যিনি ফোন করলেন, সেই কংগ্রেস নেতা মোটামুটি ধীরস্থির। তাঁর গলাতেও উষ্মা:‌ ‘‌আপনারা কেন রাহুলের বিরুদ্ধে?‌’‌
না। প্রথমত, বিদেশে বিপাসনা পর্বের পর অবশ্যই কিছুটা পরিণত হয়েছেন রাহুল গান্ধী। কিছুটা। বিজেপি–‌বিরোধী বড় দলের নেতা কিছুটা পরিণত হয়েছেন, সে তো ভাল কথা। আমরা বিজেপি–‌বিরোধী, চাই বিকল্প সরকার। রাহুলের বিরুদ্ধে থাকতে যাব কেন?‌ হ্যাঁ, সমালোচনা আছে এবং তা বারবার বলে চলেছি, কারণ তাঁর ভুলের জন্য কোণঠাসা বিজেপি একটু অক্সিজেন পেয়ে যাচ্ছে।
রাফাল কেলেঙ্কারি ফাঁস করায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা এন রাম, অরুণ শৌরি ও প্রশান্ত ভূষণের। কিন্তু রাফালকে বড় ইস্যু করে তোলার ক্ষেত্রে রাহুলের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কেলেঙ্কারি নিয়ে টানা প্রচার চালিয়ে ‘‌চৌকিদার চোর হ্যায়’ পর্যন্ত পৌঁছে গেছেন। মোদি বলেছিলেন, ‘‌না খাউঙ্গা না খানে দুঙ্গা’‌‌, তাঁর ও তাঁদের খাওয়াদাওয়া নিয়ে বাস্তব প্রচারকে তুঙ্গে নিয়ে গেছেন রাহুল। নরেন্দ্র মোদি বক্তৃতায় যতই নাটুকেপনা করুন, চোখেমুখে ভয়ের ছাপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ধন্যবাদ প্রাপ্য কংগ্রেস সভাপতির। তাঁর বিরুদ্ধে আদাজল খেয়ে নেমে পড়তে যাব কেন?‌
আমরা চাই, মোদির রাজনৈতিক পতন হোক। বিজেপি পরাস্ত হোক। বিকল্প সরকার হতে গেলে কংগ্রেসকে আগেরবারের থেকে অনেক বেশি আসন পেতে হবে। কংগ্রেসের প্রধান নেতাকে আক্রমণের প্রধান লক্ষ্যবস্তু করতে যাব কেন?‌ চাপা প্রচার ছিল, পাঁচ বছর আগের ৪৪ থেকে এবার ১৪৪–‌এ পৌঁছনোই লক্ষ্য কংগ্রেসের। আপাতত যা খবর আসছে, ১৪৪ হবে না। ১৩০?‌ তা–‌ও কঠিন। কংগ্রেসের আসনগুলো বিকল্প সরকার গঠনে কাজে লাগবে, লাগবেই, আমরা কংগ্রেস নেতার বিরুদ্ধে অনড় থাকব কেন?‌
২০০৪ সালে, বাজপেয়ী–‌আদবানির ‘‌ইন্ডিয়া শাইনিং’‌ প্রচারকে ধুলোয় মিশিয়ে, এনডিএ সরকারের অবসানে কংগ্রেসের বড় ভূমিকা ছিল। সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বে। ২০৬ আসন পেয়েছিল কংগ্রেস এবং ইউপিএ সরকার গড়তে অসুবিধা হয়নি। এবার দেশ জুড়ে বিজেপি–‌বিরোধী ক্ষোভ জোরদার হওয়া সত্ত্বেও কংগ্রেসের আসন ১৩০–‌এও সম্ভবত পৌঁছবে না, তাই কি অবিলম্বে মোদি সরকারের অবসান ঘটাতে মরিয়া নন রাহুল গান্ধী?‌ ১৩০ (‌যদি হয়)‌ আসন নিয়ে সরকারের নেতৃত্ব দিতে যাওয়া কঠিন, কারণ অনেক আঞ্চলিক দলই কংগ্রেসকে বিকল্প সরকারের নেতা মানতে নারাজ। তাহলে কি এবারও বিকল্প সরকারকে সমর্থন দেওয়ার পথে যেতে হবে?‌ ইতিহাস বলছে, এমন সরকার ফেলে দেওয়া কংগ্রেসের কাছে জলভাত। ফেলে দিলে, অন্তবর্তী নির্বাচনে হইহই করে জিতে ক্ষমতায় আসবে কংগ্রেস, এমন সম্ভাবনা নেই। 
বয়স ৪৮, পাঁচ বছর পর ৫৩, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সময় পড়ে রয়েছে, সুতরাং এবার একটু দুর্বল বিজেপি সরকার থাকলে থাকুক, ২০২৪–‌এ বাজিমাত, এমনটাই ভাবছেন কি না সোনিয়া–‌তনয়, প্রশ্ন উঠছে। অন্য নেতৃত্বে বিকল্প সরকারে সায় নেই, মাঝপথে সমর্থন প্রত্যাহার করলেও নিন্দা, তাই কি এবার মোদি সরকারকে বিতাড়িত করায় অগ্রাধিকার দিচ্ছেন না রাহুল?‌ প্রশ্নটা এমনি–‌এমনি উঠছে না।
দরকার ছিল বিজেপি–‌বিরোধী জোট। রাজ্যে রাজ্যে, যতটা সম্ভব, মমতার সূত্রে ১:‌১। হল কি?‌ সব রাজ্যে সম্ভব নয়, নিজেদের শক্তি বাড়াতে হবে, বুঝলাম। কিন্তু, যেখানে খুবই জরুরি ছিল?‌ গুজরাট, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, মহারাষ্ট্র, অসম, হরিয়ানা, পাঞ্জাবে কংগ্রেসই প্রধান বিজেপি–‌বিরোধী দল। সেই বিস্তীর্ণ এলাকায় জোর দিয়ে, কিছু ক্ষেত্রে জোটের জন্য সঙ্কীর্ণ স্বার্থ বিসর্জন কি প্রত্যাশিত ছিল না,‌ যদি অগ্রাধিকার হয় বিজেপি–‌বিদায়?‌
দিল্লি। ৭ আসন। অরবিন্দ কেজরিওয়াল জোটের জন্য বলে গেছেন। কংগ্রেসকে ৩ আসন ছেড়ে নিজেরা ৪ আসনে লড়তে রাজি ছিল আপ। গত বিধানসভা নির্বাচনে ৭০–‌এর মধ্যে ৬৭ পেয়েছে আপ, কংগ্রেস ০। তবু, প্রায় সমান–‌সমান আসন ভাগের সূত্র দিয়ে, পাঞ্জাব ও হরিয়ানায় জোট চেয়েছিল আপ। ২০১৪ সালে মোদি ঝড়েও পাঞ্জাবে ৪ আসনে জিতেছিল আপ। পাঞ্জাবে একটা আসনও ছাড়তে রাজি হলেন না ক্যাপ্টেন অমরিন্দার সিং। কংগ্রেস সভাপতি হিসেবে রাহুলের কি উচিত ছিল না, প্রবল জনপ্রিয় আপ সাংসদ ভগবন্ত সিং মানকে আসনটা ছেড়ে দিয়ে সদিচ্ছা প্রকাশ করা?‌ অমরিন্দারের অযৌক্তিক গোঁয়ার্তুমিকে অগ্রাহ্য করার মতো ন্যূনতম কর্তৃত্ব নেই কংগ্রেস সভাপতির?‌ মুশকিল!‌
উত্তরপ্রদেশ। আমেঠি ও রায়বরেলি ছেড়ে ৭৮ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেন দেন মায়াবতী–‌অখিলেশ। একটু বাড়াবাড়ি, মায়াবতীর চাপে। কংগ্রেস ১৫ আসনে লড়ে  ৬৫–‌তে শক্তিশালী বিরোধী জোটকে জায়গা ছেড়ে দিতে পারল না?‌ ১:‌১ হতে পারত না?‌ তাহলে বিজেপি জোট ৭৩ থেকে ২০–‌র মধ্যে থেকে যেত। রাহুল ঝাঁপিয়ে পড়লেন, নামালেন প্রিয়াঙ্কাকে। প্রথমত, ভুল বার্তা গেল। দ্বিতীয়ত, কংগ্রেস কী পাবে?‌ দলীয় সূত্রে বলা হচ্ছে, ২০। বাজে কথা। হয়তো ৪, খুব বেশি হলে ৬। মাঝ থেকে বিজেপি–‌র আসন ৩০–‌এর কাছাকাছি যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করে দিলেন। ২০১৯ সালে, ২০১৯ সালেই সরাতে হবে জনবিরোধী মোদি সরকারকে, এই অগ্রাধিকার থাকলে এটা করা যায়?‌
কেরলের কথা ভাবুন। ২০ আসনই থাকবে বিজেপি–‌বিরোধীদের হাতে। ওয়ানাড়ে প্রার্থী হয়ে সময় ও শ্রম নষ্ট করছেন কংগ্রেস সভাপতি। দক্ষিণ ভারত থেকেও প্রার্থী হয়ে নাকি বার্তা দিতে চাইছেন। তাহলে কর্ণাটকে নয় কেন, যেখানে বিজেপি লড়াইয়ে আছে?‌ রাহুল প্রার্থী হলে কর্ণাটকে জোটের আসন বাড়ত।
এত সবের পর যদি মনে হয়, যেভাবেই হোক বিজেপি সরকারকে এবারই অপসারণ করায় অগ্রাধিকার নেই কংগ্রেস সভাপতির, অপেক্ষা করছেন ২০২৪ সালের জন্য, খুব ভুল করছি কি?‌ যদি থেকে যায় বিজেপি সরকার, দেশের তো সমূহ সর্বনাশ বটেই, রাহুল ভাল থাকবেন?‌ তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে না বিজেপি?‌ জামাইবাবাজির জন্য ভাবমূর্তির ক্ষতি হচ্ছেই, আঘাত সামলাতে 
পারবেন?‌ সরাসরি বলি, কংগ্রেস কিছুতেই দাপটের সঙ্গে সরকার গড়ার জায়গায় নেই। আশাতীত ফল করে ১৩০ পেলে ভাল জায়গায় থাকত, ইউনাইটেড ইন্ডিয়া সরকারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় থাকত। বিজেপি হারতেই পারে। কিন্তু নিজের অগ্রাধিকার সম্পর্কে ভুল বার্তা দিয়ে গেলেন রাহুল। এজন্য বিরোধিতা তো করতেই হয়।  

জনপ্রিয়

Back To Top