তাপস গঙ্গোপাধ্যায়: ‘‌এক ভরি (‌১১.‌৬৬৪ গ্রাম)‌ সোনার দাম আজ শনিবার ৩১.‌৮.‌২০১৯ তারিখে কলকাতায় ৪৫৩০০ টাকা।’‌ থেমে থেমে কথাগুলি বলছিলেন কৌশিক সেন। বাঘাযতীন কলোনির বাজার ছাড়িয়ে যাদবপুরের দিকে যাওয়ার পথে মোড়ের মাথা থেকে শ’‌খানেক মিটার দূরে কৌশিকের সোনার দোকান ‘‌সেনকো জুয়েলরি (‌জুয়েলারি নয়)’‌‌। বাবা ধ্রুব সেন ও তাঁর দুই ভাই সমীরণ ও রামকৃষ্ণ ছিলেন বালিগঞ্জে আলেয়া সিনেমার গায়ে ১ নং ফার্ন রোডে সেনকোর মালিক। ধ্রুব ও সমীরণ আজ নেই। ধ্রুবর স্ত্রী রানু একমাত্র ছেলে কৌশিক ও মেয়েকে যে কী কষ্ট করে মানুষ করেছেন তার সাক্ষী আমি। লম্বা, ফর্সা, কাটা কাটা পরিষ্কার উচ্চারণে কৌশিক বললেন, ‘‌আজকের দামে দু ভরি সোনার সঙ্গে মজুরি ধরলেই তো লাখ টাকা। মাসে একলাখি খদ্দের পাওয়া ভাগ্যের কথা। কলকাতায় যে হাজার দশেক দোকান আছে তার মধ্যে শতকরা ৯৮ ভাগ মানে আমাদের মতো দোকানদারদের কারবার ৫, ১০, ১৫, ২০ বড় জোর ৩০ হাজার টাকার খদ্দেরদের নিয়ে। কেউ হয়তো বলল ২ গ্রামের একটা আংটি বানিয়ে দিন, বা ৬ গ্রাম সোনা দিয়ে দুটি কানের ফুল। দোকানগুলি সেই ১০টায় খোলে, বন্ধ করতে করতে ৯টা। সারাদিনে বড় জোর ১০ বা ২০ হাজার টাকার ব্যবসা করি।’‌ কোনও রাখঢাক নেই নিজের ব্যবসার ফোঁপরা দশা খোলসা করে বলার।
অথচ কৌশিকের দোকান যেদিন উদ্বোধন হয় সেদিন এক গ্রাম সোনার দাম ছিল ৬০৫ টাকা, এক ভরির ৭১৬০ টাকা। গত ১৫ বছরে সোনার দাম বেড়েছে প্রায় সাড়ে ছগুণ। অথচ পাল্লা দিয়ে খদ্দেরদের বাজেট বাড়েনি। বাড়েনি তার সাদা কারণ আয় তো বাড়েনি, শুধু তাই নয় জিনিসের দাম যেভাবে বেড়েছে তাতে যদি আয় সামান্য কিছু বেড়েও থাকে তা ধর্তব্যের মধ্যেই নয়। কিন্তু সোনার দোকানের গয়নার অর্ডার কমে যাওয়ার খেসারত দিচ্ছেন প্রাথমিকভাবে স্বাধীন গয়নার কারিগররা। ‘‌শুধু কলকাতায় দশ হাজার দোকানের সঙ্গে জড়িত এই কারিগরদের সংখ্যা বছর দশেক আগে ছিল দু লাখের ওপর। কমতে কমতে তাই এখন নেমে এসেছে লাখখানেকে,‌ বললেন কালাচাঁদ কর্মকার। বালিগঞ্জ স্টেশনের কাছে বাটার দোকানের উল্টোদিকে একটা চারতলা বাড়ির একতলায় বড় রাস্তামুখী পর পর কারিগরদের ঘুপচি ঘুপচি ঘরের কারখানা। কালাচাঁদবাবু মিনের কারিগর। তারপর পাশের ঘুপচিতে উত্তম রায়। তারপর বাপ্পা মজুমদার। পর পর। তবে যে রেটে অর্ডার কমছে আর কতদিন তাঁরা এ ব্যবসা টানতে পারবেন তা নিয়ে রীতিমতো সন্দেহ আছে বাপ্পা মজুমদারের।
‘‌এর ওপর এবার কেন্দ্রীয় বাজেটে সোনার ওপর ইমপোস্ট ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে করে দিল ১২½‌ শতাংশ।’‌ প্রচণ্ড আক্ষেপ গড়িয়াহাটের এক নামী দোকানির। নাম বলা চলবে না এ শর্তে বললেন, ‘‌ক’‌জন বাঙালি খদ্দের আছে যে সোনার এ দাম সত্ত্বেও গয়না বানাবেন?‌’‌
আগে কলকাতায় মানিকতলা ও গড়িয়াহাট যেমন ছিল মাছের বাজার, বই বললে আজও সবাই বোঝেন কলেজ স্ট্রিট, ফল বললে কলেজ স্ট্রিটের ফলপট্টি, তেমনি গয়না মানেই ছিল বৌবাজার। পরে একসঙ্গে যোগ হল শ্যামবাজার–‌হাতিবাগান। আশির দশকে বামফ্রন্ট যখন জাঁকিয়ে রাজত্ব করছে গড়গড় করে ত্রিশের দশকের এক বিখ্যাত দোকানির নাতি বললেন, ‘‌বলা নেই, কওয়া নেই হঠাৎ রাসবিহারী অ্যাভিনিউ, গড়িয়াহাটের শাড়ির দোকান, বই–‌খাতাপত্তরের দোকান, স্টেশনারি দোকানঘরগুলি বিক্রি হয়ে গেল চারগুণ দামে। দয়া করে আমার নাম লিখবেন না, যাঁরা কিনলেন এঁদের বারো আনাই জড়িত ছিলেন বাংলাদেশের সঙ্গে সোনার চোরাচালানে। আজ গড়িয়াহাট ও রাসবিহারীর বারো আনা জুড়েই সেই সব দোকানদারদের রবরবা। আর এদের খদ্দেরদের একটা বড় অংশ ঘুষখোর সরকারি অফিসাররা। এদের টাকা জমা রাখার পথই হল সোনার গয়না বানিয়ে রাখা।’‌
এখন কলকাতার প্রায় সব এলাকাতেই সোনার দোকান। গড়িয়া, বাঘাযতীন থেকে বেহালা, নিউ টাউন, সল্টলেক, রাজারহাট সর্বত্র। আর বাংলার প্রতিটি জেলা সদর বা মহকুমা শহরেও সোনার দোকান জাঁকিয়ে বসেছে। শিলিগুড়ি আজ গয়নার দোকানের একটা বিরাট কেন্দ্র। তা সে পি সি চন্দ্র, সেনকো গোল্ড, বি সি সেন, অঞ্জলি এই মহীরুহদের পাশে চুনোপুঁটিরাও আজও টিকে আছে। তবে আর বোধহয় সম্ভব হবে না। রাজ্য জুড়ে পঞ্চাশ হাজার সোনার দোকানের ওপর নির্ভরশীল পাঁচ লাখ কারিগরদের একটা বড় অংশ ইতিমধ্যে হয় বসে গেছেন নয় অন্য পেশায় যেতে বাধ্য হয়েছেন। তাও দাম এখন ভরি পিছু ৪৫ হাজার, যখন, আধ লাখ বা এক লাখ হবে?‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top