নির্মাল্য বন্দ্যোপাধ্যায়: ক্রিকেটই হোক বা জীবন, সব ক্ষেত্রেই ক্রিজ আঁকড়ে পড়ে থাকলে নাকি রান আসে! তাই তো আজও বাজারে টিমটিম করে হলেও, নিজের অস্তিত্বটা টিকিয়ে রেখেছে অ্যাম্বাসাডর। মনে ক্ষীণ আশা, যদি কিছু মিরাকেল ঘটে যায়।
জন্মসূত্রে বিলিতি হলেও, এ বঙ্গের জলহাওয়াতেই এ গাড়ির বেড়ে ওঠা, নামডাক। তবে যাত্রাপথটা খুব একটা সহজ ছিল না। চাকা গড়াতে শুরু করেছিল গুজরাটে, হুগলির উত্তরপাড়ায় এসে খ্যাতি-প্রতিপত্তি উত্তরোত্তর বাড়তে শুরু করে। তবে সেই সুখ্যাতি ধরে রাখতে কম হ্যাপা পোয়াতে হয়নি। বিভিন্ন পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। কখনও প্রশ্নপত্র সরল এসেছে, কখনও আবার জটিল। তবে ভাল ছাত্রের মতো ভিতটা শক্তপোক্ত হওয়ায় বরাবরই সসম্মানে উতরে গেছে অ্যাম্বাসাডর।
আশির দশকের মাঝামাঝি নাগাদ, এক জাপানিকে দোসর করে নতুন এক গাড়ি অ্যাম্বাসাডরকে কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে ঠেলে দিয়েছিল। লাল টুকটুকে মারুতি আটশো‍ সেই সময় অ্যাম্বাসাডরের পরম শত্রু! রাস্তাঘাটে প্রায়ই মুখের ওপর ধুলো উড়িয়ে চলে যেত। মন খারাপ হত, মাথা গরম হয়ে যেত, থরথর করে কাঁপত গোটা শরীর, তাও হাল ছাড়েনি। ঠান্ডা মাথায় ভেবেছে, ‘‌পদ্মিনী’‌ নামের এক ইতালীয় রানিও তো এসেছিল, কিন্তু রাজার রাজত্বে তো ভাগ বসাতে পারেনি! সুতরাং, থেমো না, চরৈবেতি। এই মন্ত্রকে সঙ্গী করে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত ছুটে বেড়িয়েছে অ্যাম্বাসাডর। শুধু মানুষের বিশ্বাস, ভালবাসা নয়, এমনকী ক্ষমতারও প্রতীক হয়ে উঠেছে।
বিহারে তখন বড় বড় এসইউভি সবে ঢুকতে শুরু করেছে। মন্ত্রীদের জন্যেও তখন বরাদ্দ হয়েছিল এসইউভি। কিন্তু মাঠে নামতে দেখা গেল, এসইউভি সেই সমীহ আদায় করতে পারছে না, যা অ্যাম্বাসাডর পারত। গ্রামের মানুষের কাছে মন্ত্রীদের ওই লালবাতি লাগানো, কালো কাচের জানালাওয়ালা সাদা গাড়িগুলো ছিল ক্ষমতার প্রতীক। সেখানে হাল ফ্যাশনের এসইউভি–‌গুলো ভয়, ভক্তি কোনটাই ঠিক জাগাতে পারছিল না। কয়েক মাস পর মন্ত্রীমশাইরা আর্জি জানাতে শুরু করলেন, দাও ফিরে সে অ্যাম্বাসাডর!‌
একটা সময়, যাদের বাড়ি অ্যাম্বাসাডর থাকত, পাড়ায় তাদের কদর বেশি। সরকারি কনভয়ে তখন রাজকীয় এই গাড়ি ছাড়া অন্য কিছুর কথা ভাবাই হত না। গাড়ির মালিকরাও হয়ত গোপন গর্ব নিয়ে ভাবতেন, রাজার ঘরে যে ধন আছে, টুনির ঘরেও সেই ধন আছে। তখন যঁাদের হাতে পয়সা আসত, তঁারাও প্রথমেই ভাবতেন একটা অ্যাম্বাসাডর কিনে বাড়ির সামনে দাঁড় করিয়ে রাখার কথা। আর চোখ বুজে ভরসা করার জন্য এ গাড়ির তো কোনও বিকল্প নেই। তৃণমূল কংগ্রেস নেতা সুব্রত বক্সি কথায় কথায় একদিন বলছিলেন, আগে দলের কাজে শহর ছেড়ে প্রায় এধার–‌ওধার যেতে হত। তখন তাঁর বিশ্বস্ত সঙ্গী ছিল একটা অ্যাম্বাসাডর। একবার অন্য একটা বড় গাড়ি নিয়ে চমকাইতলা গিয়েছিলেন, সঙ্গে আরও বেশ কয়েকজন ছিলেন। মাঝপথে প্রচণ্ড ঝড়–বৃষ্টিতে সেই গাড়ি বিগড়ে গিয়ে মারাত্মক ফ্যাসাদে পড়েছিলেন বক্সিবাবু। তঁার দীর্ঘদিনের ড্রাইভার সেদিন সতর্ক করেছিলেন, ‘‌শুনুন, এসব জায়গায় আসতে হলে অ্যাম্বাসাডর ছাড়া অন্য গাড়ির কথা মোটেও ভাববেন না’‌। বক্সি‌দার সেই গাড়ি আজও রয়েছে। ব্যবহার হয়তো কমেছে, কিন্তু পুরোপুরি ছেড়ে দেননি। পরিচর্যায় আজও কোনও খামতি রাখেন না। নিয়মিত তেল ভরান। রাতবিরেতে বা বৃষ্টি–‌বাদলার দিনে শহরের বাইরে কোনও প্রয়োজনে যদি হট করে বেরোতে হয়, আজও হয়তো বুড়ো‍ অ্যাম্বাসাডারটাকেই বেছে নেবেন।
সোনারপুরের মাঝবয়সী ট্যাক্সি ড্রাইভার দীপু প্রধান যেমন সাফ জানালেন, ‘‌১৫ বছর এ লাইনে আছি, আগে হলুদ-কালো ট্যাক্সি চালাতাম, এখন হলুদ ট্যাক্সি চালাচ্ছি। সত্যি কথা বলব দাদা, অ্যাম্বাসাডর ছাড়া আজ অবধি অন্য কোনও গাড়ির স্টিয়ারিঙে হাত দিইনি।’‌ দীপুর যুক্তি, অ্যাম্বাসাডর টেকসই গাড়ি। শক্তপোক্ত। পথেঘাটে দুর্ঘটনা ঘটলে অ্যাম্বাসাডরের সওয়ারিরা অনেকটাই সুরক্ষিত থাকেন। তা ছাড়া ১৫ বছর ধরে অ্যাম্বাসাডর চালাতে চালাতে এই গাড়িটার ওপর একটা মায়াও জন্মে গেছে। হাসতে হাসতে দীপুর মন্তব্য, ‘‌ইয়ে দোস্তি হাম নেহি তোড়েঙ্গে!‌’‌
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পছন্দ বদলায়, বদলেছে। স্রেফ সেন্টিমেন্টাল কারণে কিছু লোক অ্যাম্বাসাডর এখনও রেখে দিয়েছেন গ্যারাজে, কিন্তু রাস্তায় দৌড়চ্ছে আধুনিক প্রযুক্তির ঝকঝকে স্মার্ট জাপানি, কোরীয়, মার্কিনি, জার্মান, ফরাসি গাড়ি। যাত্রী পরিবহণের জন্যেও এসে গেছে একঝাঁক সতেজ, স্বাস্থ্যবান এসইউভি। তারা অনেক বেশি গতিমান, কিন্তু জ্বালানি সাশ্রয়ী। সেখানে বুড়ো অ্যাম্বাসাডরের আজকে এই ব্যামো তো কালকে ওই ব্যামো। যে কারণে তার পোষার খরচও বাড়তে থাকল দিন দিন।
কিন্তু কী আশ্চর্য, তার পরেও টিকে গেছে অ্যাম্বাসাডর!‌ এবং ওই সব ছেলে–‌ছোকরা মার্কা মোবাইল অ্যাপে তাকে ডেকে পাঠানো যায় না। হেঁটে যেতে হয় তার কাছে। এবং আরও আশ্চর্য, আপনার ইচ্ছে হলেই হয় না, তার মর্জি হলে তবেই আপনি অ্যাম্বাসাডরের সওয়ারি হতে পারবেন। আর নয়ত সে আপনাকে স্রেফ উপেক্ষা করে, মুখের ওপর কালো ধেঁায়া ছড়িয়ে চলে যাবে। গর্বিত এবং দুর্বিনীত এক অ্যাম্বাসাডর।
কথাটা ভেবে দেখেছেন কখনও?‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top