শম্পা ভট্টাচার্য: অপরেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের লেখা ‘‌রঙ্গালয়ে ত্রিশ বৎসর’‌ একটি স্বাদু গ্রন্থ। তিরিশটি নাটক ও একটি অমূল্য নাট্যস্মৃতির স্রষ্টা অপরেশচন্দ্র থিয়েটার মহলে অনেকটাই অবজ্ঞাত। মঞ্চের প্রয়োজনে তাঁর নাটক লেখা। অভিনেতা অমরেন্দ্রনাথ দত্ত ও শিশির ভাদুড়ীর মাঝে সময়ের যোগসূত্র রচেছেন তিনি। বাংলার নাট্যশালার ইতিহাসে তাঁর পরিচালিত আর্ট থিয়েটারের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা আছে। বাংলা ভাষায় প্রথম রান্নার বইয়ের লেখক বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায়ের পুত্র অপরেশচন্দ্র। নাট্যকার, নট, পরিচালক— স্টার থিয়েটারের এই অভিনেতা অমৃতলাল মিত্রের কাছে অভিনয় শেখেন, তা ছাড়া গিরিশচন্দ্র তাঁর গুরু। অপরেশচন্দ্রের নাটকগুলির মধ্যে ‘‌কর্ণার্জুন’‌ যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। রাজনৈতিক বিশ্বাসে স্বরাজপন্থী ও দেশবন্ধুর অনুগামী অপরেশচন্দ্রের রামকৃষ্ণ মিশনের সঙ্গে বরাবর বন্ধুত্বের সম্পর্ক। আলোচ্য বইটি ১৮৯৪–‌১৯২৪ সাল পর্যন্ত নাট্যস্মৃতি। বইটি তাঁর আত্মচরিত নয়। তাঁর জীবন ও কর্মের কোনও বিস্তৃত তালিকা এখানে প্রশ্রয় পায়নি। বরং অপরেশচন্দ্রের নাট্যবোধের সঙ্গে থিয়েটারি আলোচনার পূর্ণ পরিচয় এখানে খুঁজে পাওয়া যাবে।
১৩৩২ বঙ্গাব্দে জ্যৈষ্ঠ থেকে ‘‌রূপ ও রঙ্গ’‌ পত্রিকায় ‘‌রঙ্গালয়ে ত্রিশ বৎসর’‌ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকা উঠে গেলে দ্বিতীয় খণ্ড হিসেবে ‘‌নবযুগ’‌ পত্রিকায় এটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হওয়ার পর আরও কিছু সংযোজন–সহ ১৩৪০ বঙ্গাব্দে তা বই আকারে প্রকাশিত। বন্ধু হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের অনুরোধে মুখে মুখে এই বই রচনা করেন অপরেশচন্দ্র। এই বইটির দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশিত হয়নি। প্যাপিরাস থেকে এর আরেকটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯১ সালে স্বপন মজুমদারের সম্পাদনায়। প্যাপিরাস–সংস্করণে অপরেশচন্দ্র রচিত বইয়ের এবং গ্রন্থাকারে অসঙ্কলিত অন্যান্য রচনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তালিকা ছিল। সেটি কারিগর–সংস্করণে বাদ গেছে। কিন্তু এই ধরনের তালিকা অপরেশচন্দ্রের জীবনব্যাপী কাজকর্মের মূল্যায়নের পক্ষে জরুরি। কারিগর–প্রকাশিত আলোচ্য বইটির সম্পাদক বারিদবরণ ঘোষ। তিনি অধ্যাপক, খ্যাতনামা গবেষক, নানা পুরস্কারে ভূষিত। তাঁর বইয়ের সংখ্যা ৬১, সম্পাদিত বই ১৭১। আলোচ্য বইটিতে সম্পাদক যে টীকা–টিপ্পনী সংযোজনা করেছেন তা তাঁর খ্যাতির প্রতি সুবিচার আরোপ করে।
আলোচ্য গ্রন্থটি রঙ্গমঞ্চের বিশ্বস্ত ইতিকথা। বাংলায় নাটক রচনা, নাট্যভাবনা, মঞ্চ নির্দেশনা ও মঞ্চ স্থাপত্যের বিদগ্ধ বিশ্লেষণ আছে এখানে। ১৪ নম্বর অধ্যায়ে আছে রঙ্গমঞ্চে বঙ্কিমের অপ্রতিহত প্রভাবের পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা। পৌরাণিক নাটকের একঘেয়ে ধাঁচে অভিনয় করে ক্লান্ত শিল্পীরা বঙ্কিমের উপন্যাসের নাট্যরূপ–এ অভিনয়ে স্বাদ বদল করলেন। লেখকের ভাষায়, ‘‌বঙ্কিমচন্দ্র যেমন বাংলা সাহিত্যে রথ ও পথ দুই–‌ই প্রস্তুত করিয়াছিলেন, গিরিশচন্দ্রকেও তেমনি এই বাংলাদেশে নট, নাটক ও দর্শক— এই তিনকেই প্রস্তুত করিতে হইয়াছিল।’‌ গিরিশচন্দ্রের ‘‌সিরাজদ্দৌলা’‌র পরে দ্বিজেন্দ্রলালের ঐতিহাসিক নাটক ব্যতীত ইতিহাসভিত্তিক নাটকের নামে সঙ্কীর্ণ জাতীয়তাবাদের যে বন্যা বয়ে গেছে তার কুফল সম্বন্ধে গ্রন্থকার পাঠকদের অবহিত করেছেন। নাট্যগুরু মণীন্দ্রচন্দ্র গুপ্তকে উৎসর্গীকৃত এই বইটিতে লেখক গিরিশচন্দ্রের কাছে বাংলা ও বাঙালি সমাজ যে কতটা ঋণী তা আলোচনা করেছেন। এখানে আছে গিরিশচন্দ্রের সুরধর্মী স্বর প্রক্ষেপণের কথা। অভিনেতা কোনও থিয়েটার রিভিউ করলে অভিনয়ের আর এক দিক উন্মোচিত হয়ে পাঠক মনশ্চক্ষে দেখতে থাকেন অতীত অভিনয়ের ছবি— তার উদাহরণ আছে এ বইয়ে যোগেশের ভূমিকায় গিরিশচন্দ্রের অভিনয় বর্ণনায়— ‘‌আকস্মিক দুর্ঘটনার প্রহারে হতচেতন হইয়া অবসাদে মোহে যেন সে তাহার সব ডুবাইয়া দিয়াছে;‌ অনুভব করিবার শক্তি বা হৃদয় তাহার নাই।’‌ আবার বাংলা থিয়েটারের প্রথম যুগে আবহাওয়া যে কতটা কদর্য ও কলুষিত ছিল তার সুস্পষ্ট আভাসও পাওয়া যাবে এই বইয়ে। থিয়েটারের মানুষ হওয়া সত্ত্বেও অত্যন্ত নিরপেক্ষভাবে তিনি রঙ্গশালার ঘর ও বাহিরের যে নিপুণ বিশ্লেষণ করেছেন তা তাঁর থিয়েটারি পাণ্ডিত্য ও সংযমের পরিচয়। সুব্রত চৌধুরির প্রচ্ছদ এই বইয়ের পক্ষে যথাযথ। ■
রঙ্গালয়ে ত্রিশ বৎসর • অপরেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়
সম্পাদনা বারিদবরণ ঘোষ • কারিগর • ৩১০ টাকা‌

জনপ্রিয়

Back To Top