সিদ্ধার্থ জোয়ারদার: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে আমরা একজন সংস্কৃত পণ্ডিত, সমাজ সংস্কারক এবং দয়ার সাগর হিসাবেই জানি। কিন্তু তিনি যে একজন প্রগতিশীল, বিজ্ঞানমনস্ক তথা বিজ্ঞান অনুরাগী ছিলেন, সে বিষয়ে আমরা অনেকেই অবগত নই। কারণ তঁার জীবনের নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে বিস্তারিতভাবে আলোচনা হলেও, তঁার চরিত্রের এই দিকটিতে সেভাবে আলোকপাত করা হয়নি।
পাঠ্যজীবনে বিদ্যাসাগর বিজ্ঞান চর্চা করেননি;‌ কিন্তু পরবর্তী সময়ে তঁার আচার–‌আচরণে একজন সার্থক বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের রূপ আমরা দেখতে পাই। তিনি যে বিজ্ঞানের তত্ত্ব, তথ্যাদি ও আবিষ্কারের খবরাখবর রাখতেন, তা তঁার কাজকর্মে প্রমাণিত। বিজ্ঞানের মৌলিক বই তিনি না লিখলেও ছাত্রদের পঠনের অসুবিধার কথা ভেবে মেধাবী পণ্ডিতমশাই বিজ্ঞানের অঙ্গনে প্রবেশ করতে দ্বিধাবোধ করেননি। উইলিয়াম ও রবার্ট চেম্বার্স ভ্রাতৃদ্বয় রচিত ইংরেজি বই ‘‌এক্সেমপ্লারি বায়োগ্রাফি’‌ থেকে কয়েকজন বিজ্ঞানীর জীবনী সঙ্কলন করে ‘‌জীবনচরিত’‌ নামে প্রকাশ (‌১৮৫০)‌ করেন। যে সমস্ত জীবনী ‘‌জীবনচরিত’‌–‌এ স্থান পেয়েছিল, তঁারা ছিলেন বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার কৃতবিদ্য ব্যক্তিত্ব। উদ্ভিদবিদ লিনিয়াস, জ্যোতির্বিদ কোপারনিকাস ও গ্যালিলিও, পদার্থবিজ্ঞানী নিউটন, ভূগোলবিদ ডুবাল এঁদের মধ্যে অন্যতম। তিনি ছাত্রদের সুবিধার জন্য বিজ্ঞান সংক্রান্ত কয়েকটি শব্দের পরিভাষা (‌ইংরেজি থেকে বাংলা)‌ ‘‌জীবনচরিত’‌–‌এর শেষে তৈরি করে যুক্ত করে দিয়েছিলেন, যার কয়েকটি আজও আমরা ব্যবহার করি।
বিদ্যাসাগর প্রণীত বিজ্ঞান প্রবন্ধ আলোচনা করতে হলে, ‘‌বোধোদয়’‌ চতুর্থ ভাগের উল্লেখ করতে হয়। প্রধানত, ‘‌চেম্বার্স রুডিমেন্টস অফ নলেজ’‌ বইয়ের অনুকরণে ‘‌বোধোদয়’‌ বইটি লেখা। ‘‌বোধোদয়’‌–‌এ বিজ্ঞানের নানা বিষয়ের ওপর লেখা আছে। জড়পদার্থ থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রাণী, উদ্ভিদ, মানবজাতি, পঞ্চ ইন্দ্রিয়, ধাতু, কৃষিকর্ম, জল, নদী, সমুদ্র অর্থাৎ প্রাণিবিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা, শারীরবিদ্যা, গণিত, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, ভূবিদ্যা ইত্যাদি বিষয়ে প্রবন্ধ এতে স্থান পেয়েছে। বইটির মাধ্যমে জগৎ সম্বন্ধে কিশোরদের সম্যক ধারণা গড়ে তোলার প্রয়াস তাঁর সমগ্র চিন্তাধারার মধ্যে ছিল। ধাতু কী— সে সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার জন্য নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী, যেমন থালা, বাটি, ঘটি, ছুরি, কঁাচি, পারদ, সোনা, রূপা, হীরা, তামা তিনি লেখায় ব্যবহার করেছেন। তঁার উদ্দেশ্য ছিল প্রাথমিক জ্ঞানার্জনের পর উৎসুক ছাত্ররা বিশদে এদের সম্পর্কে পড়ে জেনে নেবে। তিনি এইভাবে বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে জীবনযাত্রার প্রয়োজনীয় তথ্য ও তত্ত্ব কিশোরদের সামনে তুলে ধরে তাদের বিজ্ঞান চেতনা জাগাতে প্রয়াসী হয়েছিলেন। ‘‌জীবনচরিত’‌ ও ‘‌বোধোদয়’‌ বই দুটিকে একযোগে বিজ্ঞানের বর্ণপরিচয় ও ধারাপাত বলে মনে করা হয়।
বিদ্যাসাগর ছিলেন সমসাময়িক সময়ে গণিত/‌বিজ্ঞানের বইয়ের লেখকদের প্রেরণাস্বরূপ। একদিকে যেমন নানাবিধ গ্রন্থাদি রচনায় পরামর্শ দিতেন, অন্যদিকে তাঁদের গ্রন্থাদি সংশোধনও করে দিতেন। প্রসন্নকুমার সর্বাধিকারী প্রণীত পাটিগণিত গ্রন্থের যেমন তিনি শব্দ সঙ্কলনে সাহায্য করেন, বীজগণিত বই রচনায় উৎসাহিতও করেন। চন্দ্রকান্ত শর্মাকেও তিনি গণিতাঙ্কুর প্রণয়নে উৎসাহিত করেছিলেন। অক্ষয়কুমার দত্ত প্রণীত বিখ্যাত গ্রন্থ ‌‘‌বাহ্যবস্তুর সহিত মানব প্রকৃতির সম্বন্ধ বিচার’‌–‌এর সংশোধন করে দেন স্বয়ং বিদ্যাসাগর।
বিদ্যাসাগরের বিজ্ঞানমনস্ক প্রগতিশীল মনন সমসাময়িক বেশ কিছু বিদ্বজ্জনকে আকর্ষিত ও প্রভাবিত করেছিল। এঁদের মধ্যে লেখক চূড়ামণি অক্ষয়কুমার দত্ত ও প্রখ্যাত চিকিৎসক মহেন্দ্রলাল সরকার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পাশ্চাত্য জ্ঞান–‌বিজ্ঞান বাংলা ভাষায় রচনা করে বাঙালির বিজ্ঞান মানসিকতার ব্যাপ্তি ঘটাতে চেয়েছিলেন তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার সম্পাদক (‌১৮৪৩ থেকে ১৮৫৫ পর্যন্ত)‌ অক্ষয়কুমার। বিদ্যাসাগরের সমবয়সী অক্ষয়কুমার (‌জন্ম ১৫ জুলাই, ১৮২০)‌ ছিলেন বিদ্যাসাগরের মতোই জড়বাদী। তিনি মনে করতেন বিজ্ঞান মানসিকতায় ভাবাবেগ, বিশ্বাস, নিজস্ব চিন্তাভাবনার অনড়তার স্থান নেই। যদি বা কিছু থাকে, তবে তা আপেক্ষিক। নতুন তথ্য আবিষ্কারের মধ্যে দিয়ে সত্য নতুনভাবে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়। মনের এই স্থিতিস্থাপক গতিময়তা হচ্ছে বিজ্ঞান মানসিকতার বৈশিষ্ট্য। বাস্তববাদী অক্ষয়কুমার যে ভাববাদী মানসিকতার ঘোর বিরোধী ছিলেন, তা তঁার যুক্তিবাদী সমীকরণ থেকে সহজেই অনুমেয়। তঁার সমীকরণটি এইরকম— পরিশ্রম +‌ প্রার্থনা =‌ শস্য, পরিশ্রম =‌ শস্য। অতএব, প্রার্থনা =‌ শূন্য। আর ঠিক এ কারণেই তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা পরিচালনা ঘিরে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে তঁার মতান্তর ও মনান্তর চরমে ওঠে। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ বলেছিলেন— ‘‌.‌.‌.‌আমি খঁুজিতেছি ঈশ্বরের সহিত আমার কি সম্বন্ধ, আর তিনি খঁুজিতেন বাহ্যবস্তুর সহিত মানব প্রকৃতির কি সম্বন্ধ। আকাশ পাতাল প্রভেদ।’‌ বিরোধ এতটাই প্রকট হয়, যে শেষপর্যন্ত অক্ষয়কুমার তত্ত্ববোধিনী–‌র সম্পাদনা থেকে বিরত হন (‌১৮৫৫)‌ এবং বিদ্যাসাগর মহাশয়ের আহ্বানে তঁার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষকশিক্ষণ বিদ্যালয় ‘‌নর্ম্যাল স্কুল’‌–‌এ প্রধান শিক্ষক হিসাবে যোগ দেন। অক্ষয়কুমারের প্রথম গ্রন্থ ‘‌ভূগোল’‌ ১৮৪১ সালে প্রকাশিত হয়। তিন খণ্ডে প্রকাশিত ‌তঁার ‘‌চারুপাঠ’‌ (‌১৮৫২–‌১৮৫৯)–‌এর বেশির ভাগ রচনাই ছিল বিজ্ঞানভিত্তিক। জড়পদার্থ ও তার সাধারণ ধর্ম নিয়ে এই বইতে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। তঁার অমর সৃষ্টি ‘‌বাহ্যবস্তুর সহিত মানব প্রকৃতির সম্বন্ধ বিচার’‌ একটি কালোত্তীর্ণ গ্রন্থ। পরিভাষা সৃষ্টিতেও তিনি অবদান রেখে গেছেন। ‘‌ভারকেন্দ্র’‌, ‘‌তাড়িত’‌, ‘‌জড়ত্ব’‌ শব্দসমূহ তঁার অমরকীর্তি।
বিদ্যাসাগরের মতোই বিজ্ঞানমনস্ক ও দৃঢ় চরিত্রের মানুষ ছিলেন ডা.‌ মহেন্দ্রলাল সরকার। তিনি প্রথম জীবনে ছিলেন একজন কৃতবিদ্য অ্যালোপ্যাথ চিকিৎসক। কিন্তু নানা ঘটনা ও পরীক্ষা–‌নিরীক্ষার পর তঁার মনে হল অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসা রীতিতে রোগ পুরোপুরি সারে না। বরং হোমিওপ্যাথি রীতিতে চিকিৎসা করলে রোগ সম্পূর্ণরূপে সেরে যায়। তাই ডা.‌ সরকার তঁার পরবর্তী জীবনে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাকেই সঙ্গী করেন। ভারতীয় বিজ্ঞানমন্দির (‌ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দি কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স)‌ প্রতিষ্ঠা (‌১৮৭৬)‌ মহেন্দ্রলালের জীবনের অক্ষয়কীর্তি। বিদ্যাসাগরের মতো মহেন্দ্রলাল (‌জন্ম ১৮৩৩)‌ও বুঝেছিলেন এ দেশের দারিদ্র‌্য ও অজ্ঞতা দূর করতে হলে বিজ্ঞান শিক্ষার প্রয়োজন। আর দেশীয় বিজ্ঞান গবেষণার মাধ্যমে দেশের মানুষ মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। প্রয়োজন একটি দেশি বিজ্ঞান গবেষণাগার। গবেষণাগার তথা বিজ্ঞানচর্চা সম্বন্ধে তঁার মতামত ছিল এইরকম— ‘‌‘‌পূর্বকালে এ দেশে বিজ্ঞানচর্চার যথেষ্ট সমাদর ছিল। প্রাচীন হিন্দুরা আয়ুর্বেদ, রসায়ন, উদ্ভিদতত্ত্ব, মনোবিজ্ঞান ও আত্মতত্ত্ব ইত্যাদি বহু বিজ্ঞানের বীজ রোপণ করিয়াছিলেন, তবে দুঃখের বিষয় তার অনেক কিছুই প্রায় লোপ হইয়াছে। ভারতবর্ষীয়দের পক্ষে বিজ্ঞান শাস্ত্রের নিতান্ত আবশ্যক হইয়া পড়িয়াছে;‌ তন্নিমিত্ত ‘‌ভারতবর্ষীয় বিজ্ঞানসভা’‌ নামে একটি সভা কলিকাতায় স্থাপন করিবার প্রস্তাব হইয়াছে।’‌’ সম্পূর্ণ বেসরকারি উদ্যোগে কিছু সহৃদয় ব্যক্তির দানে এই প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। এই মহতী উদ্যোগে বিদ্যাসাগরের অনুপ্রেরণা, সাহচর্য ও আর্থিক সহযোগিতা ছিল চোখে পড়ার মতো। বিজ্ঞানসভার ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ছিলেন বিদ্যাসাগর।
সংস্কৃত পণ্ডিত হয়েও বিজ্ঞানের প্রকৃত দর্শন বিদ্যাসাগরের চিন্তা, চেতনা ও মননে আত্তীকরণ হয়েছিল বলেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক। অন্যদিকে, ধর্মীয় আচারের অন্তঃসারশূন্য আবেগকে তিনি কখনও প্রশ্রয় দেননি। এমনকি নিজের মা–‌বাবা ছাড়া অন্য কোনও দেবদেবীর মূর্তি বা ছবির কাছে মাথা নত করেননি কখনও। নিজের বাবা–‌মায়ের মধ্যেই পেয়েছেন বিশ্বেশ্বর ও অন্নপূর্ণার উপস্থিতি। গরিব–‌গুর্বো অসহায় মানুষের সেবার মধ্যেই খঁুজে পেয়েছেন ধর্মের প্রকৃত সত্য। তা এ হেন নাস্তিক এবং যুক্তিবাদী, উঁচু মন ও মানের মানুষকে আজ জন্ম দ্বিশতবর্ষে আমরা যখন স্মরণ করছি;‌ তখন মনে প্রশ্ন জাগে তঁার মূর্তি ভাঙা ও গড়া নিয়ে যঁারা সাম্প্রতিক কালে সক্রিয়তা দেখালেন, তঁারা সবাই বিদ্যাসাগরের বিজ্ঞানমনস্ক মানবতাবাদী ধর্মের সঙ্গে সহমত তো?‌

জনপ্রিয়

Back To Top