সম্রাট মুখোপাধ্যায়: সিনেমা কি গল্প বলে?‌ নাকি গল্প বলাকে ভাঙে? সে কি আসলে একটি বই?‌ না কি বইকে ধ্বংস করাই তার কাজ? এ সব নিয়ে তর্ক বহুদিনের। আগামী আরও বহুদিন এ–তর্ক চলবেও। তবু সেই তর্কের মধ্যেই শান্তনু চক্রবর্তী তাঁর ‘‌এক ছিলিম ফিলিম’‌–‌এ একটা পথ খুঁজেছেন। যে, সিনেমা হয়তো ‘‌বই’‌ নয়। শুধু ল্যাজা–‌মুড়ো মেনে গপ্পো শোনানো তার কাজ নয়। তবে একটা আস্ত সিনেমা দেখার পরে— তা সে বাণিজ্যিক হোক বা ‘‌আর্ট হাউস’— যদি কাউকে বলা হয়, যা সে দেখল তাকে জুড়ে একটা বিবরণ শোনাতে, মানে মুখের বলায় বা লেখায় সিনেমাটাকে ‘‌রিক্রিয়েট’‌ করতে, তবে দেখা যাবে একটা গল্পের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে ব্যাপারটা। মানে সিনেমার ‘‌টেক্সট’‌টা।
এক–এক ‘ছিলিম’‌–‌এ ফিল্মের কথা বলতে গিয়ে সেই এক টুকরো গল্পই শুনিয়েছেন শান্তনু তাঁর মাঝারি মাপের শক্ত–‌বাঁধাইয়ের এই বইয়ে। সেখানে টেবিলের পর টেবিল জুড়ে শোয়ানো একের পর এক ‘‌সিনপসিস’‌। যা শরীরে গল্প। কিন্তু নিছক সে–শরীরের অঙ্গ–‌প্রত্যঙ্গে লোভ নেই লেখকের। বরং তিনি সেই শরীরের বিবরণ দিতে দিতে খুঁজে দেখতে চেয়েছেন আত্মাকে। গল্প আছে। এবং গল্পের অতিরিক্ত বাড়তি কিছু বিকিরণ‌ও আছে।
লেখক বা সমালোচক হিসেবে শান্তনুর অভিনবত্ব এটাই যে, তিনি বিশেষ কোনও একটা প্রাক্‌–‌নির্ধারিত তত্ত্বের চশমায় এই বিকিরণ বা আত্মা খোঁজার কাজটা করেননি। বরং অনুসরণ করতে‌ চেয়েছেন সংশ্লিষ্ট সিনেমার পরিচালকের উদ্দেশ্য বা মনস্তত্ত্বকে। সেই ‘‌মেকারস ভিউ’‌ বা নেপথ্য–‌দর্শনটাকে তুলে ধরাই যেন তাঁর দায়িত্ব। সেটা ঠিক না ভুল— তা নিয়ে তাঁর কোনও মন্তব্য নেই। ফলে ৪৯টি লেখার এই ‘‌সিরিজ’‌টি ঠিক ‘‌ফিল্ম পোলেমিক্স’‌ নয়। বরং ‘‌সিনেমাটা জমিয়ে ফের একবার দেখা যাক’‌ ধারণার ‘‌ফিল্ম রিভিউ’‌।
এই অবস্থান–‌বিহীনতার কারণেই এই সঙ্কলনটি বেশ স্থিতিস্থাপক হয়েছে। নানা মহাদেশের ব্যাপ্তি যেমন পেয়েছে, তেমনই পেয়েছে নানা দর্শন, নানা অবস্থানের সিনেমার সহাবস্থানও। তার ভেতর ‘‌চার্লি ক্যাসানোভা’‌র মতো ছদ্মবেশী ‘‌ফ্যাসিস্ট’‌ ফিল্মও যেমন আছে, আবার তেমনি আছে ‘‌দ্য অ্যাক্ট অফ কিলিং’‌–‌এর মতো দায়বদ্ধ রাজনৈতিক ছবিও।
তবে এ বইয়ে নির্বাচিত সিনেমাগুলির মধ্যে অধিকাংশই একটু চড়া মাপের। মশালাধর্মী, সুড়সুড়ি দেওয়া নয়। বরং আঁতকে ওঠার মতো। ফলে বইয়ের পাতায় পড়ে এ সিনেমাগুলো সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়াটাই নিরাপদ। শান্তনু অবশ্য অস্বস্তিকর অংশগুলিকে ছাঁটেননি। বরং সেগুলোর বিবরণ শুনিয়েছেন বিস্তারেই, যাতে পরিচালকের দৃশ্যসংস্থাপনার রাজনীতিটা বোঝা যায়। রক্ষণশীলতার বেড়া ভেঙেছেন শান্তনু।
সমালোচক বা সিনে–‌লেখক শান্তনুর পরিচিতি জনপ্রিয় সিনেমার সমাজতত্ত্ব নিয়ে লেখায়। এ–বইয়ে অন্য আঙিনায় সরে এসেছেন তিনি। তাঁর রসবোধসম্পন্ন ঝরঝরে ভাষাটা অবশ্য সঙ্গ ছাড়েনি।
একেবারে হালফিলের ছবির হাল–‌ট্রেন্ডের কথা জানতে বাংলায় এমন বই বেশ কার্যকর। ফিল্ম ফেস্টিভালে না গিয়েও খানিকটা বিশ্ব–‌সিনেমা–‌ভ্রমণ তো হল!‌ তবে এর কোনও–কোনও সিনেমা যে কিছু বিশেষ আন্দোলন বা ধারা‌–জাত সে–সম্পর্কে কিছু কথা থাকলে আরও ভাল হত। এমন একটি অন্যরকম বই প্রকাশ করার জন্য বাহবা প্রাপ্য প্রকাশক অভিযান পাবলিশার্সেরও।‌‌‌‌‌ 

এক ছিলিম ফিলিম ‌•‌ শান্তনু চক্রবর্তী  অভিযান পাবলিশার্স •‌ ২০০ টাকা

জনপ্রিয়

Back To Top