অতিমারি, সন্দেহ নেই, অনেক কিছুই ভেঙে দিল। পুনর্গঠনে সময় লাগবে। তবু, আশাবাদী, একটা পথ বেরোবে। এই কু–‌যোগে ভারতে আর–‌একটা জিনিস হল, কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকেই ভেঙে দিল।
অতিমারির সূচনা চীনের উহান শহরে, ২০১৯–‌এর ডিসেম্বরে। জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে ভারতে প্রথম আক্রান্ত কেরলে। তারপর, প্রায় সাত সপ্তাহ কার্যত বসে থাকল কেন্দ্র। লকডাউন ঘোষণা হল ৪ ঘণ্টার নোটিসে। পরে প্রধানমন্ত্রী পাঁচটি ভিডিও কনফারেন্স করেছেন মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে। বেশি বলা, কম শোনা। লকডাউনের সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগে রাজ্যকে জানানোর প্রয়োজন মনে করেনি কেন্দ্র।
২৪ মার্চ রাতে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, যে–‌যেখানে আছেন, থাকুন। ট্রেন, বাস বন্ধ। পরিযায়ী শ্রমিকদের বেঁচে থাকার ব্যবস্থা?‌ কোনও দায় নিল না কেন্দ্র। রাজ্যকে ন্যূনতম সাহায্য নয়। আবার, হঠাৎই ঘোষণা, বিশেষ ট্রেন চালু, যে–‌যার নিজের রাজ্যে ফিরে যান। এবারও সিদ্ধান্ত রাজ্যগুলোকে অন্ধকারে রেখে। ভারত যে একটা যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর দেশ, মনে রাখা হল না। ঠিক তা নয়। মনে রেখে, ভেঙে দেওয়া হল। এপিডেমিক ডিজিজেস অ্যাক্ট ১৮৯৮। এবং ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট ২০০৬। মূলত দ্বিতীয় আইনটির অপপ্রয়োগ করে, সঙ্কটকালে, ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা হল। আড়াইজন মন্ত্রী, হয়তো সাড়ে তিনজন আমলা ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত নিতে থাকলেন। ‘জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা আইন’‌ হয়েছিল ইউপিএ আমলে, ২০০৬ সালে। কল্যাণমূলক কিছু দিক ছিল। ব্যবহার করা হল না। উল্টো দিকটাকে বীভৎস তুঙ্গে নিয়ে যাওয়া হল। ২০০৬ সালে নির্ণায়ক ভূমিকায় ছিলেন বামপন্থীরা, তবু খারাপ দিকটা বুঝে বাধা দেননি কেন, প্রশ্ন উঠবে।
আমলাদের দুটি দল এল বাংলায়। ঢোকার তিন ঘণ্টা পর জানানো হল মুখ্যমন্ত্রীকে। ঢুকেই ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধিরা বেরিয়ে পড়লেন। প্রথম দিন থেকে রাজ্যকে আক্রমণ। প্রকাশ্য কটূক্তি। রাজ্যের সর্বোচ্চ স্তরের অফিসারদের অ–‌সভ্য চিঠি। গোটা ব্যাপারটায় যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রথাকে তছনছ করা হল। দিল্লিতে ফিরে শাসকদের পছন্দসই রিপোর্ট। আরেক দফা আক্রমণ। লকডাউন, একতরফা। ট্রেন বন্ধ, ট্রেন চালানোর সিদ্ধান্ত, তারিখ, একতরফা। যেন সংবিধানে রাজ্যগুলোর কোনও অধিকার নেই। জানারও অধিকার নেই।
যে–‌যেখানে আছেন, থাকুন, বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। ন্যূনতম খাওয়া–‌থাকার দায় নিলেন না। রাজ্যগুলো অসহায়। কেরলের কথা বলা হচ্ছে খুব, সেই কেরল থেকে পরিযায়ী শ্রমিকরা ফিরতে চাইলেন বাধ্য হয়ে। নানা রাজ্যে, বাংলাতেও প্রথম দফায় ফিরলেন ১১০০ মানুষ। ব্যবস্থা?‌ কেন,‌ রাজ্য করবে!‌
অতিমারির সঙ্কট মোকাবিলা করতে হচ্ছে রাজ্যগুলোকে। অভূতপূর্ব পরিস্থিতিতে চিকিৎসা। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা। রাতারাতি কোভিড হাসপাতাল, কোয়ারেন্টিন কেন্দ্র, চিকিৎসক–‌নার্স–স্বাস্থ্যকর্মীদের বর্ম ও অন্যান্য ব্যবস্থা। বিপুল খরচ। ভয়ঙ্কর চাপ। রাজ্যকে কিছু দিল না কেন্দ্র, শুধু ছড়ি ঘোরাল। ঘোরাচ্ছে।
মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে সাতজন মুখ্যমন্ত্রী আপৎকালীন আর্থিক সহায়তার দাবি জানালেন। কানে তালা। কী করে সামলাবে রাজ্য, যেখানে সব দায়িত্ব রাজ্যেরই, ভাবা হল না। অথবা, ভেবেচিন্তেই বঞ্চিত ও কোণঠাসা করা হল।
মহামতি দিলীপ ঘোষ বারবার বলছেন, মুখ্যমন্ত্রী শুধু রাজ্যের হাতে টাকা চাইছেন। যেন, খুব অসঙ্গত চাওয়া। আয় তলানিতে, খরচ বিপুল, টাকাটা কি মুরলীধর সেন লেন থেকে আসবে?‌ একইসঙ্গে চালু রাখতে হচ্ছে জনমুখী প্রকল্প। বাংলায় ৫৭টি প্রকল্প, যাতে প্রভূত উপকৃত সাধারণ মানুষ। দিলীপবাবুর কথা শুনে মনে হচ্ছে, সব টাকাই কেন্দ্রের। সব টাকা তোলা হয় রাজ্যগুলো থেকে, চাঁদ বা মঙ্গলগ্রহ থেকে তো নয়। ভয়ঙ্কর সঙ্কটে রাজ্যকে টাকা দেওয়াটা দয়ার ব্যাপার নয়, বাধ্যতামূলক।
আপৎকালীন সহায়তা নেই। আর, রাজ্যের প্রাপ্য, নির্ধারিত প্রাপ্য, পাওয়া যাচ্ছে না। বাংলার পাওনা ৫৩ হাজার কোটি টাকা। সব রাজ্য সমান বঞ্চিত নয়। উত্তরপ্রদেশ ও গুজরাটের বকেয়া অনেক কম। সব রাজ্য মিলিয়ে কেন্দ্রের কাছে প্রাপ্য ৪.‌৭ লক্ষ কোটি টাকা। সেই টাকাটা দিয়ে দিলে, রাজ্য আরও ঝাঁপাতে পারত। ১৯৭৫ থেকে দু’‌বছর 
ইন্দিরা গান্ধী স্বৈরতান্ত্রিক শাসন চালিয়েছিলেন। কিন্তু, রাজ্যগুলোকে বঞ্চিত করা হয়নি। ইন্দিরা গান্ধী গণতন্ত্রকে ধ্বংস করার চেষ্টা 
করেছিলেন। কিন্তু নগ্নভাবে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোটাকেই ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করেননি। ভাঙার খেলায় ইন্দিরাকে ছাপিয়ে গেলেন নরেন্দ্র মোদি।

জনপ্রিয়

Back To Top