কস্তুরী চট্টোপাধ্যায়

 

নবনীতা দেব সেন একটা যুগের নাম কী না, জানি না। নবনীতা দেব সেন চলে যাওয়াতে সাহিত্য জগতের কতটা অপূরণীয় ক্ষতি হল জানি না। শুধু জানি মেয়েদের অসম্ভব একটা ভরসাস্থল টালমাটাল হয়ে গেলো। যাঁর কাছ থেকে মেয়েরা শিখেছিল অমানিশা থেকে জ্যোৎস্নায় ফেরা। মেয়েদের লড়াই করবার সীমানার শেষ বিন্দুস্থলে দিদি দাঁড়িয়ে থাকতেন যেন। সেই সীমানা ছোঁয়ার জেদটা আমাদের হারিয়ে গেলো। আমরা সইরা এন ডি এস কে বলতাম দিদি। আমাদের সই এর হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপে মজা করে দিদি নিজেকে এন ডি এস বলতেন। দিদি আজ চলে গেলেন নিজেকে মুক্ত করে। কিন্তু মুক্ত কি হলেন? ওঁকে আমরা সত্যিই কী মুক্ত করে দিলাম? দিদি নিজের গোটা জীবনটা দিয়ে খুলে দিয়ে গেলেন নারীর পরাধীনতার শেকল। উন্মুক্ত করে দিয়ে গেলেন মেয়েদের চিন্তার বলয়। বলে দিয়ে গেলেন মাথা উঁচু করে মেয়েদের বাঁচার বীজমন্ত্রটা। চলে গেলেন মেয়েদের ঘুরে দাঁড়ানোর চরম শিক্ষাটুকু শিখিয়ে দিয়ে। বলে দিয়ে গেলেন প্রতিবাদ একটা সময়ের নাম মাত্র। একটা গোটা জীবন দিয়ে গেলেন দিদি মেয়েদের শিক্ষায়, উন্মেষে, সচেতনতায়, সংস্কারে, বাঁধন ছেঁড়া স্বাধীনতায়, নতুন বোধ আর চেতনা তৈরিতে।

নবনীতাদির নিজের হাতে তৈরি করা ‘সই’ এর একজন হয়েছি বেশ কয়েক বছর, আট বছর হয়ে গেল। চিনতাম তারও দুই দশক আগে থেকে। ২০০০ সালে ৩০ শে নভেম্বর রাধারানীদেবীর জন্মদিনে ‘সই’ তৈরি হয়েছিল প্রখ্যাত কয়েকজন মহিলা লেখকদের হাত ধরে। মহাশ্বেতা দেবী প্রথম সই এর হেড সই হয়েছিলেন। নবনীতা দেব সেন, বানী বসু, বিজয়া মুখোপাধ্যায়, জয়া মিত্র, সুচিত্রা ভট্টাচার্য, চিত্রা লাহিড়ী, যশোধরা বাগচী ও আরও কিছু মহিলা লেখকদের নিয়ে। বিশেষ করে মেয়েদের লেখবার একটা জায়গা করে দেওয়া, তাদের চিন্তা ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়া, মেয়েদের প্রতিবাদ তুলে ধরা, মেয়েদের আরও বেশি সাহিত্যমনস্ক করে তোলা ‘সই’ এর প্রধান লক্ষ্য ছিল। দিদি বলেছিলেন সই শব্দটির তিনটি অর্থ। সই অর্থাৎ সখী, সই অর্থাৎ সাক্ষর, সই অর্থাৎ সহ্য করি। সই এমন একটা ভরসার জায়গা যেখানে আমরা মেয়েরা, যাঁরা লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত তাঁদের সৃষ্টিশীল চিন্তা ভাবনার একটা আদান প্রদানের জায়গা। সই এর সঙ্গে যুক্ত থেকে আর নবনীতাদির স্নেহের ছায়ায় প্রতিটা দিন আমরা নিজেদের আরও বেশি সমৃদ্ধ করতে পেরেছি। অনেক কিছু জানতে পেরেছি, পড়তে পেরেছি, লিখতে পারছি। কলম পরিণত করার সুযোগ পেয়েছি। কত মানী ও গুণী লেখক এবং মানুষের সংস্পর্শে আসতে পেরেছি শুধু দিদির নিবিড় উৎসাহে। এই মণিমুক্তোর কতটা যে নিতে পেরেছি জানি না। মাথার উপর আমাদের ঈশ্বরী নবনীতাদি ছিলেন কোল ভর্তি স্নেহ, এক আকাশ ভালোবাসা, প্রশ্রয় আর ভরসা নিয়ে। নবনীতাদির পরিকল্পনায়, চিন্তায় ভাবনায় বছরে একবার আমাদের সই উৎসব হতো। সঙ্গে চলতো সইমেলা- বইমেলা। এবারও বিছানায় তুমুল অসুস্থতা নিয়েও আসছে ৩০ সে নভেম্বরের অনুষ্ঠানের সব ব্যবস্থা করে গেছেন তিনি। 
দিদির মতো মুক্তমনা মানুষের কাছাকাছি থাকবার সুযোগ আমাদের কাছে যেন সারা জীবনের অমূল্য জোনাকিসঞ্চয়। দিদির ‘ভালোবাসা’ বাড়িটা ছিল আমাদের বড়ো প্রিয়, প্রাণের কথা দেওয়া নেওয়া আর মনের আরামের জায়গা। যেখানে গেলে দিদির আলোর ছটার মধ্যে আমরা নতুন করে শ্বাস নিতে পারতাম। সারাজীবন সমাজের প্রতিটা স্তরে মেয়েদের প্রতি অত্যাচার ও তার বিরুদ্ধে কলম ধরে দিদি আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেছেন, হারতে নেই। দিদি আমাদের আরও অনেক কিছু শিখিয়েছেন। নিজেকে নতুন করে চেনা, নিজেকে জানা, নিজের মতো করে বাঁচা, নিজের একটা জায়গা বানানো। নিজের সত্বাকে সম্মান করা। প্রতিবাদ করা। লড়াই করা। বঞ্চনার শিকার না হওয়া। বঞ্চিতদের জন্য কলম ধরা। তুমি কেউ নও কিছু নও, এই বোধটা থেকে মেয়েদের সরে আসা। আর কে শেখাবেন এমন করে দিদি ছাড়া? অনাথ নয় সর্বশান্ত হলাম আমরা।
         
চোখ ভিজে যাচ্ছে, জন্মদিনে রুপোর বাটিতে করে ‘ভালোবাসার’ দোতলায় দিদির পায়েস খাওয়ানোর কথা মনে করে। আর একটি কথা, এবারের বই মেলায় একটি কবিতার বই বেরোচ্ছে আমার, বইটি দিদিকে উৎসর্গ করা। দিদি তোমাকে বলা হল না যে...

জনপ্রিয়

Back To Top