তরুণ চক্রবর্তী: ‘সুধাকণ্ঠ’ ভূপেন হাজারিকার প্রয়াণ দিবস চলে গেল ৫ নভেম্বর। আজ, এনআরসি বিভাজনের শিকার অসমে তাঁর কথাই বারবার মনে পড়ছে। ২০০৪ সালের সাময়িক বিচ্যুতি বাদ দিলে, তঁার জীবন ও গানই পারে অসমকে সঠিক পথ দেখাতে। তরুণ প্রজন্মকে বোঝাতে, ‘মানুষ মানুষের জন্য’।
২০০৪ সালে ‘বন্ধু’ অটলবিহারী বাজপেয়ীর অনুরোধ ফেলতে না পেরে বিজেপি–‌র হয়ে ভোটে ‌দঁাড়ান মনে–প্রাণে অসাম্প্রদায়িক মানুষটি। অসমের গর্ব হয়েও তাঁকে হার মানতে হয়। তারপর শিল্পী নিজেই স্বীকার করেছিলেন, ‘ভুল হয়েছিল। অনেকে আঘাত পেয়েছেন আমার রাজনৈতিক পরিচয়ে। শিল্পী হিসেবে মানুষের কথা বলাই আমার কাজ।’ অসমের মানুষও তাঁর ভুলকে ভুল হিসেবেই দেখেছেন। তাঁর ছোটবোন সুদক্ষিণা শর্মা বা ভ্রাতৃবধূ মনীষা হাজারিকা অবশ্য আগেই তাঁকে বলেছিলেন ভোটে না দাঁড়াতে। কিন্তু সুধাকণ্ঠ সেদিন অকপটে বলেওছিলেন, ‘বন্ধু বাজপেয়ীর অনুরোধ ফেলতে পারিনি।’
এটা বাদ দিলে তাঁর জীবনই তো অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ভরা। কলম্বিয়ায় পিএইচডি করতে গিয়ে বিয়ে করেন গুজরাটি শান্তিপ্রিয়া প্যাটেলকে। তাঁর অকালপ্রয়াত ভাই জয়ন্ত হাজারিকার স্ত্রী মনীষা বাঙালি। ১০ ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে বড় ভূপেনই ভাইয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর বোন কুইনি বিয়ে করেন দিলীপ শর্মাকে। দিলীপের বাবা দীননাথ শর্মা ছিলেন ব্রাহ্মণ। ভূপেন হাজারিকারা শুদ্র। বোনের হয়ে বিয়ের পক্ষে সওয়াল করেন বড়দাদাই। দীননাথবাবু ছিলেন ডাক্তার। কিন্তু ডাক্তারি ছেড়ে সুনীতি চট্টরাজের তত্ত্ব খারিজ করতে পত্রিকা বের করেন। আবাহন। সেখানে তিনি যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন, বাংলা ভাষা থেকে নয়, অসমিয়া ও ওড়িয়া সংস্কৃত ভাষা থেকে বাংলার মতোই সৃষ্টি হয়েছে। এহেন দীননাথ তাঁর বোনকে পুত্রবধূ হিসেবে মেনে নেন। শর্ত ছিল। পণ হিসেবে তিনি নেন সু দক্ষিণা। সেই সু দক্ষিণাতেই অসমে গণনাট্য আন্দোলনের জনপ্রিয় দম্পতি দিলীপ শর্মার স্ত্রী কুইনি হয়ে ওঠেন সুদক্সিনা। একই পরম্পরা মেনে শিল্পীর ছেলে তেজ ভূপেন হাজারিকা বিয়ে করেন আফ্রিকান মেয়েকে।
আসলে তিনি মনে–‌প্রাণেই মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখেছেন জীবনভর। শুধু গানের কলিতে নয়। অসমের সব সম্প্রদায়ের জন্যই শুধু নয়, উত্তর–‌পূর্বাঞ্চলের সব রাজ্যের মানুষদের প্রতি ছিল তাঁর অসীম ভালবাসা। ভালবাসা ছিল মানবজাতির প্রতি। সেই ভালবাসার কথা প্রতিধ্বনিত হয়েছে শুধু তাঁর গানে নয়, বর্ণময় কর্মজীবনেও।
২০০৪–এর আগেও ভোটে লড়েছেন। বিধায়ক হয়েছেন। তবে কোনও দলের হয়ে নয়। নির্দল হিসেবে। তাঁর বাবা মৃত্যুর আগের দিন ছেলেকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, প্রতিবাদী কণ্ঠ বিধানসভার ভিতরে তুলে ধরা দরকার। তাই অনুরাগীদের আবদারে লখিমপুর জেলার নতুন কেন্দ্র নাওবাইচা থেকে ১৯৬৭ সালে নির্দল প্রার্থী হিসেবে ভোটে জেতেন তিনি। বিধানসভার ভিতরে সব সময়ই তাঁকে দেখা গেছে নির্দল ভূমিকাতেই। বিধানসভায় তিনিই প্রথম বলেন, ‘বরাক ও ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার সমোন্নয়ন জরুরি। একে–‌অন্যকে বাদ দিয়ে কিছুতেই অসমের উন্নতি সম্ভব নয়। বাঙালি, অসমিয়াই শুধু নয়, সমস্ত জাতিগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে হবে।’
অসম সাহিত্য সভার সভাপতি নির্বাচিত হয়ে তিনি তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, ‘অন্যকে যে ঘৃণা করে, সে কখনওই অসমিয়া হতে পারে না। মহাবাহু ব্রহ্মপুত্র সকল মানুষের মিলনক্ষেত্র।’ আজ, এনআরসি–‌পরবর্তী অসমে উগ্রআধিপত্যবাদের সময়ে তাঁকেই সবচেয়ে বেশি জরুরি ছিল। বলছেন সুশীল সমাজের অনেকেই। তাঁর বোন সুদক্সিনার মতে, ‘দাদার ছিল সব মানুষের প্রতি অসীম ভালবাসা। অসাম্প্রদায়িক চেতনা ছিল তাঁর। ছিল না রাজনৈতিক কোনও পক্ষপাতও।’ এটা বাস্তব। ইন্দো–চীন যুদ্ধের কারণে কমিউনিস্টদের প্রতিও তাঁর ক্ষোভ বহুবার প্রকাশ পায়। 
জনতান্ত্রিক দল গড়ে অসমের দাপুটে কমিউনিস্ট নেতা হেম বড়ুয়ার বিরুদ্ধে একবার লোকসভা ভোটে লড়েন তিনি। ভোট কাটাকুটিতে দুজনেই পরাস্ত হন। জিতে যায় কংগ্রেস। সক্রিয় রাজনীতি না করলেও, সামাজিক কর্মকাণ্ডে তাঁকে দেখা গেছে সবসময়। ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের হয়ে সংস্কৃতি বিকাশে লড়াই করেছেন। সুস্থ সংস্কৃতির জন্য লড়াই ছিল তাঁর। ছিল জাতি, ধর্ম, বর্ণ নিয়ে বিভেধের বিরুদ্ধে লড়াই। অসমে বঙাল খেদা আন্দোলনের তীব্র বিরোধী ছিলেন তিনি। যুদ্ধ বা রক্তক্ষয়ের বদলে চাইতেন মানবতার জয়গান। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তাই গর্জে ওঠে তাঁর কণ্ঠ।
আজ ভূপেন হাজারিকা না থেকেও আছেন তঁার গানের মধ্যে। সেই মানুষটি, যাঁর হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ, চেতনায় নজরুল। গঙ্গা ও যাঁর মা, পদ্মাও তাঁর মা। একই আকাশ আর এক বাতাসে মুক্তমনা যাযাবরই তো পারেন ‘দুর্বল মানুষ’–কে রক্ষার ডাক দিতে। দানব মানুষ হলে সেটা যে লজ্জার, সেটাও তো তিনিই শিখিয়েছেন। শিখিয়েছেন— ‘সংগ্রাম আর এক নাম জীবনের’।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top