তাপস গঙ্গোপাধ্যায়: ১৫৬ বছরে কলকাতার আকৃতি, প্রকৃতি, চাল–‌চালন, ফ্যাশন সবই বদলে গেছে। কলকাতা তখন সাহেবপাড়া আর নেটিভপাড়ায় ভাগ। নেটিভপাড়ার শুরু যদি হয় বরানগর, কাশীপুর, শেষ ছিল কর্নওয়ালিশ স্ট্রিট বা বিধান রায় সরণিতে। আজ সেই কলকাতা ছড়িয়ে বারাসাত থেকে বারুইপুর, বেহালা ছাড়িয়ে পৈলান পর্যন্ত। এই বিশাল ২ কোটির মেগাপলিসে অন্তহীন দোকান আর সাজপোশাকের অনন্ত ডালি। তার মধ্যে নিজগুণে জ্বলজ্বল করছে প্রিয়গোপাল বিষয়ী— ১৬২ বছর ধরে কলকাতা তথা গোটা দেশের শাড়ির বাজারে জাঁকিয়ে। এই দোকানটির জন্ম ওই ১৫৬ বছর আগে, ১৮৬২ সালে, বর্তমানে বড়বাজারের ৭০ পুরুষোত্তম রায় স্ট্রিটের একটা দোতলা বাড়ির দোতলায়। রবীন্দ্রনাথ ও প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের চেয়ে দোকানটি বয়সে এক বছরের ছোট। প্রতিষ্ঠাতা বিষয়ীমশাই বর্ধমানের মেমারি থেকে কলকাতায় এসেছিলেন শাড়ি বেচতে। তখন ব্রিটিশ ভারতের প্রথম রাজ প্রতিনিধি বা ভাইসরয় লর্ড ক্যানিং বিদায় নিয়েছেন, তার জায়গায় এসেছেন দ্বিতীয় ভাইসরয় লর্ড এলগিন। 
কাপড়ের দোকান জমে গেল বড়বাজারে। কিন্তু তাঁর অবর্তমানে দেখবে কে?‌ সন্তান একটি মাত্র মেয়ে তারকদাসী। বিষয়ী মশাই মেয়ের বিয়ে দিয়ে ছেলে আনলেন ওই বর্ধমান জেলার বোহার গ্রাম থেকে— অমরনাথ লাহা। অত্যন্ত উদ্যোগী, চটপটে যুবক। মুর্শিদাবাদ জেলা চষে সিল্কের থান আনতেন জামাই। কিন্তু সেই কোরা সিল্কের কাপড় পরবে কে?‌ এর সমাধানটাও বার করলেন অমরনাথ। শ্রীরামপুর ছিল বাংলা প্রিন্ট মিডিয়ার মতো ছাপা শাড়িরও প্রাণ কেন্দ্র। শ্রীরামপুর থেকে মুর্শিদাবাদী সিল্কের থান নিজের নকশা অনুযায়ী ছাপিয়ে এনে শুধু কলকাতায় নয়, দিল্লি এবং বিশেষ করে মাদ্রাজে বেচাও শুরু করলেন। মাদ্রাজ থেকে প্রিয়গোপাল বিষয়ীর সিল্কের শাড়ি সিলোনে (‌বর্তমানে শ্রীলঙ্কা)‌ তামিল আভিবাসী মহিলাদের চাহিদা মেটাতে সমুদ্র পাড়ি দিল। বাংলার প্রথম গভর্নর লর্ড কারমাইকেল পিজিবি–‌এর শাড়ি ও স্কার্ফ–‌এর নকশা দেখে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। ১৯১৫। প্রথমে জামাই, পরে দৌহিত্র জগবন্ধু প্রিয়গোপালের কাজের বোঝা খানিক হালকা করলে, তিনি আমলাশোলের কাছে বেলপাহাড়িতে কয়লাখনি খুলে কয়লার উৎপাদন শুরু করেন। 
ব্যবসা জমে উঠল জগবন্ধু দোকানের হাল ধরতেই। বড়বাজারেই আর একটি দোকান খুললেন। একটিতে চলল রিটেল সেল, দ্বিতীয়টিতে শুধু পাইকারি। জগবন্ধুর আমলে ব্যবসা যেমন চতুর্গুণ বাড়ল, তেমনি পরিবারও। তাঁর চার ছেলে। বড় দিলীপ (‌বর্তমানে প্রয়াত)‌, মেজ দুর্গাচরণ, সেজ মধুসূদন, ছোট কৃষ্ণচন্দ্র। চাহিদার চাপে পুরনো হ্যারিসন রোডে আর একটি রিটেল ইউনিট খোলা হল। জগবন্ধুর নির্দেশে প্রথম দিলীপ, পরে তাঁর বড় ছেলে সৌম্যজিৎকে পাঠানো হল দক্ষিণে রাসবিহারী অ্যাভিনিউতে নতুন দোকানের হাল ধরতে। ট্রায়াঙ্গুলার পার্কের উত্তরে চওড়া রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ের গায়ে হকার–‌হীন রাস্তার সমান চওড়া ফুটপাথের ধারে তিনতলা জুড়ে ৩৫০০ থেকে ৪০০০ বর্গফুটের প্রিয়গোপাল বিষয়ীর নবতম রিটেল দোকান। বাংলা থেকে কেরলের তাঁত, বাংলার জামদানি, বালুচরি, মুর্শিদাবাদী থেকে অন্ধ্র, আসাম— গোটা ভারতের সিল্ক হাজির। পাশাপাশি বাঙালি বিয়েতে বরের ধুতি ও পাঞ্জাবির হরেক সম্ভার। 
তুলনায় আকারে সবচেয়ে ছোট ওই পুরুষোত্তম রায় স্ট্রিটের পাইকারি দোকানটি। এখন জগবন্ধুর পৌত্ররা ব্যস্ত চারটি দোকানে। বিদ্যাসাগর কলেজের অর্থনীতির স্নাতক জগবন্ধুর পৌত্রদের মধ্যে সৌম্যজিৎ দেখছেন ট্রায়াঙ্গুলার পার্কের আউটলেট। তাঁরই অনুজ অরিজিৎ বসছেন বড়বাজারের রিটেল আউটলেটে। সৌম্যজিতের মেজকাকা দুর্গাচরণের দুই ছেলে, দেবরাজ ও ইন্দ্রনীল দেখেন মহাত্মা গান্ধী রোডের দোকান। সেজকাকা মধুসূদনের ছেলে বিশ্বরূপ বসছেন বড়বাজারের হোলসেল দোকানে। ছোটকাকা কৃষ্ণচন্দ্রের ছেলে শিবব্রত বসছেন বড়বাজারে। এঁদের মধ্যে বিশ্বরূপ ও ইন্দ্রনীল দুজনেই এমবিএ। হ্যাঁ, বাঙালির শাড়ির ব্যবসা এখন ম্যানেজমেন্ট বিদ্যা ও অর্থনীতিতে ওয়াকিবহাল যুবকরাই হাতে তুলে নিচ্ছেন।
তার প্রমাণ হাতেনাতে পেলাম ট্রায়াঙ্গুলার পার্কের দোকানে গিয়ে। দেখি এক সুদর্শন যুবক, জিনসের ওপর লাল টি শার্ট চড়ানো, এগিয়ে এসে বসতে বললেন। ওই যুবকই সৌমিত্র দাস, এই আউটলেটের ম্যানেজার। ছিলেন পৃথিবীখ্যাত এক বিদেশি ব্যাঙ্কের অফিসার। সেই চাকরি ছেড়ে বেছে নিয়েছেন শাড়ির দোকানে মহিলাদের আপ্যায়নের কাজ। কী করে এটা সম্ভব হল?‌ প্রশ্নের জবাবে সৌম্যজিতের সংক্ষিপ্ত উত্তর:‌ ‘‌ভ্যালু ফর মানি।’‌
পাঁচ ফুট ১০ কি ১১ ইঞ্চি লম্বা, তলতা বাঁশের মত ছিপছিপে সৌম্যজিৎ সাধারণ একটা ট্রাউজার্সের ওপর স্পটেড ফুল স্লিভ শার্টে অসম্ভব স্মার্ট। দোকানের দোতলায় যে ঘরে বসেন সেখানে ঠাকুর্দা জগবন্ধুর একটি ফোটো ওর চেয়ারের পেছনে টাঙানো। সৌম্যজিতের গাল জুড়ে সলট পেপার দাড়ি। মাথায় চুলও তাই। বললেন, প্রিয়গোপাল বিষয়ীর মেমারি আর গ্রাম নেই, রীতিমতো শহর। তবে ওই শহরের বিষয়ীপাড়ায় প্রিয়গোপালের বাড়িটি যত্ন করে রাখা হয়েছে। দুর্গামণ্ডপে পুজোয় ওরা সবাই যান একসঙ্গে। পাঁচ পুরুষে সেই ফ্যামিলি আজ তিন তিনটে ফুটবল টিম। কলকাতায় ওরা 
আজও থাকেন একসঙ্গে তিনতলায়। শুধু ছোট কাকা কৃষ্ণচন্দ্র থাকেন আহিরিটোলার 
পুরনো বাসায়।
সামনে পুজো। কাপড়ের সন্ধানে প্রিয়গোপালের দৌহিত্র দৌহিত্ররা এখনই ছড়িয়ে পড়বেন গোটা দেশে। সৌম্যজিৎ বললেন বছরে ১০/‌১২ বার এরকম যেতে হয়। ওর একমাত্র ছেলে সোহম, প্রিয়গোপালের ষষ্ঠ প্রজন্ম এখনও স্কুলে। ক্লাস ইলেভেনে। একদিন ওকেই হয়ত এভাবে বেরোতে হবে। সৌম্যজিতবাবুর পরের ভাই অরিজিৎ–‌এর দুই ছেলে আয়ুশ ও তৃষাণকে হয়ত ভবিষ্যতে এই ব্যবসার প্রয়োজনে গোটা দেশ চষে বেড়াতে হবে। ষষ্ঠ প্রজন্মে একটিই মেয়ে এখনও পর্যন্ত। দেবরাজের কন্যা রাজশ্রী। বয়স বছর বারো। প্রিয়গোপালের উত্তরাধিকারী প্রজন্মের পর প্রজন্ম শুধু পুত্র সন্তানরা। তারকদাসীর উত্তরাধিকার বজায় রাখার দায়িত্ব কী ব্যবসা চালানোর মাধ্যমে রাজশ্রী একদিন নেবে?‌‌

 

রাসবিহারীতে প্রিয়গোপাল বিষয়ীর বিপণি। ছবি: কাজি মিঠুন

জনপ্রিয়

Back To Top