তাপস গঙ্গোপাধ্যায়: এসএসকেএম হাসপাতাল হরিশ মুখার্জি রোডের পশ্চিমপারে আর ঠিক পুবপারে দু মানুষ উঁচু দেয়াল ঘেরা সাড়ে ৫ বিঘা জমির ওপর মুর্শিদাবাদের কাশিমবাজার রাজবাড়ির কলকাতা প্রাসাদ। ওই প্রাসাদেই থাকেন একদা রাজবধূ, এখন শুধু রাজমাতা নন, পিতামহীও বটে সুপ্রিয়া রায়। সুপ্রিয়াদেবীদের ওই প্রাসাদের সাদা লোহার গেট সর্বদা বন্ধ। শুধু যখন নিজেরা বাইরে বেরোন বা দ্য সুগার অ্যান্ড স্পাইসের কেক, কুকিস, প্যাস্ট্রি, প্যাটিস বোঝাই ভ্যান বেরোয় কলকাতা ও আশপাশের জেলার সাপ্লাই নিয়ে তখন সামনে দঁাড়ালে বোঝা যায় ভেতরে কী পরিমাণ জায়গা ও কত ভ্যান ও প্রাইভেট গাড়ি। মাত্র ১৩ বছর বয়সে ১৯৬৩ সালে কাশিমবাজার রায় রাজবাড়ির উত্তরাধিকারী প্রশান্ত রায়ের সঙ্গে বালিকা সুপ্রিয়ার বিয়ে হয়। তাঁর আরও মনে আছে কাশিমবাজার–‌প্রাসাদে তখন বিদ্যুৎ ছিল না, ডায়নামো চালিয়ে কিছুক্ষণ ওই প্রাসাদ আলোকিত হত। ৫ ভাই, ৩ বোনের মধ্যে সপ্তম সুপ্রিয়া বিয়ের বিশ বছরের মধ্যেই বিপ্লব ঘটিয়ে দেন রায়বাড়িতে।
বাবা অজিতকুমার গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন সরকারি সিভিল কন্ট্রাক্টর। দমদম এয়ারপোর্ট থেকে কলকাতার টিউব রেলের কাজ পর্যন্ত করেছেন। মানিকতলায় একটি এবং দক্ষিণ কলকাতায় সুপ্রিয়ার শ্বশুরবাড়ির অদূরে তিনটি বাড়ি বানান। সুপ্রিয়ার কথায়, কোনওটাই বিশাল নয় তবে খুবই নিখুঁত ও গুছোনো। ওঁর মা সতীরানি গুছিয়ে সংসার করতে ভালবাসতেন।
তাই বিয়ের পর রায়বাড়িতে এসে দেখলেন, ওঁর কথায়, ‘‌ঠাকুরবাড়ির মতো সব কিছু ম্যানেজারদের হাতে।’‌ না, বিদ্রোহ করেননি। আস্তে আস্তে কাশিমবাজার ও কলকাতার যাবতীয় দায় ও দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। এরই ফাঁকে হোটেল ম্যানেজমেন্টের ডিপ্লোমাও আদায় করেন। সেই সুবাদে কলকাতার প্রাসাদের এক প্রান্তে ওঁদের স্বতন্ত্র অ্যাপার্টমেন্টে আর্ট অ্যান্ড ক্র‌্যাফটের স্কুল খোলেন, যেখানে ভদ্রঘরের মেয়েরা মাইনে দিয়ে বেকারি, কুকারি, ভারতীয়, মোগলাই, চাইনিজ, ফ্রেঞ্চ নানা রান্না শিখতে আসতেন। বেকারির ক্লাস নিতেন সুপ্রিয়া। পড়াতে পড়াতে আবিষ্কার করলেন সাধারণ মানুষের চাহিদা মেটানোর মতো যথেষ্ট কনফেকশনারি প্রতিষ্ঠান নেই শহরে।
তখন ১৯৯০ সালে ৪০ বছর বয়সে রাজবাড়ির গেটের বাঁদিকে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে শুরু করলেন কেক, প্যাস্ট্রি, কুকিজ ইত্যাদির সংস্থা ‘‌দ্য ‌সুগার অ্যান্ড স্পাইস’‌‌। নিজের স্কুলের রোজগার এবং সংসার খরচের টাকা জমিয়ে হাতে ছিল ৩ লাখ। ওই পুঁজি এবং নিজের ওপর অগাধ আস্থা এবং স্বামী প্রশান্ত রায়ের উৎসাহে রাজবধূ হয়ে উঠলেন ব্যবসায়ী। ১৯৯০ থেকে ২০১৮, ২৮ বছরে পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ কনফেকশনারিতে পরিণত হয়েছে এই সংস্থা। ২৮ বছর আগে বারোটি ছাত্রীকে নিয়ে যে যাত্রা শুরু করেছিলেন, এখন তা হয়ে উঠেছে ১২৫টি শাখা, একটি কারখানা এবং ৫০০ কর্মীর সংস্থা। বছরে টার্ন ওভার ৬০ কোটি। কলকাতার রাজবাড়ির একতলায় একটি ওভাল সেপড ছোট এসি ঘরে বসে সংসার থেকে ব্যবসা সব চালান। একমাত্র ছেলে পল্লব, এমবিএ পাশ করে মার পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর ছেলে সৌরভও এমবিএ পড়ছে। এই ঘরে ২টি ফটো, একটিতে সুপ্রিয়াদেবীর মা ও বাবার অন্যটিতে বড়দার। সম্প্রতি ওই অফিসে স্বামী প্রশান্ত রায়ের পাশে বসে সুপ্রিয়াদেবীর সঙ্গে গল্প করছিলাম। বললেন, ব্যবসা বাড়াব কিনা জানি না তবে আগে আরও দুটি কারখানা দরকার। তাই হাওড়ার সাঁকরাইলে পেপসির পাশে এক খণ্ড এবং শিলিগুড়িতে আর এক খণ্ড জমি নিয়েছি। আরও দুটি কারখানা দরকার চাহিদা মেটানোর জন্য। তবে প্রাইভেট হাতেই থাকুক আমাদের ব্যবসা, বাড়ানোর জন্য পাবলিক লিমিটেড করতে চাই না।
বিয়ের পর গত ৫৫ বছরে বহু পরিবর্তন এনেছেন রাজবাড়িতে। কাশিমবাজারের সেই বিখ্যাত দর্শনীয় প্রাসাদের একাংশ এখন ‘‌রূপকথা’‌ নামে মোটেল। একই ভাবে কালিম্পং এবং কলকাতার গোখেল রোডেও দুটি গেস্ট হাউস খুলেছেন। ‘‌যা দেখছেন সবই করেছি রাজ পরিবারের পড়তি অবস্থা ঠেকাতে’‌, স্ত্রীর কথা শুনতে শুনতে প্রশান্তবাবু ঘাড় নেড়ে সায় দিলেন। সুপ্রিয়া বললেন, ‘‌উনি কোনওদিন কোনও ব্যাপারে বাধা দেননি, বরং উৎসাহ দিয়েছেন।’‌ এবার প্রশান্তবাবু মুখ খুললেন, ‘‌কাশিমবাজারের মূল রাজ পরিবার নন্দীরা, যাঁদের পূর্বতম পুরুষ ছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস–‌এর ঘনিষ্ঠজন। তখনই ওরা কোম্পানির কাছ থেকে রাজা খেতাব পান। আমরা রায়রা ব্যবসায়ী পরিবার। গত শতাব্দীতে আমার ঠাকুর্দা লর্ড  মিন্টোর আমলে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে পান এই রাজা খেতাব, যা তাঁর বাবা পেতেন হঠাৎ প্রয়াত না হলে। তা ছাড়া এই বাড়ির দক্ষিণতম দেয়াল ঘেঁষে যে বিখ্যাত ‘‌রায় অ্যান্ড রায়’‌ ওষুধের দোকান সেটা তো আমিই চালাই।’‌
রাজজোটক এই দম্পতিকে নমস্কার জানিয়ে বিদায় নেওয়ার মুখে লক্ষ্য করলাম সুপ্রিয়াদেবীর ডান হাতে চারটি আঙুলে চারটি আংটি আর একটা সাদা শাঁখা ছাড়া কোনও গয়না নেই গৌরাঙ্গী এই মহিলার তাঁতের শাড়িতে ঢাকা গায়ে। মাঝারি গড়ন, ছিমছাম মানুষটি হাতজোড় করে বললেন, ‘‌আবার আসবেন‌।’‌ ঠোঁটের ওপর নাকের প্রান্তে অনেক বছর আগে দেখা তিলটিও দেখলাম। লোকে বলে এই তিল নাকি সৌভাগ্যের লক্ষণ। ‌‌‌‌‌‌

 

 

ভবানীপুরে সুগার অ্যান্ড স্পাইসের দোকান। পাশে, সুপ্রিয়া রায়। ছবি: কাজি মিঠুন

জনপ্রিয়

Back To Top