নিজেকে বলেন ‘গরিবের রঘুরাম রাজন’। সেই বিরল আচার্য নিজেকে সরিয়ে নিলেন রিজার্ভ ব্যাঙ্ক থেকে। ফিরছেন অধ্যাপনায়। লিখলেন দেবারতি দাশগুপ্ত। 

‘‌বুড়ো মানুষেরা এত সকাল সকাল ওঠে কেন?‌ আরও একটা দীর্ঘ দিন দেখবে বলে?‌’‌ বিখ্যাত উপন্যাস ‘‌ওল্ডম্যান অ্যান্ড দ্য সি’‌–‌র সেই বুড়ো ‌‌সান্তিয়াগোর অমোঘ উক্তিটি উদ্ধৃত করেছিলেন বিরল আচার্য। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের শেষ মনিটারি পলিসি কমিটি (‌এমপিসি)‌–‌র বৈঠকে। সঙ্গে জুড়েছিলেন, ‘‌দেখলাম আমিও বৈঠকের প্রস্তুতি শুরু করেছি ঢের আগে। আরও একটা দিন রিপোর্ট তৈরির সময় পেয়েছি বলে!‌’‌ রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ডেপুটি গভর্নরের পদ থেকে বিদায়ের সময় আসন্ন। সেই আভাসই দিয়েছিলেন কি?‌ ব্যাঙ্কের কর্মকাণ্ড নিয়ে তাঁর অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছিল ক্রিকেটীয় বর্ণনায় ‘‌বৃদ্ধির দিকে মন দিতে গিয়ে হেলমেট খুলে নিতে স্বচ্ছন্দ বোধ করি। যদিও ক্রিজেই থাকি।’‌ 
এসবই কি পদত্যাগের পূর্বাভাস?‌ রিজার্ভ ব্যাঙ্ক থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বিরল?‌ মেয়াদ ছিল তিন বছরের। ২০১৭–‌র ২৩ জানুয়ারি থেকে ২০২০–‌র ২৩ জানুয়ারি। তার ছ’‌মাস আগেই পাকাপাকিভাবে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেন। আপাতত অর্থনীতির অধ্যাপনায় ফিরবেন নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টার্ন স্কুল অফ বিজনেসে। 
এই ঘটনাক্রমে একটি অবশ্যম্ভাবী প্রশ্ন চাগাড় দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিরই সৌজন্যে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষিত অমর্ত্য সেনকে কটাক্ষ করে তাঁর মন্তব্য ছিল,‘‌হার্ভার্ডকে ছাপিয়ে যাবে হার্ড ওয়ার্ক।‌’‌ এখন প্রশ্ন হল, শ্লথ আর্থিক অবস্থায় গতি আনতে পারবে তো হার্ডওয়ার্ক?‌
আর্থিক উপদেষ্টা অরবিন্দ সুব্রহ্মণ্যম, নীতি আয়োগ প্রধান অরবিন্দ পানগড়িয়া, বন্দিত অর্থনীতিবিদ, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গর্ভনর রঘুরাম রাজন, তাঁর উত্তরসূরি উর্জিত প্যাটেল—সবাই ছিলেন মোদির বাছাই। সবাই একে একে বিদায় নিয়েছেন মোদি সরকারের স্বাধীনতাহরণের প্রবণতায়। সেই তালিকাতেই নাম সংযোজন হল বিরল আচার্যের।
নিজেকে ‘‌গরিবের রঘুরাম রাজন’‌ বলেন। নামে বিরল। মাত্র ৪৫ ‌বছরে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ডেপুটি গভর্নরের পদে তাঁর নিয়োগের ঘটনাও বিরল। মুম্বইয়ের ছেলে বিরলের জন্ম ১ মার্চ, ১৯৭৪–‌এ। শহরের রুপারেল কলেজ থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক। উচ্চশিক্ষা বম্বে আইআইটি–‌তে। সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে স্বর্ণপদক পেয়েছিলেন। পড়াশোনার বরাবর তুখোড় বিরল পিএইচডি করেছেন নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। গবেষণার বিষয় ছিল,‘‌ব্যাঙ্কিং অ্যান্ড ফিনানশিয়াল ইনস্টিটিউশন্‌স’‌। প্রথম চাকরি ‘‌লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্স’‌–‌এ। কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে আরও একটি গবেষণা করতে আবার নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত স্টার্ন স্কুল অফ বিজনেসে অর্থনীতির অধ্যাপনা শুরু করেন ২০০৮ থেকে। সিভি স্টার প্রফেসর অফ ইকনমিক্স–‌এর চেয়ার পেয়েছিলেন। 
আদ্যন্ত পড়ুয়া, শিক্ষায় দুর্ধর্ষ ট্র‌্যাক রেকর্ডের অধিকারী বিরলের শখ বলতে গান। দিব্যি ভাল গান। ‘‌ইয়াদোঁ কে সিলসিলে’‌ নামের একটি হিন্দি গানের অ্যালবামে সুরও দিয়ে ফেলেছেন। 
গত ২৪ জুন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ডেপুটি গভর্নরের পদ থেকে ইস্তফা ঘোষণা করতেই ফের খবরে বিরল। তবে গত ডিসেম্বর থেকেই এমন এক জল্পনা চলছিল। যে জল্পনা একেবারে নস্যাৎ করে ব্যাঙ্কের গভর্নর শক্তিকান্ত দাসের জবাব ছিল,‘‌কই না তো!‌ এই মাত্র বিরলের সঙ্গে চা খেলাম। সবই তো ঠিক আছে।’‌ সব ঠিক যে ছিল না, এমপিসি–‌র বৈঠকেই বারবার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন বিরল। গত সেপ্টেম্বরে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সঙ্গে সরকারের ঠাণ্ডা যুদ্ধ লেগেছিল। ব্যাঙ্কের বাড়তি টাকা সরকারি প্রকল্পে ঢালার ফরমান নিয়ে। বেঁকে বসেছিলেন ব্যাঙ্কের তৎকালীন গভর্নর উর্জিত। সঙ্গে তাঁর ডেপুটি বিরলও। ব্যাঙ্কের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সরকারি হস্তক্ষেপের বিরোধিতাতেও সোচ্চার ছিলেন তাঁরা। উর্জিত পদত্যাগে বাধ্য হওয়ার পর লড়াই চালিয়ে যান বিরল। এমপিসি–‌র বৈঠকে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ঋণের হার কমানোর সিদ্ধান্তে অসন্তোষ দেখান। গত আড়াই বছরে এমপিসি–‌র ১৫টি বৈঠকের মাত্র দু’‌বারই রেপো রেট কমানোর প্রস্তাবে সায় দিয়েছিলেন। ৪ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা রেখে মু্দ্রাস্ফীতিতে জোর দিতে চেয়েছিলেন। যা গ্রাহ্য হয়নি। ৬ জুন শেষ সুদের হার কমানোর সিদ্ধান্ত নেয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। চলতি বছরে পরপর তিনবার। সেদিন সাংবাদিক সম্মেলনে আশ্চর্যরকম চুপচাপ ছিলেন এমনিতে বলিয়ে–কইয়ে বিরল। কোনও প্রশ্ন নেননি। সাংবাদিক সম্মেলন চলাকালীন তাঁর হাবভাব ছিল লক্ষণীয়। মাথা নীচু করে একমনে কাগজপত্র গোছাচ্ছিলেন। উপস্থিত অনেকেরই মনে হয়েছিল, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গুরুভার আর বইতে পারছেন না বিরল। অব্যাহতি চান তিনি। 
পদত্যাগের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর কোনও বিবৃতি দেননি। তবে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কয়েকজন সহকর্মীকে বলেছিলেন, আমেরিকায় পরিবারের কাছে ফিরতে চান। পুরনো কাজে ফিরতে চান। আরও একটা স্মরণীয় কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন, ‘‌আমার স্কুলের শিক্ষকের পরামর্শই শিরোধার্য। তিনি সবসময় বলতেন, তোমার কাজই যখন তোমার কথা বলবে, তখন খামোখা বাধা দিও না।’‌ 
আগস্টে নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠক্রম শুরু হয়। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের পাট চুকিয়ে, রাজনীতি, কূটনীতির বাতাবরণ থেকে বহু দূরে স্টার্ন স্কুল অফ বিজনেসের প্রশস্ত চত্বর পেরিয়ে চেনা ক্লাসরুমে এক ঝাঁক ছাত্র‌ছাত্রীর কাছে ফিরবেন আচার্য বিরল। ‌

জনপ্রিয়

Back To Top