করিমগঞ্জের এক অসুস্থ মহিলা প্রচণ্ড গরমে সকাল আটটায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে বিকেল পাঁচটায় ফিরেছিলেন। সেন্টারে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় ঠাঠা রোদে। যাঁদের দিন আনি দিন খাই অবস্থা, তাঁরা গাড়িভাড়ার টাকাটাও কোথা থেকে জোগাড় করবেন? নিজের চোখে দেখা এই অনাচারের কথা লিখে সুমনা আমাদের মাথা হেঁট করে দিলেন যে!‌ সত্যিই তো, কী হবে ইতিহাস জেনে, কেন রাজনীতিকদের বিবৃতি ছেপেই যাব আমরা?‌ অশিক্ষিত মানুষজন কাগজ জমা দিতে প্রতিমুহূর্তে নাজেহাল হয়েছেন। কোনও নথি হয়তো অফিসারদের মতে ঠিক নয়, আবার উৎকণ্ঠা নিয়ে বাড়ি ফিরে পরের দিন লাইনে।‌ ‘‌ক্লেম অ্যান্ড অবজেকশন’‌ ঘোর সন্দেহজনক। শত্রুতাবশত কেউ আপনার দাবিতে আপত্তি জানাতে পারে। প্রমাণের দায় অভিযুক্তের। তাঁকে আবার কাগজ, নথি নিয়ে দৌড়তে হবে সেন্টার আর ট্রাইবুনালে! গরিব মানুষ উকিল ধরার টাকা কোথায় পাবেন? মামলার টাকা কোথায় পাবেন? ডাউটফুল ভোটার হিসাবে চিহ্নিত করা হলে জেলে কয়েদিদের সঙ্গে পচে মরতে হচ্ছে প্রকৃত ভারতীয় হওয়া সত্ত্বেও। অনিশ্চয়তা, উদ্বেগের প্রতিটি মুহূর্ত তাঁরা কীভাবে কাটাচ্ছেন?‌ জানতে হবে, বুঝতে হবে, দাঁড়াতেই হবে পাশে।
 

জনপ্রিয়

Back To Top