তরুণ চক্রবর্তী: অসমে বিভেদের রাজনীতিই একমাত্র ভরসা বিজেপি–‌র। আর এটা মাথায় রেখেই অঙ্ক কষে এনআরসি, অর্থাৎ জাতীয় নাগরিকপঞ্জি–কে হাতিয়ার করেছেন বিজেপি নেতারা। কারণ, শুধু বিভেদই পারে পদ্মের গোড়ার পঁাক ধরে রাখতে। ৩১ জুলাইয়ের বদলে ৩১ আগস্ট প্রকাশিত হবে এনআরসি–‌র তালিকা। পঁাচ লক্ষেরও বেশি অসমবাসী নাগরিকত্ব হারাতে পারেন। দমবন্ধ অপেক্ষায় অসমের ৩৩টি জেলা।  
আসলে এনআরসি প্রক্রিয়ায় রয়েছে বিজেপি–‌র অন্য পার্টিগণিত। আলি, কুলি ও বাঙালি— অসমে চিরাচরিত কংগ্রেস ভোটব্যাঙ্ক। আলি মানে মুসলিম। কুলি হচ্ছে চা শ্রমিক। আর বাঙালি বলতে অসমের হিন্দু বাংলাভাষীদের ধরা হয়। অসমে ব্যবসা–বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক মারোয়াড়ি বা বিহারিরা সেভাবে আক্রান্ত না হলেও, প্রথম থেকে বাঙালিরাই বেশি আক্রান্ত। আলফার হাতেও বেশি মরতে হয়েছে বাঙালিদেরই। তবে এবার সমস্যা আরও গভীরে।
অসমে এবার শুরু হয়েছে বাঙালিদের মধ্যে বিভেদ ঘটানো। হিন্দু ও মুসলিম কার্ড খুব সচেতন ভাবেই ২০১৪ সালের আগে খেলেছিলেন বিজেপি নেতারা। কাজ হয়েছে। কিন্তু সেটা সাময়িক। তাই এবার আরও ভয়ঙ্কর খেলা শুরু হয়েছে। হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যেও বিভেদ ঘটানো হচ্ছে। একটু প্রভাবশালীদের দলে টেনে বিজেপি তাঁদের গায়ে লেপটে দিচ্ছে খিলঞ্জিয়া বা ভূমিপুত্রের লেবেল। গুয়াহাটি থেকে শুরু করে বহু শহরেই তাই বাঙালির এই চরম সর্বনাশের সন্ধিক্ষণেও কোনও প্রতিবাদ শোনা যাচ্ছে না। হিন্দুত্বের লাইন আর ব্যক্তি স্বার্থ সুরক্ষিত রাখার প্রয়োজনে বড় অংশের অসমের বাঙালিকে রাষ্ট্রক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে বিজেপি। তাই প্রতিবাদ তো দূরঅস্ত, এমন শঙ্কার দিনেও নীরব দর্শক হিন্দু বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের বড় অংশ।
বিভেদের ছক রেডি মুসলিম বাঙালি সমাজেও। মিঞা আর চালানি এই দুই শব্দে ভাগ করা হচ্ছে বাঙালি মুসলিমদের। মিঞারা হচ্ছে স্থানীয়। বংশ পরম্পরায় রয়েছেন। তাঁরা অবশ্য আজ আর নিজেদের বাঙালি বলেন না। গলায় অসমিয়া গামুছা জড়িয়ে নিজেদের খিলঞ্জিয়া ভাবতেই বেশি স্বছন্দবোধ করেন। এমনকী, বাংলার বদলে অসমিয়াতেই বেশি কথা বলাই তাঁদের পছন্দ। বিজেপি–‌র আমলে তাঁরা বেশ রসেবশেই আছেন। অন্যরা হলেন চালানি। এঁরা সকলেই গরিব অংশের মানুষ। গ্রামে অত্যন্ত দরিদ্র অবস্থায় থাকেন। কেন্দ্রীয় সরকারের কোনও সুবিধাই তাঁরা পান না। চূড়ান্ত বঞ্চনার শিকার। অন্ধ্রের চালানি রুইয়ের সঙ্গে এদের তুলনা টেনে গায়ে লেপ্টে দেওয়া হয়েছে চালানির ছাপ। ফলে, মুসলিমরাও দুই ভাগে বিভক্ত। 
প্রতিবাদ হবে না। এটাই চাইছে বিজেপি। ২০২১-এ অসমে বিধানসভার ভোট। ভোটে লড়ার মতো কোনও ইস্যু নেই। উন্নয়ন স্তব্ধ। বন্যা পরিস্থিতি বিজেপি–‌র শাসনে আরও খারাপ হয়েছে। হিমন্ত বিশ্বশর্মার নেতৃত্বে দুর্নীতি ছাপিয়ে গেছে কংগ্রেস আমলের রেকর্ড। বাড়ছে বেকারত্ব। কোনও প্রতিশ্রুতিই রাখতে পারেনি বিজেপি সরকার। লোকসভা ভোটে কংগ্রেস আমলের কিছু উন্নয়নকে হাতিয়ার করে ইভিএম, প্রচুর পয়সা খরচ আর জাতপাতের পার্টিগণিতে নিজেদের দুর্গ ধরে রাখতে পারলেও, বিধানসভায় সেটা সম্ভব নয়। আর সেটা বুঝতে পেরে বিজেপি এখনও আরও বেশি করে এনআরসি-র ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। মানুষের যাবতীয় সমস্যা ভোলাতে বিভেদের পার্টিগণিত আর এনআরসি জুজুকে আরও ভয়ঙ্কর ভাবে আগলে ধরেছেন সর্বানন্দ সোনোয়াল, হিমন্ত বিশ্বশর্মারা।
বাংলার সঙ্গেই অসমে বিধানসভার ভোট। দুটিকেই পাখির চোখ করেছে বিজেপি। কিন্তু কোনও স্বাভাবিক অঙ্কেই সেটা সম্ভব নয়। এটা বুঝতে পেরেই সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টে ফের এনআরসি–‌র তথ্য যাচাইয়ের আর্জি জানায় রাজ্য ও কেন্দ্র সরকার। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট সেই আবেদন খারিজ করায় কিছুটা হলেও সাধারণ মানুষ স্বস্তি পেয়েছেন। আর এটাই অস্বস্তির কারণ বিজেপি–‌র।
এনআরসি প্রক্রিয়া সাধারণ মানুষকে আক্ষরিক অর্থেই নিঃস্ব করে তুললেও, শাসকদলের কর্মী–‌সমর্থকদের টাকা রোজগারের রাস্তা খুলে দিয়েছে। তথ্য যাচাইয়ের নামে শুধু পুলিশ বা সরকারি কর্মীদের বড় অংশই নয়, বিজেপি সমর্থকরাও আপত্তি জানানোর নামে সংখ্যালঘুদের কাছ থেকে মোটা টাকা আদায় করে চলেছেন। রীতিমতো শিল্পের চেহারা নিয়েছে হয়রানির ব্যবসা। ফের তথ্য যাচাই হলে, আরও রোজগারের রাস্তা খুলে যেত বিজেপি–‌র তল্পিবাহকদের। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। তাই রোজগার কিছুটা কমতে পারে তাঁদের। নতুন পথ খুঁজতে হবে বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের। সেটা তাঁরা খুঁজছেনও।
অসমের মতো বাংলাতেও সর্বনাশা এনআরসি আনতে চাইছে বিজেপি। সাধারণ মানুষের সর্বনাশ হয়ে যাবে। যেমনটা হচ্ছে অসমে। কিন্তু বিজেপি সমর্থকদের সামনে থাকছে পৌষমাসের হাতছানি। মানুষের জীবন নিয়ে তাই এ রাজ্যেও ছিনিমিনি খেলতে চাইছে বিজেপি। প্রয়োজন গণ–‌প্রতিরোধের। কিন্তু অসমে তো সর্বনাশের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েও বাঙালিরা বিজেপি–‌র ফাঁদে পা দিয়ে বহুধাবিভক্ত। কিন্তু বাংলায়? ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top