প্রচেত গুপ্ত- লেখার শুরুতেই বলে রাখা দরকার, আমি করোনার ব্যাপারে প্রশাসন, চিকিৎসক এবং বিজ্ঞানী ছাড়া কারও কথা শুনব না। তাই আমি করোনা নিয়ে কিছু বলছি না। বলছি কিছু সৈনিকের কথা।
ক’‌দিন আগে এই কলমে, চীনের ডাক্তারবাবুদের ধন্যবাদ জানিয়েছিলাম। বলেছিলাম, করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে ডাক্তারবাবুরা ওখানে যেভাবে লড়ছেন, ভাবা যায় না! ভাইরাস যেমন সীমানা মানে না, ডাক্তারবাবু, স্বাস্থ্যকর্মীদেরও দেশ, সীমানা হয় না। চিকিৎসা, সেবা সব দেশেই এক ভাষায় কথা বলে। আসুন, তাঁদের জন্য গর্ব বোধ করি।
যখন লেখাটি লিখি, তখনও করোনার এই ভয়াবহ আঁচ আমাদের দেশে এসে পৌঁছোয়নি। হালকা শোনা যাচ্ছে মাত্র। একটা–‌দুটো করে কেস হচ্ছে। সেদিন আমার লেখা দেখে কেউ কেউ বলেছিল, করোনা নিয়ে বেশি লাফালাফি হয়েছে। করোনা অত কিছু ব্যাপার নয়। দেশে আরও অনেক বড় সমস্যা রয়েছে, লিখতে হলে সে–‌সব নিয়ে লেখাই উচিত। কই, আর কেউ তো লেখেনি!‌ আবার কেউ কেউ লেখাটাকে পাত্তাই দেয়নি। ও–‌রকম যে একটা লেখা হয়েছে, সেটাই যেন দেখতে পায়নি। এই লোক গল্পটল্প লেখে, এ আবার করোনাভাইরাস নিয়ে কী লিখবে!‌ কেনই বা লিখবে!‌ এই সমালোচনায় আমি দুঃখ পাইনি। বরং মনে মনে কামনা করেছিলাম, সমালোচকদের কথাই যেন ঠিক হয়। যেন প্রমাণিত হয়, আমি করোনাভাইরাস নিয়ে লিখে ভুল করেছি। যেন প্রমাণ হয়, খবরের কাগজে কলম লেখবার মতো কোনও ঘটনা এটা নয়। সবার আগে লেখা তো মস্ত ভুল হয়েছে।
আমি খুব আশা করেছিলাম, সেটাই হবে। চেয়েছিলাম সেটাই হোক।
আমার দুর্ভাগ্য, দেশের দুর্ভাগ্য, তা হল না। করোনা ভয়ঙ্কর থাবা নিয়ে এগিয়ে এসেছে। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে সারা পৃথিবীর সঙ্গে আমাদের দেশের সবথেকে বড় ঘটনা হয়ে দঁাড়িয়েছে। সবচেয়ে বলছি কেন, একমাত্র ঘটনা হয়ে দঁাড়িয়েছে। মানবসভ্যতা আজ এক ভয়ঙ্কর চ্যালেঞ্জের সামনে।
আমি এই প্রসঙ্গের অবতারণা করলাম কেন? নিজের লেখার কথা মনে করিয়ে দিতে?‌ না, তার প্রয়োজন আমার হয় না।‌ করলাম এই কারণে, সংবাদপত্রে একটা লেখাকে ‘‌তাচ্ছিল্য’‌ করলে কিছু এসে যায় না, ‘‌বাড়াবাড়ি’‌ হয়েছে বললে কিছু আসে যায় না, কিন্ত করোনার সতর্কতাতে তাচ্ছিল্য করলে এসে যাবে। ‘‌বাড়াবাড়ি’‌ ভাবলে বিরাট ভুল হবে। শুধু যে ভাববে তার ক্ষতি হবে না, সবার ক্ষতি হবে। বরং ভাববেন কম। ভাববেন, নিয়মবিধি আরও কড়া হলে ভাল হত।
সেদিন অন্য দেশের চিকিৎসকদের কথা বলেছিলাম, আজ অভিবাদন জানাই বাংলার চিকিৎসকদের। তঁারা ইতিমধ্যেই যে ভূমিকা পালন করতে শুরু করেছেন, তা অভূতপূর্ব। কেউ ভাবতে পারেন, এখনও তো প্রকোপ সেভাবে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেনি, তার আগেই এত প্রশংসা কীসের!‌ মনে হয়, এই কলমে আমার একটু ‘‌আগে’‌ বলে ফেলবার বদ অভ্যেস হয়েছে। আমাকে মাফ করবেন।
তবে এটা কিন্তু আগে বলছি না। বাংলার ডাক্তারবাবুদের এই অভিবাদন জানানোর পিছনে আমার হাতে তিনটে তথ্য রয়েছে—
‌১)‌ বাংলার চিকিৎসকেরা যেভাবে করোনা নিয়ে মানুষকে সচেতন করবার চেষ্টা করছেন, তা এক কথায় অসাধারণ, অভূতপূর্ব। টিভি চ্যানেলে, সংবাদপত্রে, নিউজ পোর্টালে তাঁরা মন–‌প্রাণ দিয়ে সাধারণ মানুষকে এই ভাইরাসের বিপদ বোঝাচ্ছেন। কী করতে হবে বলছেন। কী করতে হবে না বলছেন। চিকিৎসা–বিজ্ঞানের জটিল কথা সহজ করে দিচ্ছেন। বিশ্বের কোথাও কি এভাবে এবং আগে চিকিৎসকেরা শিক্ষকের ভূমিকা নিয়েছিলেন?‌
২)‌ আমি বাংলার এক জেলার খবর জানি, যেখানে জনসংখ্যা অনেক। গ্রামের বহু মানুষ কাজ করতে বাইরে যান। গত পরশু পর্যন্ত বাড়ি ফিরেছেন। এক সরকারি চিকিৎসক–‌অধিকর্তার প্রবল উদ্যোগে, কর্তব্যে এবং দায়িত্বজ্ঞানে তাঁদের বাড়ি–‌বাড়ি থেকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে এসে স্বাস্থ্যপরীক্ষার কাজ হচ্ছে। আমেরিকা, চীন, ইতালি, জার্মানির তুলনায় আমাদের ওই জেলার স্বাস্থ্য–‌পরিকাঠামো কতটুকু? কিন্তু সেখানকার চিকিৎসকদের এই দায়িত্ববোধ ওঁদের থেকে কিছুমাত্র কম নয়।
বুঝতেই পারছেন, এই সরকারি চিকিৎসক–‌অধিকর্তা কোনও প্রচার চান না। তঁার পরিচয় কিছুই দিলাম না।
৩)‌ আমি এক পরিবারকে চিনি, যেখানে স্বামী, স্ত্রী, কন্যা তিনজনই চিকিৎসক। ভদ্রলোক কলকাতার এক হাসপাতালে করোনা চিকিৎসার আয়োজনে ব্যস্ত। তঁার স্ত্রী এক জেলা সদর হাসপাতালে ফিভার ক্লিনিক নিয়ে পড়ে রয়েছেন। কন্যা সবে ডাক্তার হয়েছেন। তাঁর কলকাতায় হাসপাতাল। তিনিও তিন দিন বাড়ি ফেরেননি। বাবা–‌মা উদ্বিগ্ন হলে হেসে বলছেন, ‌‘‌তোমরাও ভয় পেলে চলবে কেন?‌’‌
এই পরিবারও যে প্রচারে নেই, সে–‌কথা নিশ্চয় বোঝা যাচ্ছে।
এ–‌রকম অজস্র উদাহরণ রয়েছে। কিন্তু এই তিন ঘটনাই কি প্রমাণ করে না, করোনার সঙ্গে যুদ্ধ করতে সীমিত সামর্থ্য আর আকাশছেঁায়া দায়িত্ববোধ নিয়ে বাংলার ডাক্তারবাবুরা যুদ্ধের জন্য ওয়ার্ম–‌আপ করছেন?‌
অবশ্যই এঁরা একা নন, এঁদের সঙ্গে রয়েছেন নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মী।
আমার কেউ চাই না যুদ্ধ দীর্ঘ হোক। তবে আমাদের বাংলার চিকিৎসকেরা বিনা যুদ্ধে করোনাকে সূচ্যগ্র মেদিনীও ছাড়বেন না, বোঝা যাচ্ছে।
এ–‌কথা যে কত বড় সত্য, ইতিহাস প্রমাণ করবে।

জনপ্রিয়

Back To Top