ধ্রুবজ্যোতি নন্দী: এয়ার ইন্ডিয়া হাতে নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে আবেদন করার সময়সীমা ৩১ মে পর্যন্ত বাড়িয়েও কোনও লাভ হল না। কেউই আগ্রহ দেখাল না। বরং সেই সময়সীমা শেষ হতেই মূলধন সরবরাহ আবার চালু করার জন্য রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থাটির পক্ষ থেকে সরকারের কাছে আবেদন করা হল। ফলে এয়ার ইন্ডিয়ার ৭৬% শেয়ার বিক্রি করে অর্থাগমের আশায়–‌থাকা সরকার পড়ল দু’‌মুখো চাপের মুখে। কীভাবে সেই চাপ সামলানো হবে, সে–‌বিষয়ে এখনও পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে কোনও ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। তবে এয়ার ইন্ডিয়ার সর্বোচ্চ পর্যায়ের এক কর্তা নতুন করে মূলধন সরবরাহ চালু করার জন্য কেন্দ্রকে চিঠি দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন।
আবার নতুন মূলধন কেন?
নতুন করে মূলধন জুগিয়ে এয়ার ইন্ডিয়াকে চাঙ্গা করা আসলে ইউপিএ সরকারের ২০১২ সালের পরিকল্পনা। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে এয়ার ইন্ডিয়ায় ৩০,২৩১ কোটি টাকার মূলধন সরবরাহ করার পরিকল্পনা অনুমোদিত হয়েছিল। তার মধ্যে ২৬,০০০ কোটি টাকা ইতিমধ্যেই এয়ার ইন্ডিয়াকে দেওয়া হয়েছে। মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১৪ সাল থেকে মূলধন জোগানোর পরিকল্পনায় কাটছঁাট শুরু হয়। ফলে বিলম্বিত হয় কর্মীদের বেতন। গত বছর সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাঙ্কের কাছ থেকে ৬২৫০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে এয়ার ইন্ডিয়া আপৎকালীন ভিত্তিতে কার্যকরী মূলধনের সঙ্কট মেটায়। চলতি বছরের মার্চে সংস্থাটির ঋণের বোঝা ছিল ৫০,০০০ কোটি টাকারও বেশি। তা সত্ত্বেও এয়ার ইন্ডিয়া ২০১৮–‌১৯ সালে সরকারি সাহায্য পেয়েছে মাত্র ৬৫০ কোটি টাকা। সরকারের আশা ছিল, এয়ার ইন্ডিয়া কিনতে আগ্রহীর অভাব হবে না এবং চলতি বছরেই সম্ভব হবে এয়ার ইন্ডিয়ার বিলগ্নীকরণ। সরকার বিলগ্নীকরণের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার পর এয়ার ইন্ডিয়া কিনতে প্রাথমিক ভাবে আগ্রহও দেখিয়েছিল টাটা গোষ্ঠী, ইন্ডিগো, জেট এয়ারলাইন্স এবং স্পাইসজেট। প্রত্যেকটি সংস্থাই আলাদা আলাদা ভাবে আলোচনায় বসেছিল সরকারের সঙ্গে। এ ছাড়াও ছিল জিএমআর, জিভিকে, রিলায়েন্স, ডা ইন্টারন্যাশনাল, ফ্লুগহাফেন জুরিখের মতো বেশ কিছু দেশি–‌বিদেশি সংস্থা। কিন্তু সকলেই শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে যায়। ১৪ মে প্রাথমিক সময়সীমা শেষ হওয়ার পর দেখা গেল, কী বিমান ক্ষেত্রের, কী তার বাইরের, কোনও সংস্থাই এয়ার ইন্ডিয়া কিনতে আগ্রহ দেখায়নি। সময়সীমা ৩১ মে পর্যন্ত বাড়ানো হল। তাতেও অবশ্য কোনও লাভ হল না। পড়েই রইল লগ্নভ্রষ্ট এয়ার ইন্ডিয়া।
বিলগ্নীকরণ আটকাল কোথায়?
৭৬ শতাংশের গঁাটে। নীতি আয়োগের পরামর্শ ছিল, সরকার এয়ার ইন্ডিয়া থেকে হাত ধুয়ে বেরিয়ে আসুক। হস্তান্তর করা হোক এয়ার ইন্ডিয়ার সমস্ত শেয়ার। অনুমোদনের জন্য সেই পরামর্শ যখন কেন্দ্রীয় মন্ত্রিগোষ্ঠীর কাছে এল, বাদ সাধলেন তঁারা। তঁারা দেখছিলেন, এয়ার ইন্ডিয়া কিনতে দেশে–‌বিদেশে বেশ কিছু সংস্থা আগ্রহ দেখাচ্ছে। সেই আগ্রহ দেখে তঁারা ধরেই নিলেন, এয়ার ইন্ডিয়া বিক্রি হবে যে–‌কোনও শর্তে। তাই তঁারা বললেন, এক, এয়ার ইন্ডিয়া কিনতে আগ্রহী মূল বিনিয়োগকারীকে হতে হবে ভারতীয়। আর দুই, ১০০% নয়, বিলগ্নীকরণ হোক এয়ার ইন্ডিয়ার ৭৬% শেয়ারের। বাকি ২৪% শেয়ার সরকারের হাতে থাকলে ভবিষ্যতেও এয়ার ইন্ডিয়া পরিচালনায় সরকারের একটা ভূমিকা থাকবে।
হয় সরকারি, নয় বেসরকারি
ওই সরকারি ভূমিকা থাকার আশঙ্কাটাই আখেরে সমস্ত আগ্রহীকে দূর করে দিল। বিমান পরিবহণ শিল্পের এক বড় কর্তা আজ মন্তব্য করেছেন, সরকার হাতে ১% শেয়ার রাখলেও কেউ এয়ার ইন্ডিয়া কিনতে আগ্রহী হবে না। কারণ, বিমান পরিবহণ শিল্পে প্রতিযোগিতা অত্যন্ত তীব্র। এয়ার ইন্ডিয়ার মতো সংস্থার পক্ষে একটি ফোনে কয়েকশো কোটি টাকার বিমানের অর্ডার দেওয়া সম্ভব। সেখানে এই রকম সমস্ত সিদ্ধান্ত যদি সরকারি অনুমোদন–‌সাপেক্ষ হয়, তা হলে ব্যবসা করাই সম্ভব নয়। সুতরাং হয় সরকার চালাক এয়ার ইন্ডিয়া, নয় পুরোপুরি ছেড়ে দিক বেসরকারি সংস্থার হাতে। এখানে মাঝামাঝি কোনও পথ থাকতে পারে না।
সামনে এখন পথ কী?
অভিজ্ঞরা বলছেন, সরকারের সামনে এখন দুটি পথ খোলা। প্রথম পথ, বিলগ্নীকরণের কথা ভুলে গিয়ে নতুন করে অর্থ সরবরাহ করে এয়ার ইন্ডিয়া চালিয়ে যাওয়া। কিন্তু এয়ার ইন্ডিয়া বিলগ্নীকরণের সেই ব্যর্থতা মোদি সরকারের ভাবমূর্তির পক্ষে হানিকারক হবেই। সঙ্গে জুটবে বিস্তর রাজনৈতিক গ্লানি। দ্বিতীয় পথ, ৭৬% নয়, এয়ার ইন্ডিয়ার ১০০% শেয়ারই বিক্রি করে দেওয়া। কিন্তু হাতে সময় তো আর ১১ মাস!‌ তার মধ্যে বিষয়টি নিষ্পত্তি করার তৎপরতা কি মোদি সরকার দেখাতে পারবে? কাজটা সহজ নয়। না পারলে সেখানেও মোদি সরকারের জন্য অপেক্ষা করছে বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণে বিপুল ব্যর্থতার গ্লানি।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top