প্রচেত গুপ্ত

 

আমি সাধারণত কারও প্রয়ানে লিখতে রাজি হই না। তার প্রধান কারণ, এই সব লেখায় বড্ড নিজের কথা লেখা হয়ে যায়। পড়তে পড়তে একটা সময় মনে হয়, যিনি প্রয়াত হলেন, তাঁকে উপলক্ষ করে নিজের ঢাক পেটানো হচ্ছে। উনি আমাকে কতটা চিনতেন, কতবার নাম ঘরে ডাকতেন, আমার লেখার কত প্রশংসা করতেন, লেখার বিষয়ে কত উপদেশ দিতেন— এই সব লিখে ঘুরে ফিরে আসলে ‘‌বড় লেখক আমাকে চিনতেন, তাই আমিও বড়’‌ এই কথাটা প্রতিষ্ঠা করবার হাস্যকর প্রয়াস।
অবশ্যই বর্ষীয়ান বা খুব কাছের বন্ধুরা ব্যতিক্রম। বিভূতিভূষন বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে যখন সবিতেন্দ্রনাথ রায় লেখেন তখন তঁার ব্যক্তি কথা সাহিত্যমূল্যে উজ্জ্বল। অজানা মানুষটাকে চেনেজানা যায়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রয়াত হবার পর শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের লেখাও তাই। বন্ধুকে বন্ধুর লেখা। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্মরণ হয়ে দঁাড়ায় ‘‌নিজের কথা বলা’।‌ তাই আমি এড়িয়ে চলি।
নবনীতা দেবসেনকে নিয়ে লিখতে গিয়েও দ্বিধা হচ্ছে। নিজেকে সরিয়ে রাখতে পারব তো?‌
যেসব লেখক আমাদের ছোটোবেলাকে ঝলমলে করে রেখেছিলেন, নবনীতা দেবসেন তঁাদের একজন। সহজ গল্পকে সহজ ভাবে বলবার এমন সহজ ভঙ্গি খুব কম লেখকেরই ক্ষমতায় কুলোয়। তঁার গল্প পড়ে আমাদের ভিতরে যেন ঝম্‌ঝম করে আনন্দ সঙ্গীত বেজে উঠত। অনেকটা লীলা মজুমদার ঘরানা। আশাপূর্ণাদেবী বা মহাশ্বেতাদেবীর ছোটোদের লেখায় জমজমাট গল্প থাকত। লীলা মজুমদার–‌ নবনীতা দেবসেন ঘরানাতেও গল্প থাকত অবশ্যই, তবে তাঁরা যেন বলবার ভঙ্গিমায় বেশি মন দিতেন। আশাপূর্ণাদেবীরা যেমন আমাদের গল্পের জন্য উন্মুখ মনকে একভাবে পুর্ণ করতেন, লীলা মজুমদার–‌নবনীতা দেবসেনরা করতেন আরেক ভাবে। আনন্দমেলা, সন্দেশ পত্রিকায় প্রায়ই লিখতেন নবনীতা। বাহুল্যবর্জিত, ঝকঝকে স্মার্ট। তঁার করা গল্পের অনুবাদও ছাপা হয়েছে বহু। পড়তে গিয়ে কখনও মনে হত না ভিনদেশী কিছু পড়ছি। মনে হতো, মানুষগুলো পরিচিত খুব, বাড়িঘরগুলো চিনি। এমনটাই ছিল তাঁর কলমের জাদু। বই পড়বার অভ্যেস তৈরি হয় ছোটোবেলা থেকে। তখন ভাল লেখা হাতের কাছে পেতে হয়। ‌নবনীতা দেবসেনরা সেই দায়িত্ব পালন করেছেন। গল্পপাঠের নেশা ধরিয়েছেন। যারা আজ বড় হয়ে বই পড়তে ভালোবাসে তাদের অবশ্যই এই মানুষগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।
এরপর ভ্রমণ। বেড়ানোর গল্প বলে নবনীতা দেবসেন শিক্ষিত বাঙালিকে একেবারে মাতিয়ে দিয়েছিলেন। ‘‌শিক্ষিত বাঙালি’‌ কথা আমি ইচ্ছে করেই ব্যবহার করলাম। তঁার বাক্য, শব্দ চয়ন, ঘটনার উপস্থাপনা হাবিজাবি বেড়ানোর লেখাগুলোর মতো নয়। রস অনুধাবনের জন্য পাঠককে প্রস্তত থাকতে হয়। বই ধরে ধরে উল্লেখের পরিসর এখানে নেই। প্রয়োজনও নেই। সেসব লেখার নাম সবারই জানা। বেড়ানোকে কী ভাবে গল্প করে তোলা যায় তা দেখিয়ে দিয়েছিলেন নবনীতা। সেই বেড়ানোয় অ্যাডভেঞ্চারকে নতুন মাত্রা দিয়েছিল রসবোধ। আমি কী ভাবে ট্রাকে চেপে বেড়াতে গিয়েছিলাম সেটা বড় কথা নয়, সে কথা কীভাবে পাঠকদের রসে সিঞ্চিত করে বলেছি— সেটাই বড় কথা। বাঙালীর ভ্রমণসাহিত্য অতি সমৃদ্ধ। দিক্‌পালরা লিখেছেন। নবনীতা সেই ধারা গৌরবের সঙ্গে রক্ষা করেছেন।
শেষ করব কিছুদিন আগে পড়া তাঁর একটি ব্যক্তিগত রচনা দিয়ে। তিনি হাসতে হাসতে যা লিখেছেন, এককথায় তার মানে দঁাড়ায়, ক্যানসার হয়েছে তো কী?‌ লড়ে যাব। আর যদি হেরেই বা যাই, দেখা তো কম হল না। সামনে দঁাড়িয়ে থাকা মৃত্যুকে যিনি ‘‌ফেস’‌ করতে পারেন, তিনি কখনও চলে যান না।
নবনীতা দেবসেন কোথাও যাননি। তিনি আমার মতো নগন্য পাঠক এবং অতি নগন্য লেখকের সঙ্গে আছেন, চিরকাল থাকবেন।

পুনশ্চঃ নবনীতা দেবসেনকে এখানে কোথাও ‘‌নবনীতাদি’‌ বলিনি। কোথাও বলিনি, উনি আমার লেখা পড়ে কতবার ফোন করেছেন। বলিনি কীভাবে ‘‌সই’‌এর বির্তক সভায় দু’‌দুবার আমাকে ঘাড় ধরে নিয়ে গিয়ে বলিয়েছিলেন। বলিনি, কীভাবে এক পত্রিকায় আমার বইয়ের সমালোচনা করতে গিয়ে নবনীতা দেবসেনের উদাহরণ তুলে পণ্ডিত সমালোচক আমাকে তাচ্ছল্যি করেছিলেন। সেই সমালোচনা পরে তিনি আমায় ফোন করে কতটা হেসেছিলেন সে কথাও বলিনি।

নবনীতাদি, আমাকে মার্জনা করও।

জনপ্রিয়

Back To Top