তাপস গঙ্গোপাধ্যায়: কলেজ স্ট্রিট মার্কেট যেখানে শেষ, যেখানে পঞ্চাশের দশকে গ্রেস সিনেমা ছিল, ঠিক তার গা–‌লাগোয়া দোকান। ভেতরে সাবেকি আমলের নিচু তক্তপোশের ওপর সাদা চাদরে মোড়া গদি, যেখানে কাপড় ছড়িয়ে ক্রেতা বেনারসি, পৈঠনী, কাতান থেকে তঁাত ও হ্যান্ডলুমের তাবৎ শাড়ি। আদি অক্ষয় অ্যান্ড কোং–‌এর তরুণ মালিক ‌সম্রাট বসাক ও তঁার স্ত্রী দেবারতি ব্যস্ত ছিলেন শাড়ি নিয়ে। সম্রাট বললেন, ‘‌এটা আগে ছিল রাজ সুইট্‌স।’‌ অ্যাসেম্বলি অফ গড চার্চ স্কুল, পরে শান্তিনিকেতন বিশ্বভারতীর প্রথম ব্যাচের বিবিএ এবং এমবিএ। পাতলা, ছিপছিপে দিঘল সম্রাটের ডান হাতের তর্জনী, মধ্যমা ও অনামিকায় চুনি, পান্না ও মুক্তোর আংটি, বঁা হাতের মণিবন্ধে কালো ডায়ালের ঘড়ি, একটি আঙুলে ফুলের মতো ফুটে আছে পোখরাজ। বললেন, ‘‌আদি অক্ষয় মানে বড়ঠাকুরদা (‌ঠাকুরদার বাবা)‌ ছিলেন তঁাতি, ঠাকুরদা গৌরদাস ও তঁার বড়দা হরিদাসও পিতৃপুরুষের ব্যবসায় জড়িত ছিলেন। আমরা টাঙ্গাইলের লোক। ওখানেই ছিল আদি দোকান। ১৯৬৫ সালে আমার বাবা (‌শ্যামল বসাক)‌ ও তঁার জ্যাঠা হরিদাস কলকাতায় আসেন। তখনও ঠাকুরদা টাঙ্গাইলের দোকান সামলাচ্ছিলেন। কিন্তু ১৯৭১–‌এর মুক্তিযুদ্ধের বছরে হাল ছেড়ে দিলেন। চলে আসেন কলকাতায়।’‌
শ্যামলবাবু ৬ বছর আগে যে কলকাতায় এসেছিলেন, সেই ৬টি বছরে বড়বাজারে মল্লিক স্ট্রিটের আদি অক্ষয় অ্যান্ড কোং–‌এ বসে গোটা কলকাতার বড় বড় শাড়ির দোকান ও আম–‌খদ্দেরকে জানিয়ে দিয়েছেন খঁাটি সিল্ক ও তঁাতের শাড়ি ঠিক দামে পেতে হলে ওই মল্লিক স্ট্রিটেই যেতে হবে। ২০১২ পর্যন্ত ওই দোকানটি ছিল। ওই বছর এক ভয়াবহ আগুনে দোকানটি পুড়ে গেলে বড়বাজারে আর্মেনিয়ান স্ট্রিটে ১০ হাজার বর্গ ফুটের বাড়িতে হেড অফিস ও হোলসেল আউটলেট খোলেন শ্যামলবাবু। আর ওই বড়বাজারেই, ১৭০ মহাত্মা গান্ধী রোডে রয়েছে রিটেল আউটলেট, যেমন কলেজ স্ট্রিট মার্কেটের কাছে, অবলুপ্ত গ্রেস সিনেমা হলের লাগোয়া পুরনো সেই মিষ্টির দোকানে রয়েছে আদি অক্ষয়ের নবতম খুচরো বেচার কেন্দ্র।
স্বামীর কোনও কথা মনে পড়তে দেরি হলে স্ত্রী মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন। পুরোপুরি লেডি–‌ইন–‌হোয়াইট। সদ্য কর্তা ও গিন্নি নিউ জার্সিতে রথ দেখা ও কলা বেচা দুটি কর্মই করে এসেছেন। ফি–‌বছর উত্তর আমেরিকা বঙ্গ সংস্কৃতি সম্মেলন থেকে ডাক আসে আদি অক্ষয়ের। কারণ, মার্কিনি বঙ্গললনাদের অক্ষয়–‌প্রীতির কোনও ক্ষয় নেই। প্রথম বার যান ২০১৬–‌তে। সে–‌বার নিউ ইয়র্কে তিন দিন ধরে ওই সম্মেলনে ৪০০ শাড়ির গঁাটরিগুলি যে কখন ফঁাকা হয়ে গেল, তা ওঁরা টেরও পাননি। পরের বার পশ্চিম আমেরিকার সান ফ্রান্সিসকোয় ওই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। এবার ছিল নিউ জার্সিতে, মার্কিন দেশের এক টুকরো বাঙালিস্থানে। ৪০০–‌র মধ্যে খান–‌তিরিশেক শাড়ি ফেরত এসেছে।
এই শাড়ি প্রসঙ্গেই দেবারতি বললেন, ফ্যাশন বদলে যাচ্ছে। আগে ভারী ফেব্রিকের ওপর হালকা রংই ছিল সিল্ক শাড়ির ফ্যাশন। আজ হালকা ফেব্রিকের ওপর উজ্জ্বল রঙের চাহিদা বেশি। এখন কমলার সঙ্গে লাল, হলুদ, অরেঞ্জ–‌পিঙ্ক খুব চলছে।
টাঙ্গাইলের ঘুতু বসাকের ছেলে অক্ষয় বাপের মতো নিজেও যেমন তঁাতি ছিলেন, তেমনি তঁার দুই ছেলে হরিদাস ও গৌরদাসও ছিলেন তঁাতি। প্রথম ব্যতিক্রম সম্রাটের বাবা শ্যামলবাবু। তিনি জাতে তঁাতি হলেও, তঁাতের শাড়ির এক নম্বর সেলার হলেও, নিজে তঁাত চালাননি বা চালান না। উল্টে বছরভর বাপ ও ছেলে— শ্যামলবাবু ও সম্রাট পশ্চিমবঙ্গ ও দেশের নামী সব রেশম ও তঁাত কেন্দ্র ঘুরে বৃহত্তর বঙ্গ–‌সমাজের চাহিদা মেটানোর এক বিচিত্র সংগ্রামে ব্যস্ত।
কোথায় যান ওঁরা?‌ সম্রাটের জবাব, ‘‌আমাদের স্পেশ্যালাইজেশন পিওর সিল্ক যেমন বেনারসি, কাঞ্জিভরম, কাতান, পৈঠনী ইত্যাদি। এদের সন্ধানে যাই ইউপি–‌‌র বেনারসে, তামিলনাড়ুর আইলি, ধর্মাবরম, কাঞ্চিপুরম এবং অন্ধ্রের পচমপল্লিতে। রাজ্যের ভেতর আমাদের সংগ্রহ কেন্দ্র ফুলিয়া, ধাত্রীগ্রাম, নবদ্বীপের (‌হুগলির নয়)‌ শ্রীরামপুর, সমুদ্রগড়, শান্তিপুর ইত্যাদি তঁাতি–‌প্রধান এলাকাগুলি। একবার নয়, বছরভর। আগে বাবা গিয়ে তঁাতিদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে আসেন। তার পর আমি যাই। পালা করে দু’‌জনেই।’‌ লক্ষ্য করলাম, হালকা পাউডারের প্রলেপের মতো এক দিনের বাসি দাড়ি দু’‌গালে। হাসেন ঠেঁাট টিপে। গলায় সোনার চেন। ‘‌কারণ’‌, খেই ধরলেন আবার, ‘‌আমাদের খদ্দের শুধু খুচরো ক্রেতারাই নন, কলকাতার অত্যন্ত নাম–‌করা সব শাড়ির দোকানও। এ ছাড়া আছেন প্রবাসে অগণিত বৌদি, দিদি, মা ও বোনেরা, যঁারা আমাদের ভালবাসেন।’‌
ঘুতু বসাকের ছেলে অক্ষয় বসাক, তঁার ছেলে হরিদাস ও গৌরদাস, গৌরদাসের ছেলে শ্যামল, তঁার ছেলে সম্রাট। এর পর?‌ দেবারতি বললেন, ‘‌শ্রেয়ার্থ, ওর বয়স এখন আট।’‌ শব্দটির মানে জানতাম না। বললেন, ‘‌ব্রহ্মার এক নাম।’‌ ওর এক বান্ধবীর দেওয়া। ঘুতু থেকে অক্ষয় হয়ে গৌরদাস, বংশানুক্রমিক তঁাতি। আগে থেকে বলে গেলে আড়াইলাখি মহারাষ্ট্রের পৈঠনী শাড়িও যেমন পাবেন, তেমনি পাবেন সোনার জরির কাজ–‌করা পৌনে দু’‌লাখের আসল বেনারসি, একদা যা পরে বাংলার ঠাকুমা–‌দিদিমাদের বিয়ে হত। মিলবে কোরা সিল্কের ওপর তঁাতে তৈরি শাড়ি, এক–‌একটা ৫০ থেকে ৬০ হাজারে। ‘‌ওই একটা শাড়ি বানাতে কারিগরের সময় লাগে মিনিমাম ৬ মাস’‌, দেবারতি হাসলেন। সম্রাট যোগ করলেন, ‘‌খঁাটি‌ কাঞ্জিভরম শুরু হয় বিশ হাজার থেকে। আমাদের কাছে পৌনে একলাখি কাঞ্জিভরম আছে।’‌ এ–‌ই যাদের স্টক, তাদের কাছে গৃহবাসী ও পরবাসী বাঙালি তো বার বার যাবেই। ‘‌পুজোর সময় ও বিয়ের মরশুমে এত ভিড় হয় যে আমরাই দোকানে দঁাড়ানোর জায়গা পাই না’,‌ দেবারতি আর–‌একটা তথ্য দিলেন, ‘‌স্টাফেদের জন্য তখন বাড়ি থেকে ভেজ লাঞ্চ তৈরি করে আনি, ওঁরা বাইরে যাওয়ার ফুরসত পান না।’‌
বড়বাজার ও এমজি রোড ধরে ‌তিনটি দোকানে ১২০ জন স্টাফ ফেলে–‌আসা টাঙ্গাইলের স্মৃতিকে অক্ষয় করে রাখার মহাব্রতে সদা–‌ব্যস্ত। তঁাদের তাবৎ এনার্জির উৎস শ্যামল ও সম্রাট বসাকের অবিরাম পরিশ্রম। ভবিষ্যতের জন্য তৈরি হচ্ছে শ্রেয়ার্থ।

 

 

আদি অক্ষয় অ্যান্ড কোং–‌এর তরুণ কর্ণধার ‌সম্রাট বসাক। ছবি: কাজি মিঠুন

জনপ্রিয়

Back To Top