বিশিষ্ট সাহিত্যিক নবনীতা দেবসেন প্রয়াত। নিজের বাড়ি ‘‌ভালবাসা’‌তেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বৃহস্পতিবার, সন্ধেবেলা ৭–‌৩৫–‌এ। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তা নিয়েও অন্যান্য কাজকর্ম চালিয়েছেন, সভাসমিতিতে গিয়েছেন। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থতা সত্ত্বেও তাঁর কলম কিন্তু থামেনি। গত সপ্তাহেও তাঁর সাপ্তাহিক কলাম ‘‌ভালবাসার বারান্দা’‌ প্রকাশিত হয়েছে যথারীতি। 
এবার যে তিনজন অর্থনীতিবিদ যৌথভাবে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, তার মধ্যে বাঙালি অভিজিৎ বিনায়ক ব্যানার্জি কলকাতায় একদিনের জন্য এসে যে দু‌জন মহিলার সঙ্গে দেখা করেছিলেন, তাঁদের প্রথম তাঁর মা নির্মলা ব্যানার্জি এবং দ্বিতীয় নবনীতা দেবসেন। নবনীতা দেবসেন নোবেলজয়ী প্রথম বাঙালি অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের প্রথম স্ত্রী। সেই সুবাদে লেখক–‌লেখিকা নরেন দেব ও রাধারানি দেবের সন্তান নবনীতা দেব তাঁর উপাধির পাশে লেখেন দেব। নবনীতার দুই কন্যা অন্তরা ও নন্দনা‌র বাবা অমর্ত্য সেন। শ্রাবস্তী নবনীতার পালিতা কন্যা।
বালিগঞ্জে গড়িয়াহাট, গোলপার্ক ও রবীন্দ্র সরোবরের কাছে হিন্দুস্থান পার্ক রোডে জ্যোতি বসুর বাড়ির উল্টোদিকে দেব–দম্পতির ‘‌ভালোবাসা’‌ বাড়িটিতে জন্ম, বড় হওয়া। বিবাহ এবং সাহিত্যিক হিসেবে নবনীতা দেবসেনের প্রতিষ্ঠা এই বাড়িতেই। স্বামী বিবেকানন্দের জন্ম ১২ জানুয়ারি, নবনীতা দেব সেনের ১৩ জানুয়ারি, ১৯৩৮। বয়স ৮২ পেরিয়ে আগামী জানুয়ারিতে হত ৮৩। হাসতে হাসতে সম্প্রতি লিখেছেন, তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত। ক্যান্সার যেন একটা হাস্যকর অসুখ।
অমর্ত্য সেন যেমন ছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র, নবনীতাও ছিলেন ওই কলেজেরই ছাত্রী চার–‌পাঁচ বছরের ব্যবধানে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স। ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি। আবার এই মানুষটিকেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা গিয়েছে অনেক পরিণত বয়সে এসে বুদ্ধদেব বসুর কাছে, সুধীন্দ্র দত্তের কাছে তুলনামূলক ভাষা ও সাহিত্যের পাঠ নিতে, অন্যান্য বহু লেখক ও লেখিকার সঙ্গে। পরে ওই বিষয়ে অধ্যাপনাও করেন।
পড়াতে পড়াতে শুরু হয়ে যায় লেখালিখি। প্রথম ছাপা বই ‘‌প্রথম প্রত্যয়’‌ (‌১৯৫৯)‌। গল্প, উপন্যাস, কবিতা কি না লিখেছেন। আমি অনুপম, বামাবোধিনী, নটী নবনীতা, দ্বিরাগমন, দেশান্তর, শ্রেষ্ঠ কবিতা, সীতা থেকে শুরু, মঁসিয়ে হুলোর হলিডে, ট্রাকবাহনে ম্যাকমোহনে (‌হিচ হাইক করে পূর্ব ভারতে বেড়ানো), হে পূর্ণ তব চরণের কাছে, অ্যালবাট্রস, নবনীতার নোটবই, ভালবাসা কারে কয়, করুণা তোমার কোন পথ দিয়ে, ভালোবাসার বারান্দা—  প্রায় একশোর কাছে তাঁর বইয়ের সংখ্যা। প্রায়ই দুঃখ করে নিজের কলমেই লেখেন, তাঁর ঘনিষ্ঠ লেখক সুনীল, শ্যামল, শক্তি, সমরেন্দ্র সব এক এক করে চলে গেল, তিনিই শুধু পড়ে আছেন!‌ হাসপাতালে বা বাড়ি যেখানেই থাকুন ল্যাপটপ তাঁর সঙ্গী। বলা যেতে পারে, নবনীতা দেবসেনের হাতের কলম। ওই কলমই আজ ১০–‌১২ বছর আমাদের সপ্তাহের পর সপ্তাহ জানিয়েছে, তিনি কেমন আছেন। ক্যান্সারের কথা যেভাবে তাঁর সাম্প্রতিক কলমে লিখেছেন, তাতে বোঝা যায়, মানুষটির মনোবলে এই কালান্তক রোগও চিড় ধরাতে পারেনি। উনি ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সংগঠন ‘‌সই’–এর প্রতিষ্ঠাতা–‌সভাপতি।‌‌‌ ১৯৯৯–‌এর কেন্দ্রীয় সাহিত্য অ্যাকাডেমির পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখিকা নবনীতা পরের বছরই (‌২০০০–‌এ)‌ পান পদ্মশ্রী। গত বছরেও শিশু সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য সাহিত্য অ্যাকাডেমি প্রদত্ত বাল সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনি। অবশেষে থেমে গেল নবনীতার কলম। আগামীকাল তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে। হার্ভার্ডে অমর্ত্য সেনের কাছে নবনীতার বৃহস্পতিবার সন্ধেতেই পৌঁছেছে।   ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top