অভূতপূর্ব বিপদের মুখে আমরা। কী চাই এই সময়ে?‌ চাই সবল নেতৃত্ব। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি শুরু থেকে বলছেন, দেখাচ্ছেন, কীভাবে সতর্কতার পথে থাকা যাবে। শুধু আলাদা তহবিল করেননি, চিকিৎসা পরিকাঠামোর জন্য অভাবিত বরাদ্দ করছেন। পরিকাঠামোর জন্য সরকারি ব্যবস্থাকে জোরদার করার সঙ্গে সঙ্গে বেসরকারি হাসপাতালের প্রতিনিধিদের ডেকে যুক্ত করেছেন। আর্থিক কর্মকাণ্ড কার্যত বন্ধ হওয়ার মুখে। সবচেয়ে বেশি দুর্গতিতে পড়বেন স্বল্পবিত্ত মানুষ। সাড়ে সাত কোটি মানুষকে বিনামূল্যে ৬ মাস চাল দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন। বারবার বলছেন, আতঙ্কিত হবেন না, সতর্ক থাকুন। গুজব যাতে না ছড়ায়, সজাগ। ভরসা দিচ্ছেন। সতর্ক করে দিচ্ছেন, কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছেন, অতন্দ্র তিনি। 
পরিচ্ছন্ন থাকতেই হবে। এক ঘণ্টা পরপর স্যানিটাইজার বা সাবান দিয়ে হাত ধোয়া। মুখে হাত না–‌দেওয়া। ভিড় এড়ানো। কোনও উপসর্গ দেখা দিলে, ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া, প্রয়োজনে পরীক্ষা করানো। আমরা কতটা সতর্ক থাকছি?‌
মাটি ফুঁড়ে করোনা ভাইরাস দেশে আসেনি। প্রায় সব ক্ষেত্রে বিদেশ–‌যোগ। দেশে যতজনের মৃত্যু হয়েছে, যতজন আক্রান্ত হয়েছেন, বিদেশ থেকে সম্প্রতি এসেছেন অথবা কোনওভাবে বিদেশ থেকে আসা লোকের সংস্পর্শে এসেছেন। দেশে কার্যত ‘‌জরুরি অবস্থা’‌, কিন্তু এতদিন ধরে বিদেশের উড়ান চালু রাখা হয়েছে কেন?‌ কেন্দ্রের দায়িত্ব, বিমানবন্দরে চূড়ান্ত সতর্কতা, ব্যবস্থা। হয়নি। এখন হাততালি দেওয়া ও ঘণ্টা বাজানোর নিদান নিদারুণ পরিহাস।
বিদেশ থেকে এসে চূড়ান্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে, হু বলছে, মুখ্যমন্ত্রী বলছেন, কিন্তু বিলেতফেরত আমলা পুত্রের ঘটনা দেখিয়ে দিল, কতটা দায়িত্বজ্ঞানহীন হওয়া যায়। কুড়ি বছর বয়সি তরুণ অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করেন। দেশে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে অক্সফোর্ড থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়, আলোচ্য তরুণ কয়েকদিন আগে পার্টিতে যাঁর সঙ্গে ছিলেন, নেচেছেন, সেই তরুণী করোনা–‌আক্রান্ত হয়েছেন। মা প্রথমে গেছেন বাঙ্গুর হাসপাতালে। চিকিৎসকরা দেখে বলেছেন, অবিলম্বে আইডি হাসপাতালে গিয়ে পরীক্ষা করাতে। ব্যবস্থা করা ছিল আইডি–‌তে। বিলেতফেরত তরুণ সেদিন গেলেন না, সারাদিন মলে, নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ালেন। গেলেন পরদিন এবং করোনা চিহ্নিত হল। ছাত্র এবং পুত্র হিসাবে ব্যর্থ। মা উচ্চপদস্থ আমলা। ছেলেকে আইডি–‌তে নিয়ে গেলেন না, উল্টে, পরদিন গেলেন মহাকরণে, নবান্নে। পদস্থ আমলা হিসাবে, মা হিসাবে, নাগরিক হিসাবে ব্যর্থ। বাবা ডাক্তার। ছেলের সঙ্গে দেখা হল, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা তো নিলেনই না, একটা দিন নদিয়াতে দেখলেন অনেক শিশুকে। ডাক্তার হিসাবে, বাবা হিসাবে, নাগরিক হিসাবে ব্যর্থ। দায়িত্বজ্ঞানহীন। ‘‌শিক্ষিত পরিবার’‌!‌
কতরকম মিথ্যা যে ছড়াচ্ছে। যথা, প্রধানমন্ত্রী যে রবিবার বাড়িতে থাকতে বলেছেন, তার কারণ, ওই ১৪ ঘণ্টা করোনার অ্যান্টি ভাইরাস ছড়াবে কেন্দ্রীয় সরকার!‌ ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীরা বেরোবেন না? পুলিশ কর্মীরা বেরোবেন না?‌ অত্যাবশ্যকীয় কাজে যুক্তরা বেরোবেন না?‌ সোশ্যাল মিডিয়াতে গুজব ছড়াল, দুটো হোমিওপ্যাথি ওষুধে করোনা থেকে নিরাপদ থাকা যাবে। বিশিষ্ট হোমিওপ্যাথরা বললেন, ভিত্তিহীন। হ্যান্ড ড্রায়ার দিয়ে হাত শুকিয়ে নিলেই নাকি চলবে!‌ বেশি কলা খেলে নাকি চিন্তা নেই!‌ বাবা রামদেব বললেন, অশ্বগন্ধা হল অব্যর্থ!‌ জনপ্রিয় চ্যানেলের লোগো দিয়ে, মিথ্যা প্রচার। চ্যানেল কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করেছেন যথাস্থানে। মুখ্যমন্ত্রী কঠোর। মেমারির একজন সোশ্যাল মিডিয়াতে ছড়ালেন, সেখানে এক মহিলা করোনা–‌আক্রান্ত। মিথ্যা। গ্রেপ্তার করতে দেরি করেনি পুলিশ‌। আমরা কেন সতর্ক থাকছি না।
গোমূত্র খেয়ে নাকি করোনা তাড়াবে। বিতরণ, বোতলে পুরে বিক্রি। দিলীপ ঘোষ বলে দিলেন, ‘‌গোমূত্র খেয়েছি, আবার খাব!‌’‌ বাম শিবিরের সমালোচনা শুনে স্তম্ভিত, মুখ্যমন্ত্রী কেন গোমূত্রে চিকিৎসার বিরুদ্ধে বলছেন না?‌ তৃণমূলের মহাসচিব তথা মন্ত্রী তীব্র সমালোচনা করেছেন। একাধিক মন্ত্রী বলেছেন, তিন সাংসদ বলেছেন। সবচেয়ে বড় কথা, জোড়াসাঁকো এবং ডানকুনির দুই অপরাধীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ, মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে। বিরোধিতা করতে হবে বলে 
এমন সমালোচনা!‌
মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বারবার বলছেন, প্রতিদিন বলছেন, আতঙ্কিত হবে না, সতর্ক থাকুন। আমরা হয়তো ভাল থাকার যোগ্য নই। আতঙ্কিত হই, সতর্ক থাকি না। ‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top