সুধীর দত্ত: কবিতাসংগ্রহ (‌প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড)‌ 
• জসীম উদ্‌দীন • সম্পাদনা পুলক চন্দ • 
দে’‌জ পাবলিশিং • প্রতিটি খণ্ড ৭৫০ টাকা
জসীম উদ্‌দীন • জাহিরুল হাসান • 
পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি • ৮০ টাকা

যদিও কবিতার মতো সূক্ষ্মতম ভাষাশিল্পের  উৎকর্ষ বিচারের ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতা কোনও গজকাঠি হতে পারে না, এ কথা অনস্বীকার্য, আর কোনও বাঙালি কবি জসীম উদ্‌দীনের মতো পল্পীবাংলার সাধারণ মানুষের হৃদয়াবেগকে এমনভাবে স্পর্শ করতে পারেনি তাঁর কবিয়ালি ও কথকের ঢঙে। জানি না ‘‌পল্লীকবি’‌— এই শিরোপাটি তাঁর কবিতাকে এক বিশিষ্টতায় চিহ্নিত করলেও, কবিকে এক ক্ষুদ্র পরিসরে সীমিত করেছে কি না!‌ তবে এ তো সত্য যে, শুধু উপাদান–‌উপকরণেই নয়, তাঁর কবিতার মন্থর চলন, স্বর, একরৈখিকতা ও মসৃণ বাক্‌ভঙ্গি গ্রামীণ। তাঁর আঙ্গিক–‌প্রকরণে কোনও দ্রোহের দুঃসাহস নেই, শ্লেষ ও তির্যকতা নেই, এক কথায় নেই কোনও উন্মেষশালিনী বুদ্ধির উদ্ভাবনী বিদ্যুৎ–‌চমক। তবুও আমাদের বিস্ময়ের ঘোর কাটে না, কীভাবে এই অনাগরিক ও প্রথামনস্ক কবি তিরিশের পশ্চিম–‌মুখী এলিট বাঙালির কবিদের সারিতে ঠাঁই করে নিতে পেরেছিলেন নিজের?‌ এটা ঠিক, রবীন্দ্রনাথের সস্নেহ সমর্থন এবং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকার ও ‘‌পূর্ববঙ্গ গীতিকা’‌র বিপুল সম্পদসংগ্রাহক দীনেশচন্দ্র সেনের পৃষ্ঠপোষকতা তাঁর প্রতি তৎকালীন বিভিন্ন পত্র–‌পত্রিকার সম্পাদকদের আগ্রহী করে তুলেছিল। তবে এ কথা মনে রাখতে হবে, শুধু মুরুব্বির জোরে কেউ কখনও জসীম উদ্‌দীন হতে পারেন না। মাত্র ১৬ বছর বয়সে ‘‌কবর’‌ কবিতা দিয়ে শুরু হয়েছিল যে–যাত্রা ৭১ বছর পর্যন্ত দীর্ঘ সাধনায় ‘‌নক্‌শীকাঁথার মাঠ’‌, ‘‌সোজন বাদিয়ার ঘাট’‌ ইত্যাদি আখ্যান কাব্যের মাধ্যমে, পূর্ববর্তী শতাধিক বর্ষের পুরনো বাংলা লোককবিতার উত্তরাধিকারী এই কবি অনায়াসে জিতে নিয়েছিলেন লিরিক–‌বিধৌত বিস্তীর্ণ পাঠক–‌চিত্ত, কথা কাহিনী ও গীতলতায়।
সম্প্রতি পুলক চন্দের সম্পাদনায় দে’‌জ পাবলিশিং থেকে একটি মূল্যবান ভূমিকা–সহ দু’‌খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে জসীম উদ্‌দীনের ‘‌কবিতাসংগ্রহ’‌। এতে সঙ্কলিত হয়েছে ২০টি কাব্যগ্রন্থ, তাঁর অনুবাদ–‌কবিতা ও গানের বই। সম্পাদকের নিষ্ঠা, তাঁর বিপুল শ্রম ও স্বেদচিহ্ন বহন করছে বিভিন্ন সংস্করণের পাঠ–‌পর্যালোচনার ভিত্তিতে তৈরি করা গ্রন্থপাঠ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘‌পাঠান্তর ও পাঠভেদ’‌ সংক্রান্ত সবিস্তার তথ্য ও সমকালীন পত্র–‌পত্রিকায় প্রকাশিত আলোচনা। সমগ্রটির তন্নিষ্ঠ পাঠে, আমার বিশ্বাস, উপকৃত হবেন একালের কবি ও পাঠক। নতুনভাবে আবিষ্কৃত হবে জসীম উদ্‌দীনের কবিকৃতির জাদুদণ্ডটি যার ছোঁয়ায় তিনি তাঁর সমসাময়িক অব্যবহিত অনুজ ও বর্তমান প্রজন্মের তরুণ কবিদের জন্য সেরকম কোনও তড়িৎ–‌চুম্বকীয় বলয় তৈরি করতে সক্ষম না হলেও নিশ্চিতভাবে বেঁচে আছেন সুর ও আখ্যান–‌প্রিয় সাধারণ মানুষের হৃদয়ে। তাঁদের কানে আজও বাজে ‘‌নকশীকাঁথা’‌য় বোনা এক আশ্চর্য রূপকথা, যেখানে রাজকুমার–‌রাজকুমারী নেই, আছে ‘‌কাঁচাধানের পাতার মতো কবি মুখের মায়া’‌মাখা ‌‘‌শাওন মাসের তমাল তরুর মতো’‌ উজ্জ্বল রূপাই নামের এক চাষীর ছেলে আর পাশের গাঁয়ের সাজু নাম্নী এক চাষীর মেয়ে যাকে দেখলে মনে হয় ‘‌তুলসীতলায় প্রদীপ যেন জ্বলছে সাঁঝের বেলা’‌।
তবুও এ–কথা স্বীকার না করে উপায় নেই, আমাদের জসীম উদ্‌দীন–চর্চা সম্পূর্ণতা পায় না যদি না আমার পরিচয় ঘটে বিভিন্ন সামাজিক অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক ঘাত–‌প্রতিঘাতের ভিতর দিয়ে তাঁর বেড়ে ওঠার ইতিহাসের সঙ্গে। আমরা কৃতজ্ঞ পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি আমাদের উপহার দিয়েছেন জাহিরুল হাসান–‌কৃত কবি জসীম উদ্‌দীনের একটি তথ্যনিষ্ঠ জীবনীগ্রন্থ— ‘‌জসীম উদ্‌দীন’‌। যাতে ধরা আছে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তাঁর জীবনের কালানুক্রমিক ঘটনার অনুপুঙ্খ। বইটির রচনায় যদিও লেখক কবি জসীম উদ্‌দীন সম্পর্কিত বিভিন্ন বই, পত্র–‌পত্রিকা ও স্মারক গ্রন্থগুলির সাহায্য গ্রহণ করেছেন এবং এই সংগ্রহকালে নানা পরস্পরবিরোধী তথ্যের উল্লেখ করেও তিনি নির্ভর করেছেন তাঁর নিজের বুদ্ধি ও বিচারের ওপর। আর এ বিষয়ে তাঁর সবচেয়ে বড় সহায়ক স্বয়ং জসীম উদ্‌দীনের লেখা এবং তন্নিহিত সঙ্কেত। শুধু কবির বেড়ে ওঠাই নয়, সেই সময়কে আশ্চর্য নিপুণতায় তুলে এনেছেন লেখক। বইটি নিঃসন্দেহে সংগ্রহ ও সংরক্ষণযোগ্য।‌‌‌‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top