রাজ্যের নাম ‘‌পশ্চিমবঙ্গ’‌ থেকে ‘‌বাংলা’‌ করার প্রস্তাব দিল্লিতে পড়ে রয়েছে। শাসক দলের সঙ্গে একমত থেকেছে বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যসভায় জানতে চাইলেন, প্রস্তাবটার কী হল?‌ স্বরাষ্ট্রদপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী নিত্যানন্দ রাই বললেন, সেক্ষেত্রে সংবিধান সংশোধন করতে হবে, যা নিয়ে ভাবছে না কেন্দ্র। আরেক রাষ্ট্রমন্ত্রী জি কিষন রেড্ডি বলে দিলেন, এমন কোনও প্রস্তাব কেন্দ্রের কাছে আসেনি!‌
তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে কেন্দ্রকে চিঠি লিখেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। শঙ্খ ঘোষ, নবনীতা দেবসেন, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, নৃসিংপ্রসাদ ভাদুড়ী, সুবোধ সরকার জানালেন, তাঁরা চান বাংলা এবং ‘‌বাংলা’‌–‌ই চান। পবিত্র সরকারও ‘‌পশ্চিম’‌ থাকার পক্ষে নন, বলছেন ‘‌বঙ্গ’‌ হলে ভাল হয়। ২০০১ সালে ‘‌নবজাগরণ’‌–‌এর সভা ছিল বাংলা আকাদেমি সভাগৃহে। বাংলার ভাল নিয়ে আলোচনা। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আধঘণ্টা শুধু ‘‌বাংলা’‌ নাম নিয়েই বলে গেলেন। জিজ্ঞেস করলাম, আর কিছু নিয়ে বললেন না কেন?‌ সুনীলদার জবাব:‌ ‘‌সে তো বলেই যাচ্ছি, যাব। গোটা কুড়ি সভায় বলেছি, বলব। আজ এই দিকটা নিয়েই বললাম, কারণ উদ্ভট বিরোধিতা দেখে রাগ হচ্ছে।’‌
এবার, যেদিন সংসদে স্বরাষ্ট্র দপ্তরের দুই রাষ্ট্রমন্ত্রী ‘‌না’‌ বলে দিলেন, টেলিভিশনে বিতর্কের আসর বসল। শঙ্খ–‌শীর্ষেন্দুদের উড়িয়ে দিয়ে দুই অপেক্ষাকৃত নবীন যা বললেন, যদি শুনে না থাকেন, শুনুন। ‘‌বাংলা’‌ নাম হলে কি জিডিপি বেড়ে যাবে?‌ .‌.‌.‌ ডেঙ্গি কমে যাবে?‌ .‌.‌.‌ আমার নাম সৌমিত্র চাটুয্যে করে দিলে কি দেখতে সুন্দর হয়ে যাব?‌ .‌.‌.‌বাংলার স্বার্থে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে আন্দোলন, প্রচারে থেকে দেখেছি, এরকম বঙ্গসন্তান আছেন। সংখ্যায় কম, কিন্তু, কী বলব, অন্য শব্দ খুঁজে পাচ্ছি না— বিষাক্ত।
এক ধুতিপাঞ্জাবি পরা ইংরেজি–‌ভক্ত বলেছিলেন, ইংরেজিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। গুরুত্ব?‌ হ্যাঁ। ‘‌বেশি’‌?‌ না। নিজের ভাষা থেকেই আমরা অন্য ভাষায় যাই। পরিচিতের হাত ধরেই আমরা অপরিচিতের কাছে যাই। উপাচার্য হিসেবে স্যর আশুতোষ যখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় এমএ কোর্স চালু করতে গেলেন, কিছু বঙ্গসন্তানেরই বিরোধিতা, ‘‌বাংলা’‌য়‌ আবার এমএ হয় নাকি!‌ স্যর আশুতোষ বরেণ্য দীনেশচন্দ্র সেনকে বিভাগীয় প্রধান করে এগোলেন। সমর্থনে এগিয়ে এলেন রবীন্দ্রনাথ। ইতিহাস। সাহসের ইতিহাস। অদ্ভুত বাংলা–‌ বিরোধিতার ইতিহাস।
ওঁরা ছিলেন, আছেন, কী আর করা যাবে, থাকুন। টেলিভিশনে আবোলতাবোল বলুন। মূল জায়গায় যাওয়ার আগে দু–‌একটা কথা বলি। ফুটবল বা ক্রিকেটে রাজ্য জিতলে কি লেখা হয় ‘‌পশ্চিমবঙ্গের জয়’‌?‌ ব্রাত্য–‌কৌশিকদের নাটক দেখে কি আমরা ‘‌বাংলার’‌ নাটক নিয়ে গর্বিত হই না?‌ বুদ্ধদেব বসু বা বিষ্ণু দে যখন বাংলা কবিতার সঙ্কলন করেন, নাম কি হয় ‘‌পশ্চিমবঙ্গের কবিতা’‌?‌ কোনও সাধারণ মানুষ কি ‘‌পশ্চিমবঙ্গ’‌ বলেন?‌ যা বলি, যা লিখি, সেই নামটা যদি চাই, অসুবিধে কোথায়?‌
বাংলার হয়ে কথা বলতে গেলেই দেখেছি, কিছু ব্যক্তি বলে দেন— ওঁরা সঙ্কীর্ণতাবাদী। না মশাই। সেই ২০০২ সালে এক টেলিভিশন বিতর্কে এক দাপুটে বিজেপি নেতা বলেছিলেন, ‘‌আপনারা তো জন্মসূত্রে অ–‌বাঙালিদের ছোট করছেন?’‌‌ বলেছিলাম, ‘এ বছর প্রতিষ্ঠাদিবসে আমরা তিনজনকে সংবর্ধনা জানিয়েছি, আদর্শ বাঙালি হিসেবে। নাম— ভি বালসারা, এন বিশ্বনাথন, তুলসীদাস বলরাম।’‌ সেই নেতাকে বিব্রত দেখে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘‌হজমশক্তি বাড়ান!‌’‌ দু’‌জন বাঙালির কথা বলি। ব্যারাকপুরের প্রাক্তন সাংসদ দীনেশ ত্রিবেদী। দেখেছি, বাংলা লোকগানের অনুষ্ঠানে মগ্ন শ্রোতা। বঙ্গসংস্কৃতির প্রচারে উদ্যোগী। যিনি তাঁকে হারালেন, কী আর বলব, আপনারা জানেন। তুলসীদাস বলরাম। ১৯৫৬ সালে বাংলায় এলেন। হায়দরাবাদের হয়ে সন্তোষ ট্রফি খেলেছেন। ইস্টবেঙ্গলে আনলেন জ্যোতিষ গুহ। বলরাম অনেক বছর বাংলার হয়ে খেললেন। ভারতীয় দলে অপরিহার্য। ১৯৭৬, পাটনায় সন্তোষ ট্রফির আসর। তখনও সওদাগরি সংস্থায়, সেই সূত্রেই পাটনায়, সফর বাড়িয়ে থেকে গেলাম। ফাইনালের আগের দিন নৈশভোজ। জাতীয় দলের প্রাক্তন ও বর্তমানরা এলেন ভারতের ব্লেজার গায়ে। স্বাভাবিক। শুধু বলরামের গায়ে বাংলার ব্লেজার। বললাম, ‘‌কী ব্যাপার বলরামদা, ইন্ডিয়ার ব্লেজার নয় কেন?‌’‌ অপ্রতিরোধ্য বলরাম, ‘‌ভারতের চেয়েও বাংলার হয়ে খেলার জন্য আমি বেশি গর্বিত!‌’‌ খেলা ছাড়ার পর বাংলা ছেড়ে যাননি। অপেক্ষাকৃত কম স্বীকৃতি–‌পাওয়া মানুষটি থেকে গেলেন। থাকেন দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের কাছে। নিজেকে বাঙালি ছাড়া অন্য কিছু ভাবেন না। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে চুনী গোস্বামী বলেছিলেন, ‘‌বাংলার হয়ে ওর মতো ঘাম আর কে ঝরিয়েছে?’‌‌
উল্টোপাল্টা কথা বলা লোকেদের কথা বাদ দিন। এ ধরনের লোক চিরকাল ছিলেন, এখনও আছেন, ভবিষ্যতেও থাকবেন। কিন্তু আসল বিরোধী কারা?‌ রাগারাগির ব্যাপার নয়, সোজা উত্তর— বিজেপি। তথাগত রায় বললেন, শুরুতেই তিনি তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংকে বুঝিয়ে এসেছিলেন, কেন ‘‌বাংলা’‌ নাম হওয়া উচিত নয়। এখনও বিধানসভায় প্রকাশ্য বিরোধিতা। কেন?‌ ওঁরা চান, ‘‌পশ্চিম’‌টা থাকুক, দেশভাগের শোচনীয় স্মৃতি ক্ষত হয়ে জেগে থাকুক। এবং, ওঁরা বাংলা ও বাঙালি আবেগের শত্রু। ওঁরা ‘‌জয় শ্রীরাম’‌ হাঁকেন, বাংলায় সহজিয়া ধর্মের ঐতিহ্যকে অগ্রাহ্য করেন। চান গদা ও তরোয়ালের ধর্ম–‌সংস্কৃতি।
গত পাঁচ বছরে বিজেপি সরকারের মনোভাব লক্ষ্য করুন। বাংলাকে দখল করতে চেয়ে, ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাকে তছনছ করতে চেয়ে লোকসভায় ৯ কেন্দ্রের ভোটে ৭০ হাজার কেন্দ্রীয় বাহিনী। নানা ক্ষেত্রে, ১০০ দিনের কাজেও টাকা আটকে রাখা। মমতা ব্যানার্জি রেলমন্ত্রী হিসেবে যেসব প্রকল্প ঘোষণা ও বরাদ্দ করেছিলেন, বন্ধ করে দেওয়া। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে আবশ্যিক সহায়তার হাত না খোলা। দেউচা–‌পাচামি খনির অনুমোদন এসেছিল ২০১৫ সালে, মোদির আমলেই। চার বছর চলে গেছে, আটকে আছে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। হয়ে যাওয়ার কথা, হয়ে গেলে বাংলায় কয়লা, বিদ্যুতের সমস্যার সমাধান হত। কর্মসংস্থান হত এক লক্ষ মানুষের। ওঁরা বাংলাকে সর্বার্থেই বঞ্চিত রাখতে চান।
‘‌বাংলা’‌ নামকরণ একটা প্রতীক। এবং ‘‌প্রতিনিধি’।‌ ওঁরা বাংলাকে ‘‌ঘৃণা’‌ করেন, সেই বাংলাকে, যা ধর্মনিরপেক্ষতার পতাকা হাতে সঙ্কল্পবদ্ধ। তেজি। বাংলার মাটি বাংলার জল। আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি। রবীন্দ্রনাথকে ‘‌সঙ্কীর্ণ’‌ বলার চেষ্টা করবেন?‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top