তক্কোগুলি, চরিতাবলী ও আখ্যানসমূহ  কল্লোল • গুরুচণ্ডা৯ • ১৫০ টাকা- যারা এককালে নকশালবাড়ির পথে হেঁটেছে, তাদের অধিকাংশের চলায়–বলায় একমেটে ছবি ফুটে ওঠে.‌.‌.‌কিছু বৃদ্ধ লব্জ আর বাসি প্রতীকের ব্যবহারে পঞ্চাশ বছর আগের ঘি খাবার গল্প। সেইজন্যই, ওই মায়াডাকের পথিক কল্লোল দাশগুপ্ত থুড়ি কল্লোল, যে নাকি এর আগে ‘কারাগার বধ্যভূমি ও স্মৃতিকথকতা’ লিখেছে এবং মান্যতা পেয়েছে, তার বইমেলার বই ‘তক্কোগুলি, চরিতাবলী ও আখ্যানসমূহ’তে কী বলে কৌতূহল ছিল।
১৯২ পাতার স্মৃতিকাহনটি পড়বার পর আমি এর ভূমিকা লেখক অনিরুদ্ধ লাহিড়ীর সঙ্গে একমত যে, আর যা–ই হোক, কল্লোল নকশালজিয়ায় (নকশালবাড়ি + নস্টালজিয়া) আক্রান্ত কোনও একঘেয়ে রোদনপ্রবণ চরিত্র নয়, ওর দেখার চোখ এখনও নবীন। বলার ভঙ্গি এখনও সরস।
এ বইয়ের সময়কাল ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৫। জেল থেকে পাড়ায় ফেরবার পর আবার নতুন করে সব কিছু শুরু করবার বাসনায় কল্লোলদের কেওড়াতলা–কালীঘাটের আড্ডা, তার নানান রঙ্গকথা, দল জুটিয়ে চড়ুইভাতি–ফুটবল–গান–নাটক–কবিতা–প্রোগ্রেসিভ পিপলস ফোরাম আর পুরনির্বাচনে লড়াই, এ সবই হয়ে উঠেছে বইটির অক্ষরচিত্র।
কুশীলবেরা সব পাড়ারই—বেশিরভাগই মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত এবং কেউ–কেউ নকশালি ভাষায় ‘লুম্পেন প্রলেতারিয়েত’। যেমন ধরা যাক ঝালদার মাঠের পশুপতি, যার কাজ চুরি করা। সে রাত আড়াইটে–তিনটের সময় এক ভদ্রলোকের বাড়ির দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে শোনে, স্বামী–স্ত্রী চেপে ঝগড়া করছে। আধঘণ্টা পরে পশুপতির ধৈর্য টলে গেল। জানালা খুলে— ‘.‌.‌.‌রাতে ঘুমুতে পারোনা, ঝগড়া করো!’ বলেই বারান্দা থেকে এক লাফে রাস্তায়।
কিংবা কোঁকড়া চুল, চওড়া গোঁফ, লম্বা–ছিপছিপে, কিঞ্চিৎ সাব–অলটার্ন বকেয়া। যে নাকি রাত দেড়টার সময় কেওড়াতলার ঠেক থেকে বেরুনো টালমাটাল শক্তি চট্টোপাধ্যায়কেও ছাপিয়ে গিয়েছিল শুধু একটি কথায়। শক্তি কোহল–জড়ানো মন্দ্রকণ্ঠে শেষ করলেন অবনী বাড়ি আছ.‌.‌.‌, সবাই স্তব্ধবাক, শুধু বকেয়া দুঃখিত গলায় বিড়বিড় করল— ‘এতবার ডাকলেন হারামি সাড়াই দিল না!!!’
আর এক চরিত্র মধ্যবিত্ত অনুপ, যার সর্বাঙ্গে জারি ফক্কুড়ি। সেই ৬৯–৭০–এর অবিশ্বাসের দিনে, যখন এ–পাড়া কংগ্রেস তো ও–পাড়া সিপিএম তো সে–পাড়া নকশাল, সে গিয়েছিল মাসির বাড়ি, কসবায়। ফেরার পথে একদল ধরে শুরু করল জেরা— কোথায় থাকিস? কার বাড়ি গেছিলি? কেন? কোন স্কুল?... এর মধ্যেই একজন বলল, সময় নষ্ট না করে দুটো ‘দানা’ খাইয়ে দিতে। ওই ভয় পাবার সময়েও অনুপ খুব ঠান্ডা মাথায়, বিনয়ী গলায় বলেছিল— ‘অত ঝামেলা করবেন কেন, একটু জোরে ধমক দিন এমনিই মরে যাব।’
এমনই নানান বর্ণের চরিত্র নিয়ে যে রামধনু আড্ডা, তারাই একদিন চোয়াল শক্ত করে আদিগঙ্গার পূর্ব–পশ্চিমের দৈনন্দিন মাস্তানির–বোমাবাজি থামিয়ে চেতলা–কালীঘাট পাড়ায় স্থিতি আনে। দিশাহীনতার মধ্যেও তারা পড়াশোনা চালায়— ভূগোল, দর্শন, অর্থনীতি এবং মার্ক্সীয় সাহিত্য। এর মধ্যেই ওরা ১৯৮২–র বিশ্বকাপের উত্তেজনা আপাদমস্তক উপভোগ করে। এরই মধ্যে ওরা চাঁদা তুলে আদিগঙ্গার পাড়ে খুপরি ঘরে থাকা গানের মাস্টারজি সুরেশ বিশ্বাসের গানের ক্যাসেট বের করে। গানের স্টুডিওর যন্ত্রীরা সুরেশবাবুর দরবারি কানাড়ার স্পর্শ পেয়ে মোহিত। তারা ওভারটাইমের টাকা নেয়নি। তার পরে ১৯৮৫–র পুর–নির্বাচনে নেমে পড়া। যদিও আড্ডারই একজন দাঁড়িয়েছে, কিন্তু লড়ছে সবাই নির্দল প্রজ্বলিত মশালের প্রতীকে। ওরা ভোটে সংখ্যায় হেরেছিল এটা ঠিকই, কিন্তু জিতেছিল সহস্র মানুষের ভালবাসা।
এখনকার কলকাতায় বসে অনতি–অতীতের এ সবই রূপকথার মতো লাগে। কিঞ্চিৎ স্মৃতিকাতরতাও তো আনে‌‌!‌‌‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top