দেবাশিস রায়

ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠা ও নবান্ন নাটকের মঞ্চায়নের মধ্যে দিয়ে বাংলা থিয়েটারে অন্যধারার নাট্যচর্চার শুরু। কিংবদন্তিসম নাট্যশিল্পীদের নিয়ত চর্চার মধ্যে দিয়ে থিয়েটারের এই অভিযাত্রার সূচনাপর্বটি পঞ্চাশের দশকে এসে আরও পক্ষবিস্তার করল। বহুরূপী–‌সহ আরও বেশ কয়েকটি নাট্যদল তখন উপহার দিয়ে চলেছে একের পর এক কালজয়ী উদ্দীপনাসৃষ্টিকারী প্রযোজনা। এমনই ফলবতী সময়ে ওই দশকের একেবারে অন্তিম পর্বে ঘটল বাংলা থিয়েটারের সবথেকে আলোচিত ও অভিনন্দিত নাটককারদের মধ্যে একজনের আবির্ভাব। তিনি মনোজ মিত্র। ১৯৫৯ ‘‌মৃত্যুর চোখে জল’‌ নাটক রচনার মধ্যে দিয়েই মনোজ মিত্রের বাংলা থিয়েটারে আগমন। যদিও তার আগে সুন্দরম নাট্যদলে তাঁর দুটি নাটকে অভিনয়ে অংশগ্রহণ ঘটে গেছে। ষাটের দশকে যখন মনোজ মিত্র বাংলা নাটকে তাঁর আসনটি পাকাপোক্ত করে নিচ্ছেন, সেই সময় নাটককার হিসেবে মোহিত চট্টোপাধ্যায় ও বাদল সরকার একেবারে প্রথম সারিতে। এছাড়া উৎপল দত্ত তো আছেনই। কিন্তু এঁদের মধ্যে মনোজ মিত্রই একমাত্র যাঁর নাটক একই সঙ্গে গ্রুপ থিয়েটারে যেমন অভিনীত হয়েছে তেমনই পেশাদার, আধা–‌পেশাদার বা অফিসক্লাব এমনকী পাড়ার থিয়েটারেও মঞ্চাধিকার করে নিয়েছে। গত ষাট বছরে মনোজবাবুর রচিত প্রায় একশো নাটকের মধ্যে বহু নাটকই প্রতিষ্ঠিত দলগুলি নিয়মিত অভিনয় করেছে। তার মধ্যে যেমন রয়েছে ‘‌চাক ভাঙা মধু’‌, ‘‌নরক গুলজার’‌, ‘‌সাজানো বাগান’‌, ‘‌শোভাযাত্রা’‌, ‘‌রাজদর্শন’‌, ‘‌অলকানন্দার পুত্রকন্যা’‌ বা ‘‌কিনু কাহারের থেটার’‌–‌এর মতন সাড়াজাগানো সব নাটক। তেমনই অফিসক্লাব বা শৌখিন নাট্যদলের কেন্দ্রেও রয়েছে মনোজবাবুর রচিত নাটক, যার মধ্যে ‘‌কেনারাম বেচারাম’‌, ‘‌দম্পতি’‌, ‘‌পাহাড়ী বিছে’‌ প্রভৃতির কথা উল্লেখ করতে হবে।
মনোজ মিত্রের নাটক হাসির আড়ালে বেদনাবদ্ধ, রহস্য রোমাঞ্চ রোমান্সে সমর্পিত, আবার কখনও তা মানুষ ও সমাজের সম্পর্কের গভীরে ডুব দিয়েছে, সোচ্চার হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী শোষণের বিরুদ্ধে। এই প্রসঙ্গে নাট্যরসিকদের মনে পড়বে ‘‌চাক ভাঙা মধু’‌ নাটকটির কথা। মাতলা, জটা আর বাদামীর কথালাপের মধ্যে দিয়ে যে নাট্যমুহূর্তগুলি সৃষ্টি করতে থাকেন নাটককার তা চরিত্রগুলোর পারস্পরিক ও পারিবারিক দারিদ্র‌্যের সঙ্কটকে অতিক্রম করে ছুঁয়ে যায় মানবিক অনুভূতিকে। নাটকটি শেষ হয়ে আসার কাহিনীটি অবিশ্বাস্য এক বাঁকে মোড় নেয়। যে বাঁকের আড়ালে ছিল জমি, জোতদার আর কৃষকের তৎকালীন সামাজিক শ্রেণিবিভাগজনিত সঙ্কটের তীব্র রূপ, এই সঙ্কটকে নিয়েই ষাট ও সত্তরের দশক উত্তাল হয়েছিল যে আন্দোলনে, সে আন্দোলনের নাম নকশালবাড়ি আন্দোলন। বাংলা থিয়েটারে ‘‌চাক ভাঙা মধু’‌ সেই আন্দোলনের প্রেক্ষিতে রচিত নাটক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেছে। বিভাস চক্রবর্তী নির্দেশিত ও থিয়েটার ওয়ার্কশপ প্রযোজিত এই নাটকটির মতো আরও দশটি অর্থাৎ মোট এগারোটি নাটক নিয়ে দে’‌জ পাবলিশিং প্রকাশ করেছে শ্রেষ্ঠ নাটক একাদশ। শ্রেষ্ঠত্ব বিচারের দায়িত্বটি নিয়েছেন নাটককার স্বয়ং। এগারোটি নাটকের তালিকাটি তিনিই নির্বাচন করেছেন। এই গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত নাটকগুলোর মধ্যে ‘‌সাজানো বাগান’‌, ‘‌অলকানন্দার পুত্রকন্যা’‌, ‘‌রাজদর্শন’‌, ‘‌চাক ভাঙা মধু’‌, ‘‌নরক গুলজার’‌ ও ‘‌কিনু কাহারের থেটার’‌–‌এর কথা আলাদা করে উল্লেখ করতে হবে। গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত নাটকগুলো প্রতিষ্ঠিত নাট্যদলগুলো দ্বারা অভিনীত হয়েছে। প্রতিটি নাটকের আগে নাটক রচনার প্রেক্ষাপটটি একটি নিবন্ধের মাধ্যমে প্রকাশ বা প্রথম অভিনয় সংক্রান্ত খুঁটিনাটি তথ্য ও শিল্পীতালিকার সংযোজন এই সঙ্কলনে একটি আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। তবে এই সঙ্কলনে ১৯৯২–‌এর পরে রচিত কোনও নাটক অন্তর্ভুক্ত হয়নি। অথচ তার পরে রচিত নাটকের সংখ্যা তিরিশেরও বেশি। নাটককার কি ওই দীর্ঘ তালিকা থেকে কোনও নাটককেই সেরার শিরোপায় ভূষিত করতে চাননি?‌ এমন প্রশ্ন থেকেই যায়। এছাড়া অন্তর্ভুক্ত নাটকগুলো রচনাক্রম অনুসারে সাজানো নয়। যেটি হলে নিবিষ্ট পাঠক নাটককারের যাত্রাপথটি আবিষ্কারের এক অন্য স্বাদ পেতে পারতেন। তবে মুদ্রণের যত্ন ও পারিপাট্য বেশ নজরে পড়ে। প্রচ্ছদটিও সুন্দর। গ্রন্থটি নাট্যরসিকজনের কাছে একটি সংগ্রহযোগ্য গ্রন্থ হয়ে উঠবে, এমন আশা করাই যায়। ■
শ্রেষ্ঠ নাটক একাদশ • মনোজ মিত্র •
দে’‌জ পাবলিশিং • ৬৫০ টাকা‌

জনপ্রিয়

Back To Top