জোট। রফা। বোঝাপড়া। আসন ভাগাভাগি। গোলাপকে যে–‌নামেই ডাকো...‌। সিপিএম–‌এ ঘোর বিতর্ক। কংগ্রেসের সঙ্গে কতটা ছোঁয়াছুঁয়ি?‌ একটা পথ খুলে দেওয়া হয়েছিল বটে, কিন্তু ২০১৬ বিধানসভা নির্বাচনে রফাটা প্রায় জোটের কাছাকাছি চলে গিয়েছিল বলে পরে সমালোচনাও করেছে কেন্দ্রীয় কমিটি। রাজ্য সিপিএম নেতারা সেই ‘‌তিরস্কার’‌ নিয়ে বেশি ভাবেননি। রাজ্য পার্টিতে যথেষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতার অনুমোদন পাওয়া গেছে, কেন্দ্রীয় কমিটির সমালোচনাকে বেশি গুরুত্ব না দিলেও এখন চলে হয়তো।‌ ২০১৯ লোকসভা ভোটে বাংলায় ‘‌জোট’‌ করা যাবে?‌ মানে, ওই আর কী, রফা?‌ ২০১৮ সালে হায়দরাবাদ পার্টি কংগ্রেসে ধুন্ধুমার বিতর্কের জন্য প্রস্তুতি নিয়েই গিয়েছিলেন রাজ্য নেতারা। সায় আদায় করেই ছাড়বেন। ইতিমধ্যে আর অস্বীকার করার উপায় থাকল না, সমদূরত্ব হাস্যকর, দেশে বিজেপি–‌ই প্রধান শত্রু। কেরলে, ত্রিপুরাতেও গেরুয়া বাহিনীর ভয়ঙ্কর চেহারা দেখতে হল। তবু, কংগ্রেসের সঙ্গে নির্বাচনী সম্পর্ক নয়, এমন বক্তব্যও মোটামুটি জোরদার ছিল। খোদ কেরলের কয়েকজন প্রতিনিধি কট্টর অবস্থান থেকে সরে এলেন। সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি স্পষ্টতই কংগ্রেসের সঙ্গে রফাপন্থী। সূর্যকান্ত মিশ্ররাও এসপার ওসপার করার জন্য তৈরি। শেষ পর্যন্ত হল সিদ্ধান্ত, রফা করা যাবে, তবে স্পষ্ট জোট নয়। পার্টির ভাষায় ‘‌নিষ্পত্তি’‌ হয়ে গেল। লোকসভা ভোটে রফা হচ্ছেই, হাওয়া ছড়াল। এখন বলা যায়, 
নিষ্ফল নিষ্পত্তি।
জটটা প্রথম পাকাল কংগ্রেস। ২০১৪ সালে সিপিএম তথা বামফ্রন্ট রাজ্যে ২টি আসন পেয়েছিল। রায়গঞ্জ, মুর্শিদাবাদ। কংগ্রেস ৪। বহরমপুর, জঙ্গিপুর, উত্তর মালদা, দক্ষিণ মালদা। কংগ্রেস বলল, রায়গঞ্জ ও মুর্শিদাবাদ আসনও চাই!‌ কথাবার্তা ভাঙার মুখে, রাহুল গান্ধীর নির্দেশ, না, সিপিএম–‌এর জেতা দুই আসনে প্রার্থী দেওয়া যাবে না। মেনে তো নিতেই হয়, মেনে নিল প্রদেশ কংগ্রেস। কিন্তু ধোঁয়া থাকল। রায়গঞ্জের নেতা মোহিত সেনগুপ্ত সরাসরি বলে দিলেন, দীপা দাসমুন্সি প্রার্থী হবেনই। 
কংগ্রেসের মান্নান, দীপা, শঙ্কররা প্রায় অনড়। পুরুলিয়া, বসিরহাট নিয়েও জট।
আর কত অপেক্ষা করা যায়, বিমান বসু এক দফা প্রার্থী ঘোষণা করে দিলেন। রায়গঞ্জে সেলিম, মুর্শিদাবাদে বদরুদ্দোজা। উল্লেখযোগ্য, ঘোষণার এক ঘণ্টার মধ্যেই সেলিমের নামে দেওয়াল–‌লেখা হয়ে গেল। সেই ছবিও ছড়িয়ে গেল। কংগ্রেসের বলার সুযোগ, যখন কথাবার্তা চলছে, তার মধ্যেই কেন এক দফা প্রার্থী 
ঘোষণা করল বামফ্রন্ট?‌ ৪২–‌এর মধ্যে ২৫ আসনে প্রার্থী ঘোষণা। এর মধ্যে একটা, বীরভূম। প্রাথমিক কথা ছিল, চিকিৎসক নেতা রেজাউল করিম দু–‌পক্ষের সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে থাকবেন। কংগ্রেস চিকিৎসক সেল–‌এর চেয়ারম্যান রেজাউল করিম কী করে বামফ্রন্ট প্রার্থী হন?‌ বহিষ্কার করল কংগ্রেস। জট আরও পাকল। বোঝাপড়ার 
উপযুক্ত পরিবেশ বটে!‌
শরিকরা কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বা রফায় অনিচ্ছুক, জানা ছিল। পরিষ্কার হয়ে গেল পুরুলিয়া, বসিরহাটে। পুরুলিয়ায় কংগ্রেস দিতে চায় দলের 
শক্তিশালী নেতা নেপাল মাহাতোকে, ফরওয়ার্ড ব্লক নারাজ। বসিরহাট চায় কংগ্রেস, সিপিআই নারাজ। দিল্লিতে 
কেন্দ্রীয় দপ্তরে যিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের দায়িত্বে, দপ্তরের আরও কাজে যুক্ত দীর্ঘদিন, সেই পল্লব সেনগুপ্ত বসিরহাটে ঘোষিত বাম প্রার্থী। পল্লববাবু জিতবেন না। কিন্তু আসনটায় দাঁড়ানোর হক ছাড়বে না সিপিআই। 
জোট বা রফার উপযুক্ত পরিবেশ বটে!‌ শোনা যাচ্ছে, বহরমপুর ও দক্ষিণ মালদায় প্রার্থী দেবে না বামফ্রন্ট। কেন, অবশিষ্ট সদিচ্ছার প্রকাশ?‌ মালদায় প্রচারে আসা রাহুল গান্ধীকে বার্তা?‌
প্রায় ৮ বছর, বিধানসভায় বাম–‌কংগ্রেসের বিপুল বোঝাপড়া। মান্নান–‌সুজন দাদা–‌ভাই। নানা ইস্যুতে নানা নামে একসঙ্গে সিপিএম ও কংগ্রেস নেতারা। মুশকিল হল, দুই পক্ষের তৃণমূল স্তরে বোঝাপড়া ছিল না, নেই। সারদা মামলায় মান্নানকে সহায়তা দিলেন বিকাশ ভট্টাচার্য। বিকাশ সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত মান্নান। সেই মান্নানই এখন প্রবল জোট–‌বিরোধী। কংগ্রেসে কে যে কখন কোন দিকে যান!‌ সোমেন মিত্র এসব জানেন, কিন্তু এতটা?‌ হয়তো স্তম্ভিত। কিছু করার নেই। সুতরাং, ৪২ আসনেই লড়ব!‌ তা লড়তেই পারেন। বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস মিলিয়ে ৬টি আসন ছিল। এখন সব আসন চূড়ান্ত অনিশ্চিত করে দিলেন দুই পক্ষ, যদি বলেন সাফল্য, বলতে পারেন!‌
যা দাঁড়াল, ২০২১ বিধানসভা ভোটেও রফার দফারফা। ২০১৬ বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের ভোট ট্রান্সফার 
হয়নি বামফ্রন্টের দিকে, প্রমাণিত। তবু সিপিএম নেতারা রফার জন্য মরিয়া ছিলেন। বিধানসভায় বোঝাপড়া বায়বীয় ছিল, সেটাও প্রমাণিত হয়ে গেল। ভাবছি, এরপর যখন বিধানসভার অধিবেশন বসবে, মান্নানের ঘরে গিয়ে চা খাবেন সুজন?‌
এবার প্রশ্ন, রফা তো হল না। সিপিএম–‌কংগ্রেসের আরও ক্ষয় নিশ্চিত। সমর্থকরা কোন দিকে যাবেন?‌ দুই পক্ষই নিশ্চিত করে দিয়েছে, লড়াইটা হবে অনেক এগিয়ে–‌থাকা তৃণমূলের সঙ্গে দেড়শো মাইল পিছিয়ে–‌থাকা বিজেপি–‌র মধ্যে। বিজেপি কি উল্লসিত?‌ মনে হচ্ছে না। তৃণমূল–‌বিরোধী ভোট সহজে টানা যাবে না। গেলেও, বেশি না। হতাশ বাম ও কংগ্রেস সমর্থকরা কী করবেন?‌ দু–‌তিনটে কেন্দ্রে স্থানীয়ভাবে প্রার্থীকে জেতানোর চেষ্টা চালু থাকবে। কিন্তু রাজ্যে প্রতিক্রিয়া?‌ শোচনীয়। কংগ্রেস নেতারা গোটা রাজ্য নিয়ে ভাবছেন না। কিন্তু সিপিএম?‌ ভোটে শতাংশ বলে একটা ব্যাপার আছে। তৃণমূলের দুশ্চিন্তা নেই, কংগ্রেসের হেলদোল নেই। সিপিএম তথা বামফ্রন্ট যদি শতাংশের হিসেবে বিচ্ছিরি জায়গায় নেমে আসে, কর্মীদের একটুও চাঙ্গা রাখা যাবে?‌ যাঁরা বামেই থাকবেন, তাঁরা কত শতাংশ?‌ মমতা–‌বিদ্বেষের জেরে বেশ কিছু বাম সমর্থক গেরুয়া চিহ্নে বোতাম টিপবেন না তো?‌ আটকাতে পারবেন সিপিএম নেতারা?‌ তৃণমূলের বিশেষ ক্ষতি হবে না, বিজেপি ভদ্রস্থ শতাংশে হয়তো চলে যাবে। কংগ্রেস–‌কংগ্রেস করে অনেক সময় ও শ্রম চলে গেল না?‌ ‘‌নিষ্পত্তি’‌ কী দিল?‌ হাতে শুধুই ব্যর্থতার (‌সুকুমার রায় কথিত)‌ পেনসিল?‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top