কল্যাণ ব্যানার্জি: তুচ্ছ কারণে শিল্প অথবা সাধারণ ধর্মঘট পালন করা যে রাজ্যে এক সময় প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেই বাংলায় বন্‌ধের রাজনীতি কার্যত ইতিহাস। যে কোনও দলের রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য শিল্পের চাকা যে এক মুহূর্তের জন্যও বন্ধ রাখা চলবে না, তা এই রাজ্যে পালাবদলের পর মুখ্যমন্ত্রীর কড়া মনোভাবের ফলে স্পষ্ট। বন্‌ধ যে কোনও দলের কর্মসূচির অঙ্গ হতে পারে কিনা, গণতন্ত্রে তা নিয়ে আলোচনা চলতেই পারে। তবে, এই দেশে এমন কোনও বড় সমস্যার সমাধান হয়েছে একটি বন্‌ধ পালনেই, তা হয়তো আমার জানা নেই। বন্‌ধ মানেই এই রাজ্যে এক সময় ছিল অঘোষিত এক ছুটির দিন। যে দিনটিতে কাজের ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও খেটে খাওয়া দিনমজুররা খালি হাতেই বাড়ি ফিরত। মুখ্যমন্ত্রীর মতে, যে কোনও রাজনৈতিক, সামাজিক অথবা শিল্পকেন্দ্রিক সমস্যা মেটানোর ক্ষেত্রে আলোচনাই হল সমাধানের একমাত্র পথ। শ্রমিক এবং শিল্পের মাঝে সরকার অযথা নাক গলাতে চায় না ঠিকই, তবে শ্রমিক স্বার্থে প্রয়োজনে ত্রিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সমাধান খুঁজে আনতে পিছপা হবে না রাজ্যের শ্রম দপ্তর। বাংলা শিল্পে পিছিয়ে, এমন ধারণা যাঁদের, তাঁদের হয়তো জানা নেই যে, পরিসংখ্যান অনুযায়ী গুজরাট এবং মহারাষ্ট্রকে পিছনে ফেলে গোটা দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষুদ্র, ছোট এবং মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান কিন্তু এই রাজ্যেই। এই রাজ্যে এখন এমএসএমই ইউনিটের সংখ্যা প্রায় ৫৩ লাখ। শুধু ধান, সবজি বা মধু উৎপাদনই নয়, পাট এবং চা–শিল্পেও গোটা দেশের মধ্যে নজরকাড়া প্রদর্শন বাংলার। কৃষিজাত দ্রব্য এবং খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণে বাংলা যে এক অতি সম্ভাবনাময় রাজ্য, সে বিষয়ে জোরগলায় জানালেন ভারপ্রাপ্ত খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণ এবং উদ্যানপালন বিষয়ক মন্ত্রী আবদুর রেজ্জাক মোল্লা। আম, আনারস, কলা উৎপাদন ক্রমশই বেড়ে চলেছে আমাদের রাজ্যে, যা সম্ভব হয়েছে চাষি এবং শিল্পের মধ্যে সুস্থ বোঝাপড়ার মাধ্যমে। পানাগড়ে বেসরকারি উদ্যোগে চালু–‌হওয়া সার কারখানা হোক, বা বেলঘরিয়ার অ্যালাইড সেরামিক কারখানা— উৎপাদনবৃদ্ধি করতে হলে তাদের প্রয়োজন প্রাকৃতিক গ্যাসের। যা এই রাজ্যে এতদিন ছিলই না। তবে বাংলার শিল্পমন্ত্রী অমিত মিত্রর তৎপরতায় এই রাজ্যে বেসরকারি উদ্যোগে আপাতত দুটি বড় শিল্প সংস্থা এলএনজি এবং সিএনজি গ্যাস নিয়ে আসার পথে অগ্রসর। ইতিমধ্যেই গ্রেট ইস্টার্ন এনার্জির ওয়াই কে মোদি বাংলায় ১৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করছেন। অন্যদিকে, এইচ এনার্জি কাঁথি থেকে ১১৫ কিলোমিটার দূরে গভীর সমু্দ্রে এফএসআরইউ প্রকল্প তৈরি করছে। এজন্য প্রায় ৭১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন বসিয়ে তারা বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী দত্তফুলিয়া থেকে কাঁথি হয়ে ওডিশার পারাদীপ অবধি গ্যাস নিয়ে যাবে। জিন্দাল সিমেন্ট তাদের উৎপাদনক্ষমতা এই রাজ্যে দ্বিগুণ করছে, অন্যদিকে, আইটিসি প্রসাধনী সামগ্রী তৈরির জন্য ১৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বাংলার কুলপি বন্দর প্রকল্পে ৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের সম্মতি জানিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির ডিপি ওয়ার্ল্ড। কোকাকোলা শিলিগুড়িতে ৩০০ কোটি। আর মুকেশ আম্বানির নেতৃত্বাধীন রিলায়েন্স গোষ্ঠী এই রাজ্যে ৪জি নেটওয়ার্কের বিস্তারের জন্য আপাতত ১০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে। সব মিলিয়ে স্মার্ট সিটিতে আয়োজিত হওয়া এই বাণিজ্য সম্মেলন থেকে বাংলার প্রাপ্তিও বেশ ‘‌স্মার্ট’‌। ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top