স্বদেশ ভট্টাচার্য: আঞ্চলিক ইতিহাসচর্চাই তো একটা জাতি, দেশের অতীত ঐতিহ্য, সংস্কৃতি অনুসন্ধানের আসল বুনিয়াদ। অজানা ইতিহাসের শিকড়ের সন্ধান পেতে গেলে যেতে হবে আলো, বাতাস, ছায়াঘেরা মাটির কাছাকাছি। বসিরহাটে বসে সেই অসাধ্য সাধন করে ফেলেছেন পান্নালাল মল্লিক। ওঁর সুসম্পাদনায় ‘‌বসিরহাট মহকুমার ইতিকথা’‌ শুধু বসিরহাট নয় উত্তর ২৪ পরগনা, সুন্দরবনের অনেক অজানা তথ্যে আলোকপাত করবে। এই অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান, লৌকিক প্রথা, দেবদেবী, জীবিকা, রাজনীতি, সাহিত্য, গণআন্দোলন, বিশিষ্ট মানুষদের জীবন নিয়ে ৫০িট প্রবন্ধে সমৃদ্ধ ৬০৮ পাতার বই। আকারে, বৈভবে আঞ্চলিক ইতিহাসের এক বিরলতম সঙ্কলন। আঞ্চলিক ইতিহাসের গ্রন্থের ‘‌পঞ্চম সংস্করণ’‌ হয়েছে কিনা বলা কঠিন।
সুন্দরবনের কৃষক আন্দোলন, লোকসংস্কৃতি, সেখানকার দেবদেবী, মউলিদের জীবনযাপন, তিতুমীরের সংগ্রাম, তেভাগার লড়াই, খাদ্য আন্দোলনকে তথ্যসমৃদ্ধ দলিল করে তোলায় বসিরহাট মহকুমার ইতিকথা সফল। এখানকার মাটি রত্নগর্ভা। ‘‌বঙ্গীয় শব্দকোষ’‌ প্রণেতা হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় এই মাটিরই সন্তান। বাদুড়িয়ার যশাইকাটি গ্রামে আজও অনাদরে পড়ে হরিচরণের ভিটে। তাঁকে নিয়ে লিখেছেন নাতি দুর্গেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, অন্যটি শৈলেন্দ্রনাথ কাবাসীর ‘‌পণ্ডিত হরিচরণ’‌। আরেক পণ্ডিতপ্রবর ড.‌ মুহম্মদ শহিদুল্লাহের জীবনের অকথিত দিক তুলে ধরেছেন ছাত্র ড.‌ হরনাথ পাল। হরনাথ লিখছেন, ‘‌১৯৫০ সালে ১০ ফেব্রুয়ারি, শুক্রবার কোনওরকম প্ররোচনা ছাড়াই ঢাকায় হঠাৎ  হিন্দুনিধন যজ্ঞ শুরু হয়ে যায়। সেই মত্ততার শিকার হয়ে ১১ ফেব্রুয়ারি সকালে আহত অবস্থায় রক্তাক্ত দেহে আমি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হই।.‌.‌.‌সেই মুহূর্তে বরাভয় মুর্তিতে আমার শিয়রে এসে দাঁড়ালেন, সুফী সাধক ডক্টর মুহম্মদ শহিদুল্লাহ’‌। )‌
সম্পাদক অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে তিন রায়চৌধুরি কবি ভুজঙ্গধর, রবীন্দ্রনাথের অন্যতম সচিব সুধাকান্ত, নিশিকান্তকে সঙ্কলনে স্থান দিয়েছেন বসিরহাটের মানুষ হিসেবে। তিতুমীর, বিপ্লবী দীনেশ মজুমদার, এম এন রায়,  তেভাগার লড়াই, সুন্দরবনের কৃষকবিদ্রোহ নিয়ে ইতিকথা সন্ধান দেবে অনেক অজানার। ’‌৬৬–‌র খাদ্য আন্দোলনে শহিদ নুরুল ইসলামের ওপর নিবন্ধগুলির যে বর্ণনা এখানে পান্নালাল মল্লিক স্থান দিয়েছেন তা ভবিষ্যতে গবেষক ছাত্রদের হাতে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হবে। বলতে গেলে সেই সময়কার বাংলার গণ আন্দোলনের ‘‌আঁখো দেখা হাল’‌ ’‌৬৬–‌র খাদ্য আন্দোলনের ইতিহাসকে চেনাবে।
অতি অল্প হলেও আক্ষেপ জন্মাতে পারে নিবিষ্ট পাঠকের। কেননা সূচিবিন্যাস যথাযথ নয়। প্রত্ন, ব্যক্তিত্ব, সাহিত্য, সংস্কৃতি, লোকগাথা ইত্যাদি নিয়ে প্রবন্ধগুলি যেন এলোমেলো সাজানো। কয়েকটি নিবন্ধে লেখক নিজের কথা বেশি বলতে গিয়ে আঞ্চলিক ইতিহাসে এতটাই ফাঁকফোকর রেখেছেন যে, ইতিহাস অন্বেষণ ব্যাহতই হয়েছে। অবশ্য তাতেও এ বইয়ের গুরুত্ব একটুকুও কমে না। লেখকের শ্রম ও উদ্যোগকে কুর্নিশ জানাতেই হয়। ■
বসিরহাট মহকুমার ইতিকথা • সম্পাদনা‌ পান্নালাল মল্লিক ‌
স্বদেশ • ৩০০ টাকা 

জনপ্রিয়

Back To Top