অশোক দাশগুপ্ত- ২৫ জুন, ১৯৮৩। ফাইনালে ভারত অলআউট ১৮৩। ভাঙা মন নিয়ে বাড়ির পথে। প্রাথমিক লেখা। পরে ফোন করব। বাকি ম্যাচ দেখছি বাড়িতে, সঙ্গী অলক চট্টোপাধ্যায়। ভিভ রিচার্ডস মারছেন। কী আর হবে, হারছি। ভিভের ব্যাটিং দেখে মনে হচ্ছে, ম্যাচ শেষ করে সেই রাতেই প্লেন ধরবেন। ভারতের একটা কপিলদেব ছিল। মদনলালের বলে ভিভের শট, ৩০ গজ দৌড়ে ক্যাচটা নিলেন অধিনায়ক। আমরা অফিসের পথে। লয়েডও আউট। শেষদিকে সামান্য প্রতিরোধ। কাপ। আজকাল–‌এ হেডিং— লর্ডসে সূর্যোদয়। লেখার শুরুটা ছিল এইরকম:‌ ‘‌একি স্বপ্ন?‌ একি মায়া?‌ মাথা তুলুন, সামনে তাকান, আমার–আপনার ভারতবর্ষ আজ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।’‌ লর্ডস ব্যালকনিতে কপিলদেবের হাতটা তুলে ধরলেন গাভাসকার।
লর্ডস। যখনই যাব লন্ডনে, প্রথমেই যেতে হবে লর্ডস–এ। কয়েক বছর পর, কাকভোরে লন্ডন। হিথরো এয়ারপোর্টে আমাদের লন্ডন সাংবাদিক, বন্ধু বাদশা হক। প্রথমেই বললাম, যাব লর্ডস। বাদশা বলল, দাদা, এক কাপ চা খান, টেমস নদীর পাশে একটা চক্কর দিন, তারপর। লন্ডন–চক্কর কিছুক্ষণ চলল। বাদশা বলে যায়, যাচ্ছি তো লর্ডস। দুপুর। টেস্ট ম্যাচ চলছে, ইংল্যান্ড–ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ঢুকেই ব্যালকনির দিকে চোখ। যেন দেখতে পাচ্ছি, কাপ হাতে কপিলদেব। ডমিনিক কর্ক উড়িয়ে দিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজকে। ইংরেজ দর্শকের মাঠে ঢুকে উল্লাস। এমন তো ইডেনেও দেখিনি।
১৯৮৩, ২৫ জুন বিশ্বকাপ জেতার মাত্রই পাঁচ সপ্তাহ পরে কলকাতায় এয়ারপোর্ট হোটেলে কপিলের ঘরে আমরা তিনজন। অনুরোধ, আপনার আত্মজীবনীর বাংলা অনুবাদটা আমরা ছাপতে চাই। দুধের গেলাসে চুমুক দিতে দিতে তিনি বললেন, ‘‌অটোবায়োগ্রাফি?‌ না না। যে–কোচ আমাকে দিয়ে পেস বোলিং হবে না বলেছিলেন, যে–‌সিলেক্টর ওয়ার্ল্ড কাপের দেড় মাস আগে বলেছিলেন, বেড়িয়ে এসো, সবার কথা বলতে হবে। আমি নেই।’‌
প্রস্তাব নাকচ, কিন্তু কথা তো বলা যায়। জিজ্ঞেস করলাম, ‌‘‌সানি বলেছেন, শ্রীকান্তও বলেছেন, একমাত্র আপনিই বিশ্বাস করে গেছেন, চ্যাম্পিয়ন হওয়া যায়। কী করে ভাবলেন।’‌ আরেক গ্লাস দুধ অর্ডার করে অধিনায়ক বললেন, ‘ওয়ার্ল্ড কাপের আগে আমরা ওয়েস্ট ইন্ডিজে গিয়ে ওদের একটা ম্যাচ হারালাম। বারবিসে।  রাতে দু’‌জন আমাকে এসে বলল, ‌কপিল, আমরা চ্যাম্পিয়ন হতে পারি।‌ সুনীল আর মহিন্দার। আমি তো সবসময় ভাবতাম, সবাইকে হারানো যায়, ওরা দু‌জন বলার পর আরও জোর পেলাম।’‌ ভিভের ক্যাচটা পেয়ে যাবেন, ভেবেছিলেন?‌ ‘‌আমি সব সময় ভাবি, সব কিছু করা যায়। জানতাম, পৌঁছলে, পড়বে না। কিন্তু ভিভ চলে গেলেও ওরা জিততে পারত। আমরা জিততে দিইনি। সানি রান পায়নি, স্লিপে দুটো ভাল ক্যাচ নিয়েছিল। আর বারবার বলছিল, কাপ আমাদের। মহিন্দর বলছিল, ১৮৩ অনেক রান, ওরা পারবে না।’‌
 ভারতে জোয়ার। পাড়ায় পাড়ায় স্বপ্ন। ভারত পারে। কেটে গেল ২৮ বছর। ২০১১। শচীন আউট মানে অর্ধেক শেষ। অটল গম্ভীর, চারে তো আসছেন যুবরাজ, টুর্নামেন্টের সেরা, কিন্তু এ কী, ঢুকলেন ধোনি। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে পিচে, যিনি ৬ মেরে ম্যাচ শেষ করবেন। বিরাট কোহলিরা কাঁধে তুলে নিলেন শচীনকে। তাঁকে একবার বিশ্বকাপ দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন ধোনি, প্রথম ম্যাচের আগেই। আমাদের একটা শচীন ছিল, যাঁকে কাঁধে তুলতে হয়। আমাদের একটা ধোনি ছিল, যে পারে। এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয় (‌সৌজন্য সুকান্ত)‌, ফাইনালে ব্যর্থ একজনকে কাঁধে তুলে নেয় টিম।
এবার আমাদের রোহিত, শিখর, বুমরা, সামি আছে। আর আছে একজন বিরাট কোহলি। যার হাতে উঠতেই পারে কাপ। আমাদের একটা ধোনি আছে, যাকে কাঁধে তুলে নেওয়া যায়। আছি, স্বপ্ন নিয়ে। ‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top