প্রভাতকুমার দাস: ১৯২৭ সালের ২৬ আগস্ট কলকাতা বেতার চালু হওয়ার পর তার অগ্রগতি ও বিস্তার বিষয়ে সংরক্ষণযোগ্য নানা ধরনের তথ্যসমৃদ্ধ নিবন্ধ, স্মৃতিকথা–‌নির্ভর বহু ধরনের লেখার সংগ্রহ তিন খণ্ডে ইতিপূর্বে সঙ্কলন করেছেন আকাশবাণী ও দূরদর্শনের জনপ্রিয় প্রবীণ সাংবাদিক ভবেশ দাশ। সেই শ্রমসাধ্য কাজ পাঠক সমাজের সমাদৃত হয়েছে। তারই অনুবর্তী আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সঙ্কলন তিনি সম্পাদনা করেছেন ‘‌কাকে বলে বেতারনাট্য’‌— অত্যন্ত শোভনসুন্দর মুদ্রণে দু‌শো আট পৃষ্ঠার সেই বইটি পড়ার সুযোগ পেলে বেতার নাট্য বিষয়ে অনুরক্ত ব্যক্তি মাত্রেই খুশি হবেন। তার চেয়েও নাট্যতীর্থ যাঁরা, বেতার নাটকের বিবর্তনের ইতিহাস এবং সেই মাধ্যমটিতে কাজ করায় উৎসাহী— তাঁদের কাছে এরকম একটি বইয়ের প্রয়োজন যে কত সুদূরপ্রসারী তা অভিজ্ঞজন নিশ্চয় বুঝবেন। 
প্রতিষ্ঠার পর কলকাতা বেতার— প্রায় মাসতিনেকের ব্যবধানে সম্প্রচারকে নানা দিক থেকে জনপ্রিয় করার লক্ষ্যে যে–‌কটি অনুষ্ঠানের প্রবর্তনায় মনোযোগী হয়েছিলেন— তার মধ্যে অন্যতম হল নাটক। প্রথমে নাট্যধর্মী অনুষ্ঠান দিয়ে শুরু, তারপর তখনকার জনপ্রিয় মঞ্চনাটক রিলে করে সরাসরি প্রচার করার ব্যবস্থা হয়। ক্রমে ‘‌শ্রোতাদের বেতার–‌অভিমুখী মন’‌ কীভাবে সন্তুষ্ট রাখা যায় সেজন্য যাঁরা নিরন্তর সচেষ্ট হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে অবশ্য উল্লেখ্য তিনজন— বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, বাণীকুমার, শ্রীধর ভট্টাচার্য— তাঁরাই ‘‌বেতার নাটকের ভিতটা গড়ে গিয়েছিলেন উত্তরকালের জন্য।’‌ সঙ্গতভাবেই আলোচ্য সঙ্কলন শুরু হয়েছে— জীবিতকালেই কিংবদন্তি বীরেন্দ্রকৃষ্ণের অভিজ্ঞতা‌ঋদ্ধ একটি মূল্যবান প্রবন্ধ দিয়ে। সেটি এ–‌বইয়ের শ্রেষ্ঠতম উদ্ধার বলেই আমার ধারণা। 
সম্পাদক তাঁর ‘‌প্রাসঙ্গিক’‌ শীর্ষক সুখপাঠ্য প্রতিবেদনে লিখেছেন:‌ ‘‌ধ্বনি আর বাণী, যতি আর গতি— এই চারটিই তো বেতার নাটকে প্রাণশক্তি।’‌ অত্যন্ত সহজসরল ভাষায় তিনি তাঁর লেখায় এই ‘‌প্রাণশক্তি’‌র ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করেছেন। গ্রন্থের মূল অংশটি পূর্বোক্ত রচনা ছাড়া আরও বারোটি লেখা সঙ্কলিত হয়েছে— তাঁরা সকলেই বেতার নাটক জগতে সুবিদিত—প্রযোজক, নাট্যকার, অভিনেতা–‌অভিনেত্রী, অথবা কোনও না কোনও ভাবে দীর্ঘকাল যুক্ত থেকেছেন। সঙ্কলিত লেখাগুলির বেশিরভাগ বিলুপ্ত বেতার জগৎ থেকে সংগৃহীত–‌তত্ত্ব ও তথ্য এবং অঙ্গিকারগত বৈশিষ্ট্য সেসব লেখায় উপজীব্য হয়েছে— লিখেছেন:‌ সুধীর সরকার, পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, অজিতকুমার ঘোষ, সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়, মনোজ মিত্র, সূর্য সরকার এবং জগন্নাথ বসু। বাকিগুলি আমন্ত্রিত, রচয়িতা বৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়, শাঁওলী মিত্র, সৌমিত্র বসু, সৌম্যদেব বসু। 
পরিশিষ্টে দু‌জনের দু‌টি বেতার–‌নাটক ছাড়াও, শ্যামল ঘোষের লেখায় বিধৃত হয়েছে জীবনানন্দ দাশের নিরুপম যাত্রা–‌র প্রযোজনার  অভিজ্ঞতা। এসব লেখার জন্য তো বটেই— মুদ্রিত সাদা–‌কালোর ছবিগুলির সংযুক্তিতে এ–‌বই যথার্থ অর্থে আকর্ষণীয় হওয়ায়, ‘‌‌বেতার নাট্যে উৎসাহী সাধারণ পাঠক, শিক্ষার্থী ও বেতার–‌ভাবুকরা’‌ অবশ্যই তৃপ্ত ও সমৃদ্ধ হবেন বলেই আমার বিশ্বাস। ■
 কাকে বলে বেতার নাট্য • সম্পাদনা ভবেশ দাশ • পরম্পরা • ৩০০ টাকা ‌

জনপ্রিয়

Back To Top