বাহারউদ্দিন: অস্থিরতা যখন পণ্য হয়ে উঠছে, যখন চারপাশে অসহিষ্ণু আচরণ আর অবদমিত হিংসার বিক্ষিপ্ত স্ফূরণ, বিস্ফোরণ আমাদের চিত্তবৃত্তিকে স্তম্ভিত করে দিচ্ছে, বহুত্বের আবহমান প্রবাহকে যখন বিকৃতির পথে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে— দিশা হারাচ্ছে সুকুমার নির্মাণ— তখনই দুটি ছোট্ট— না এরকম বলা ঠিক নয়, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আর নির্মীয়মাণ খবরের সন্ধান পেয়ে আমরা উদ্দীপ্ত। দূর–‌অদূরের মেঘলা আকাশে হঠাৎ সূর্যোদয় যেমন ঝকঝকে দিনের সঙ্গী হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে উঁচু করে দেয়, ঠিক সেরকমই দুই বঙ্গের সাংস্কৃতিক অখণ্ডতার স্বপ্নে, আশা করছি, এই দুই সংবাদ, এই দুই প্রস্তুতি আর তাদের পূর্ণতা ক্রমাগত গৌর ছড়াবে।
শান্তিনিকেতনে, বিশ্বভারতীর স্নায়ুকেন্দ্রে বাংলাদেশ ভবন তৈরি হচ্ছে। বিস্তৃত চত্বরে। যতদূর জানা গেছে, ভবনটির আয়তন ৬১ হাজার বর্গফুট। সামনে দরাজ ফটকের এক দিকে নব্য স্থাপত্যরীতির শোভিত অস্তিত্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন প্রগাঢ় রবীন্দ্রনাথ, অন্য পাশে বঙ্গবন্ধু— বাঙালির প্রথম স্বাধীন দেশ–‌নির্মাতা। ভবনটির ভেতরে থাকবে অতিথিশালা, সভাসদন, বাংলাদেশের কারুকৃতি, চিত্রকর্ম, কবিগুরুর বহুমুখী স্মৃতিচিহ্নের পাশাপাশি মুজিব–‌স্মারক। সাজসজ্জার এ সব তথ্য কেউ আমাদের জানাননি। সম্ভাব্য, অপরিহার্য বলেই আভাস দিতে হচ্ছে। হয়ত আগামী মার্চ কিংবা এপ্রিলে ভবনটির উদ্বোধন হবে। অনেকের প্রত্যাশা, মনোহর সূচনায় উপস্থিত থাকবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
ভবনটির নির্মাণকর্ম যখন প্রায় সম্পূর্ণ, তখন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সহযোগিতার নৈকট্য প্রত্যাশিত স্বপ্নকে ঋদ্ধ করছে, বিশ্বভারতীও উদার হস্ত— তখন প্রাসঙ্গিক কয়েকটি প্রস্তাব পেশ করা জরুরি মনে হচ্ছে। ৭১–‌এর মুক্তিযুদ্ধের সময়ে রামকিঙ্কর বেজ, সোমনাথ হোড় শান্তিনিকেতনের কলাভবনের উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। সঙ্গী তাঁদের বহু কৃতি ভাস্কর আর চিত্রকর। গণহত্যা, ধর্ষণ ও দমন–‌পীড়নের খবরে সবাই বিচলিত। কেউ কেউ উজ্জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের অঙ্গীকার, ভাবাবেগ এবং দুঃসাহসী অভিযানের নিত্যনতুন সংবাদে। প্রতিদিন, নিয়মিত রেখাঙ্কনে, ছবিতে রামকিঙ্কর অস্থির, গতিময়। সাদা কাগজে ছড়িয়ে পড়ছে তাঁর ক্রোধ, তাঁর শোকাবহ আবেগ। ক্ষত সিরিজ গড়ছেন সোমনাথ হোড়। একের পর এক। যা বিশ্বমানের এবং কালিক মাত্রার ঊর্ধ্বে। সোমনাথের জন্মভূমি চট্টগ্রাম। দুর্ভিক্ষ নিয়ে অসামান্য তাঁর চিত্রকলা। ভেতরের ক্ষত নিয়েও অমূল্য ভাস্কর্ক গড়েছেন। যা সুরক্ষিত। কে না জানে, রামকিঙ্কর কালোত্তীর্ণ মহান ভাস্কর। খ্যাতি দুনিয়া জুড়ে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তাঁর অসংখ্য সৃষ্টি সম্ভবত নিখোঁজ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে তাঁর আক্রোশের, তাঁর জাতীয় ভাবাবেগের এত সব ছবি, রেখাঙ্কন এখন কোথায়?‌ নিশ্চয় কারও না কারও হেফাজতে আছে। এ সবের সংরক্ষণ ও সংগ্রহ দরকার। এ ব্যাপারে বিশ্বভারতী ও কলকাতার বাংলাদেশ দূতাবাস যৌথ উদ্যোগ নিক। ৭১–‌এ কলকাতায়, স্টেটসম্যান অফিসের সামনে বসে, জনমত গঠন করতে, বাংলাদেশ থেকে আগত শরণার্থীদের সাহায্যে, পাক সেনার কুকীর্তি আর মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে দল বেঁধে ছবি আঁকতেন প্রকাশ কর্মকার, বিজন চৌধুরি, সুনীল দাস, রবীন মণ্ডল, ধীরাজ চৌধুরি–‌সহ স্বনামধন্য ও উদীয়মান বহু চিত্রকর। সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি হয়ে যেত। ত্রাণ তহবিলে সঞ্চিত হত অর্থ। এ সব ছবি নিশ্চয় হারিয়ে যায়নি। খোঁজ–‌খবর নিয়ে রামকিঙ্কর, সোমনাথ হোড় ও অন্যান্য গুণী শিল্পীর ভাস্কর্য, মূল ছবি অথবা প্রতিলিপি সাজিয়ে রাখা হলে বাংলাদেশ ভবনের মহিমা বাড়বে। অবশ্য, অতি অবশ্য।
দ্বিতীয়ত, দিকপাল চিত্রকর জয়নূল আবেদিন, কামরুল হাসান, সুলতান, সফিউদ্দিন আহমেদের ছাত্রজীবন কলকাতায় কেটেছে। তাঁদের প্রথম উত্তরণ এই শহরে। পূর্ণাঙ্গতা পূর্ববঙ্গে। তাঁদের চিত্রকর্ম দেখার সুযোগ এ বাংলার কোথায়?‌ এ সব কিংবদন্তী ও তাঁদের উত্তরসূরিদের ছবি অথবা ছবির প্রতিলিপি, আশা করব দ্যুতি ছড়াবে বাংলাদেশ ভবনের দেওয়ালে দেওয়ালে।
আরেকটা কথা, বঙ্গবন্ধুর রবীন্দ্রমগ্নতা স্বীকৃত আর সর্বজনবিদিত। দেশভাগের আগে কোন স্তরে তিনি রবীন্দ্রময় হয়ে উঠতে শুরু করলেন এবং দুই বঙ্গ চার টুকরো হয়ে যাওয়ার পর কোন অন্তর্নিহিত ব্যথা উপশমের পরম আশ্রয় হয়ে উঠেছিলেন তাঁর বহু পঠিত কবি;‌ কেন যে কোনও জনসভায় তাঁর কণ্ঠে বেজে উঠত রবীন্দ্র কবিতা এবং কখন, কোন পরিস্থিতিতে যাবতীয় বাধা অতিক্রম করে নিসংশয়ে ‘‌আমার সোনার বাংলা’‌ গানটিকে জাতীয় সঙ্গীত বলে ঘোষণা করেছিলেন— এরকম অসংখ্য জানা ও অজানা সচিত্র তথ্য সহজলভ্য, দৃশ্যমান হয়ে উঠুক। এখানেও বাংলাদেশ ভবন পালন করতে পারে স্বপ্নপূরণের ঐতিহাসিক ভূমিকা।
লেখাটির প্রায় শুরুতে, অন্য যে সুসংবাদের ইঙ্গিত রয়েছে, তা হচ্ছে এই যে ঠাকুর পরিবারের জোড়াসাঁকোয় গড়ে উঠছে বাংলাদেশ গ্যালারি। রবীন্দ্রভারতী আর বাংলাদেশ সরকারের যৌথ উদ্যোগে। আমরা অনেকেই জানি, দীর্ঘ আড়াই দশক পূর্ববঙ্গ ছিল রবীন্দ্রনাথের চিন্তা আর কর্মের গর্ভভূমি। সৃষ্টির জমিনও। রবীন্দ্রনাথ যে সব অঞ্চলে ঘুরে বেড়িয়েছেন, দেশে–‌বিদেশে, সে সবের স্মারকচিহ্ন— বিশ্বভারতী ও জোড়াসাঁকোর সংগ্রহশালায় সযত্নে রক্ষিত। এবার তাঁর পূর্ববঙ্গের স্মৃতি ও কর্ম–‌ছোঁওয়া যাবতীয় সরঞ্জাম (‌শিলাইদহ বা অন্য যে কোনও অঞ্চলের)‌ এসে জড়ো হবে জোড়াসাঁকোয়। সাঙ্কেতিক ঘটনা!‌ একই সময়ে শান্তিনিকেতনে বাংলাদেশ ভবনের নির্মাণ আর জোড়াসাঁকোয় বাংলাদেশ গ্যালারি গড়ার উদ্যোগ কী প্রমাণ করছে?‌ সাংস্কৃতিক বিভাজনের বিরুদ্ধে বাঙালির ঐক্য আর মিলিত সাধনার পরম অবলম্বন এখনও সর্বকালের মহান কবি, ভাবীকালেও তিনি ছায়া হয়ে থাকবেন। মেলাবেন একই মঞ্চে, বহুধর্মীয়, জাতীয়, উপজাতির অভ্যাসকে। আমাদের পরম্পরার অতীত আর বর্তমানকে।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top