গৌতম রায়- বাংলাদেশের মানুষ এ–‌পার বাংলার কথাসাহিত্য সম্পর্কে প্রায় সর্বশেষ খবরটি রাখলেও এ–‌পার বাংলার মানুষদের বেশিরভাগই ও–‌পার বাংলার লেখালেখির জগৎ সম্বন্ধে কেমন যেন একটা অজানা–‌অচেনা ভাব থেকেই যায়। শামসুর রাহমান বা চিন্তা–‌চেতনায় তাঁর থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থানরত আল মাহমুদ সম্পর্কে  এ–‌পারের মানুষদের কিছুটা ধারণা থাকলেও একটি বিশেষ পুরস্কার পাওয়ার আগে পর্যন্ত এ–‌পারের বাঙালি প্রায় আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে চিনতই না!‌ ইলিয়াসের প্রায় সমসাময়িক সদ্যপ্রয়াত শওকত আলিকে এখনও এ–‌পারের কজন বাঙালি চেনেন— তা নিয়েও সন্দেহ জাগে।
ঢাকাকেন্দ্রিক লেখকদের দু–‌চারজনকে এপারের মানুষ চিনলেও, বাংলাদেশের মফস্‌সলে যে সমস্ত সাহিত্যিক বাঙালি সংস্কৃতিকে ঋদ্ধ করার জন্য অসামান্য পরিশ্রম করে চলেছেন, তাঁদের সম্পর্কে এ–‌পারের বাঙালি প্রায় কিছুই জানেন না!‌
তেমনই একজন ব্যক্তিত্ব হলেন বৃহত্তর যশোরের কালজয়ী সাহিত্যিক হোসেনউদ্দীন হোসেন। অতি–‌সম্প্রতি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর একটি গ্রন্থ পাঠ্যক্রমের অন্তর্গত হওয়ায়, নবীন প্রজন্মের ছাত্রছাত্রীদের একটি অংশ তাঁকে  জানবার কিছুটা সুযোগ পেলেও, এ–‌পারের আপামর বাঙালি জানেন না, একাধারে কথাসাহিত্য, লোকসাহিত্য ও লোকসংস্কৃতি, বাংলার ভূমিস্তরের সাধারণ মানুষের লড়াইয়ের ইতিবৃত্ত রচনাকারী, অনবদ্য প্রবন্ধকার এই মানুষটিকে।
যশোরের ঝিকরগাছার একটি প্রত্যন্ত  গ্রাম  থেকে, কৃষিকে নিজের জীবিকা হিসেবে বেছে নিয়ে, বাংলার সংস্কৃতিকে, সাহিত্যকে অসামান্য মানে পৌঁছে দেওয়া হোসেনউদ্দীন হোসেনের সাহিত্য সম্পর্কে এ–‌পারের মানুষ প্রায় অন্ধকারেই আছেন। 
হোসেনউদ্দীন তাঁর সাহিত্যচর্চা শুরু করেন মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পরে এমন একটা সময়, যখন গোটা বাংলাদেশ জুড়ে কৃত্রিম দুর্ভিক্ষের যন্ত্রণা এবং রাজনৈতিকভাবে প্রক্ষিপ্ত পারস্পরিক ঘাত–‌প্রতিঘাতে বাঙালির জনজীবন একটা গভীর সঙ্কটের দিকে চলে যাচ্ছে। এই সঙ্কটের সময়কালে দাঁড়িয়ে হোসেনউদ্দিনের ‘‌নষ্ট মানুষ’‌ (’‌৭৪) মনুষ্যত্বের সঙ্কটের এক ভয়ঙ্কর কালক্রমের বর্ণনা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ–‌উত্তর পরিস্থিতি ভারতীয় উপমহাদেশের প্রেক্ষিতে যে আর্থ–‌সামাজিক, রাজনৈতিক উপক্রমের জন্ম দেয়, সেই সময়ের প্রেক্ষিতে এই উপন্যাসের চরিত্র সোভান, কাদের বক্স, বাকের, কিংবা ছুটকি, ছুটকির মায়েদের  কীভাবে কাল থেকে কালোত্তরের পথে এক প্রবাহমান স্রোতে ভাসিয়ে দেয়, তার চালচ্চিত্র হোসেনউদ্দীন হোসেন রচনা করেছেন।
এই চালচ্চিত্রের ভেতর দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরের শাসনকালের অন্তিম পর্যায়ের সময়কালটার  যেন একটা প্রক্ষিপ্ত ছবি আমরা দেখতে পাই। আলোচ্য গ্রন্থে হাবিবুল্লাহ সিরাজীর অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ বৈদগ্ধপূর্ণ আলোচনা আমাদের পিপাসা উসকে দেয়।
‌‘‌ইঁদুর ও মানুষেরা’‌ হোসেনউদ্দীন হোসেনের এক কালজয়ী সৃষ্টি। মুক্তিযুদ্ধকে প্রত্যক্ষ করে যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশকে, বিশেষ করে গ্রামীণ বাংলাকে হৃদয়ে ধারণ করবার এক অনুপম কালক্ষেপ এই উপন্যাস। ঘুঘুদহ ইউনিয়নকে কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করে, বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে সে দেশের জাতীয় ইতিহাসের ক্রান্তিকালকে সাম্প্রতিক সময়ের সঙ্গে যেভাবে একটি মালায় গেঁথেছেন হোসেনউদ্দীন; তা সমাজবিজ্ঞানের যে কোনো ছাত্রের পক্ষে অবশ্যপাঠ্য।
ইঁদুর এবং মানুষের অস্তিত্বের সঙ্কট— এক অনবদ্য মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের ভেতর দিয়ে এখানে প্রক্ষিপ্ত হয়েছে। ইঁদুর কীভাবে মানুষের শৌখিন, সাজানো–‌গোছানো জীবনকে কুটকুট করে কেটে লন্ডভন্ড করে দেয়—   এই  বর্ণনার  ভেতর দিয়ে হোসেনউদ্দীন মানবসমাজের এক গ্রন্থিমোচন করেছেন। আলোচ্য গ্রন্থে উপন্যাসটির একটি মর্মস্পর্শী আলোচনা করেছেন কানাই সেন।
কানাইবাবুর আলোচনার ভেতর দিয়ে শুধু উপন্যাসের রসস্বাদনই নয়, ইতিহাসের এক গ্রন্থিমোচন অনুভূত হয়।
হোসেনউদ্দীন যে আঙ্গিকে যশোর জেলার কিংবদন্তি সংগ্রহ ও সঙ্কলিত করেছেন, তাতে তাঁকে ‘‌হারামণি’‌ সংগ্রাহক মুহাম্মদ মনসুরউদ্দিনের অন্যতম সার্থক উত্তরসূরি বলে অভিহিত করা যায়।
হোসেনউদ্দীন হোসেন সাহিত্য:‌ রূপ রূপান্তর • গ্রন্থনা ও সম্পাদনা সুমন শিকদার • বেগবতী প্রকাশনী • ৫০০ টাকা‌

জনপ্রিয়

Back To Top