মৌসুমী বিলকিস: হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে গেল!‌ জ্যোতিষ বাবা–‌মায়েদের বশীকরণ পদ্ধতি, তন্ত্রমন্ত্র বা যে কোনও দুর্ভোগ দূর করার বিবরণ পড়ে সচেতন পাঠক না হেসে পারবেন না। অবিবাহিতা কীভাবে পাবে স্বামী? নিদান, ‘অবিবাহিতা মেয়েরা প্রতিদিন রাত্রে শোয়ার আগে অল্প জলে চুটকি লবণ দিয়ে খেলে তার দেখাশোনা চলার সময় একজন আদর্শ স্বামী পাওয়ার সুযোগ ঘটে যাবে, যার জন্য সে দীর্ঘদিন ধরে চিন্তা করছিল এবং স্বপ্ন দেখছিল।’
‘অবিবাহিতা’–‌র পর ‘মেয়েরা’ শব্দটি অপ্রয়োজনীয় কিনা কে জানে! সমকালকে ধরতে গিয়ে লেখক অজস্র বিজ্ঞাপনের যেসব নমুনা হাজির করেছেন, তার মর্মবস্তু ও বানান নিঃসন্দেহে বাঙালিকে আত্মঘাতী হতে উৎসাহিত করবে। লেখকও পত্রপত্রিকার পাতায় পাতায় এসব বিজ্ঞাপনের বানান নিয়ে মজা করেছেন। জ্যোতিষ বাবা–‌মায়েদের নিদানের পাল্লায় পড়ে বেচারা কাকগুলোর অবস্থা সঙ্গীন। কাকের জিভ, কলিজা, পালক বা আস্ত কাককেই পুড়িয়ে ফেলে তার ছাই ছাড়া তো স্ত্রীকে বশ করা যায় না দেখলাম!‌ তাই ভাবছি, শ্রীমান কাক্কেশ্বরকুল ভীষণ সঙ্কটে। লেখক দেখিয়েছেন, সংবাদপত্রে একদিকে জ্যোতিষ বাবা–‌মায়েদের রমরমা বিজ্ঞাপন, যারা বাঙালির
ঘরে–‌বাইরের সমস্ত সমস্যার সমাধান নিয়ে হাজির, অন্যদিকে রোজই বধূহত্যা, নির্যাতন, খুন–‌জখমের খবরে ভর্তি কাগজের পাতা। সক্কাল সক্কাল সেই পাতাতেই চুমুক দিচ্ছে বাঙালি। তার ওপর নতুন ট্রেন্ড স্বামীহত্যা। কিছুদিন আগে খবরে দেখলাম, এই ‘ট্রেন্ড’ নিয়ে পুলিস অফিসাররাও তাজ্জব বনে যাচ্ছেন। এত বশীকরণ, সমস্যা সমাধানের হরেক উপায় সত্ত্বেও সমাধান হচ্ছে কি? না। তাই লেখক চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছেন সূত্রগুলো। প্রাইভেট গোয়েন্দা ব্যবসাও চলছে রমরমিয়ে।
শুধু জ্যোতিষ বাবা–‌মায়েরাই নয়, বাঙালিকে ‘লাইফ স্টাইল’ শেখাচ্ছে জনপ্রিয় দৈনিক পত্রপত্রিকাগুলোও, এমনকি দিচ্ছে  প্রেমে পড়া ও প্রেম বোঝার টিপ্‌সও। সকৌতুক তার বিস্তারিত নমুনাও হাজির করেছেন লেখক। তিনি মেপে নিচ্ছেন বাঙালি প্রেমেরও স্বরূপ। উপস্থাপনা করছেন পাত্রপাত্রীর বয়স অনুযায়ী বটতলার বইয়ের এসএমএস সম্ভার। তুলে ধরছেন দৈনিকে পাত্রপাত্রী বিজ্ঞাপনের রগড়। শেষমেশ দেখা যাচ্ছে— প্রেম নেই। পরকীয়া সামলাতে স্বামী, স্ত্রী, সন্তান, প্রেমিক, প্রেমিকা হত্যা চলছে। চলছে আত্মহত্যা। নিজের সন্তানকেও রেহাই দিচ্ছে না মা। লিলিথের মিথ ফিরছে বাঙালির ঘরে। বাঙালি–‌জীবনে রমণীর রূপ উন্মোচন করছেন লেখক। পীড়িত পুরুষদের কথাও বলছেন। একথা বলতেও ভুলছেন না, গৃহ–‌হিংসার শিকার হয় আজও বেশিরকমভাবে মেয়েরাই। অথচ পরকীয়াও আমাদের ‘ঐতিহ্য’। সে বিষয়েও লেখক পড়ে নিচ্ছেন কিছু দৈনিকের উত্তর সম্পাদকীয়, চিঠি। জেনে নিতে চাইছেন, ‘অন্য ধর্মের’ পরকীয়া সম্পর্কিত কাহিনীও। কোরানে উল্লিখিত জোলেখা বিবি ও তাঁকে নিয়ে অসাধারণ কাব্যকথা এ প্রসঙ্গে মনে ভাসে।
সংবাদপত্র, পঞ্জিকা, আধুনিক বটতলার বই— সবই লেখকের স্ক্যানারের নীচে। পাঠক বিহ্বল হয়ে আবিষ্কার করেন, ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া বাঙালি–‌জীবন। অথচ এরকম হওয়ারই কি কথা ছিল? সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজারও চেষ্টা করেছেন লেখক, স্মরণ করেছেন অশোক মিত্রকেও। গ্রন্থটিতে আছে আটটি নিবন্ধ। শীঘ্রপতন থেকে হোক চুম্বন প্রতিবাদ— সমসাময়িক বাঙালি কিস্‌সা কিছুই বাদ পড়েনি। বাঙালি জীবনের অন্ধকার দিকটিতে আলো ফেলার চেষ্টা অব্যাহত। বইটি পড়তে পড়তে ‘ভালো বাঙালির’ ইমেজ কালো হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনার ভয় থাকে। সেই ভয় এড়িয়ে বইটি পড়তে হবে। তবে পাঠরস আরও জমবে।
বশীকরণ কি শুধু জ্যোতিষীদের একচেটিয়া? মিডিয়া থেকে ব্যবসায়ী সবাই এই বিদ্যায় পারদর্শী। লেখক মনে করিয়ে দিচ্ছেন তাই, ‘...ঠিক করি এটাই যে, কীভাবে ওই সব ‘সাধারণ মানুষ’কে বশে রাখতে হবে। ‘সাধারণ মানুষ’ বশে না থাকলে টিআরপি বাড়বে না। মালের বিক্রিও বাড়বে না।’(৩৪৯ পাতা)। লেখকের পরিকল্পনায় প্রচ্ছদটি দৃষ্টিনন্দন এবং বিষয় অনুযায়ী অর্থবহ। বইয়ের গেটআপও সুন্দর, খুব স্বল্প বানানবিভ্রাট বাদ দিলে।
পরিশেষে উল্লেখ্য, পীড়িত পুরুষ সম্পর্কিত উদ্ধৃতিগুলো পড়ে মনে হল, ব্যাপারটা ‘পুরুষ বনাম নারী’, যা কবিগানের এখনও এক জনপ্রিয় বিষয় এবং দুই প্রতিপক্ষই হেব্বি স্ট্রং যুক্তি নিয়ে হাজির। কিন্তু পুরুষতন্ত্র এমনই গভীর যা সমাজের নারীরাই বয়ে নিয়ে বেড়ায়। তার মধ্যে মিশে থাকে আমাদের সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতার শিকড়। সবকিছু থাকে মিলেমিশেই। নারী–‌পুরুষ সবার মধ্যেই তাই পাওয়া যায় ‘একনায়ক’ হওয়ার প্রবণতা। নায়িকাদের ‘কালো’ দিকের পাশাপাশি যে কোনও পেশা ও মিডিয়ার মেয়েদের অন্ধকার দিকগুলোয় আলো পড়লে (উল্লেখ্য কিছু রিপোর্ট, সমীক্ষা) পাঠকের একটা সুষম আহার হতেই পারত।
উদ্ধৃতিগুলো এত ছোট পয়েন্টে ছাপা যে পড়তে সমস্যা হয়। আর বিজ্ঞাপনগুলো হুবহু থাকা, তন্ত্রমন্ত্রগুলোর বিস্তারিত উল্লেখ ও বটতলা–‌বইয়ের তালিকা ও ছবি জ্যোতিষ–‌আক্রান্তদের বেশ সুবিধাই করবে বলে আশঙ্কা হয়। যে যার উদ্দেশ্য খোঁজে তো। সেক্ষেত্রে লেখকের উদ্দেশ্য উল্টো মাত্রা পাবে। ভালো বাঙালির কালোত্বও বাড়বে।‌‌ ■
 

জনপ্রিয়

Back To Top