বিজয় দত্ত: মহাপণ্ডিত রাহুল সংকৃত্যায়ন তাঁর ‘‌ভবঘুরে শাস্ত্র’‌ গ্রন্থে বলেছেন’‌, ভবঘুরে সমাজের বোঝা হয়ে থাকেন না। তিনি পৃথিবী থেকে যতটা নেবেন, তার শতগুণ তাঁকে ফিরিয়ে দিতে হবে।’‌ ভাস্কর দাসের ‘‌এক চামচ বিদেশ’‌ পড়তে পড়তে, কেন জানি, বারেবারেই মনে আসছিল সেই চিরপথিকের কথা।
অথচ সময় আলাদা, পরিপ্রেক্ষিতে আলাদা, পরিবেশ এবং পরিপ্রশ্নও আলাদা। ভাস্কর, অন্তত অভিধানিক অর্থে, ভবঘুরে নন। তিনি ব্যস্ত চিকিৎসক, দায়িত্বশীল পিতা, আজকের ইঁদুর দৌড় সমাজের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তবু তারই মধ্যে, তারই ফাঁকে ভিতরের কেন্দ্রতিগ শক্তি তাঁকে ছুটিয়ে বেড়ায়, প্রকাশের তাড়নায় কলম ছোটায় আর আমরা হই যারপরনাই উপকৃত। তাঁর আশ্চর্য ছবিলেখা আমাদের সামনে পরতে পরতে মেলে ধরে পৃথিবীর কত রূপ, সাতরঙা জীবনের অনিঃশেষ বাহার।
বাংলা সাহিত্যের ভ্রমণ উপধারাটি ইদানীং কিঞ্চিৎ পথভ্রষ্ট। বাজার অর্থনীতির দাপটে ফাস্ট–‌ফুডিও মেদ যদিবা হয় হৃদয় ছোঁয়া প্রায়শই হচ্ছে না। ভ্রমণ–‌বিজ্ঞাপনে যেমন দেখা যায়— কোথায় যাইতে হইবে, কী কী দেখিতে হইবে, কী খাইতে হইবে, কী কিনিতে হইবে, কখন ঘুমাইতে হইবে, কেমন স্বপ্ন দেখিতে হইবে— এই রকম আর কী। সবই বলে দেওয়া আছে, একান্তই দর্জি তৈরি। কোনও জিজ্ঞাসা, অনুসন্ধান নেই, কোনও অনুভবও নেই। শুধু টিক মারিয়া যাও, দেখিয়াছি, দেখিয়াছি। অবস্থা এমনই যে ‘‌মহাপ্রস্থানের পথে’‌–‌র প্রকাশক হিমালয় ভ্রমণ গাইড ছাপিয়ে বাজার ধরছেন।
এই রকম একটা দূর‌নিয়ন্ত্রিত যান্ত্রিক বাতাবরণের দমচাপা অবস্থায় ভাস্কর হাট করে খুলে দিলেন মনের অনেকগুলি জানালা। চরৈবেতি, চরৈবেতি। আমিও স্পর্শ করে এলাম পৃথিবীর কত, কত বিস্ময়।
যেমন, আমেরিকার লাবক শহরের গল্পটি। একান্তই পারিবারিক প্রয়োজনে ভাস্করের সেখানে যাওয়া। তা, সে গল্প আমি শুনব কেন?‌ কিন্তু, ওই যে কথায় আছে না— কথা কইতে জানলে হয়, কথা ষোল ধারায় বয়।
সেই কথা আর কী। শুধু কথার পিঠে কথা বসিয়ে, উপযুক্ত মিষ্টি কথার অনর্গল জোগান দিয়ে আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেলেন লেখক।
যেমন, ইতালির বোলোনা–‌র গল্প শুরুই হল হলিউড লস এঞ্জেলেস থেকে। গল্পে নকশিকথার এমনই ঠাসবুনোট যে, এক নিঃশ্বাসে দৌড়তে হল এই মহাদেশ থেকে ওই মহাদেশে। কিংবা বলা যায় রেকিয়াভিকের কথা। অনেক তথ্য দেওয়া হয়েছে কিন্তু একেবারেই তথ্যভারাক্রান্ত নয়। কোথাও আটকায় না, অত্যন্ত মোলায়েম ভঙ্গিতে আমার ভিতরে ঢুকে যায়। যেন চোখের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গিয়া। এখানেই ভাস্করের মুনশিয়ানা। শেষে পৌঁছে বলতেই হয়, ভাস্কর গল্পটা বলতে জানে। শাবাশ।
তবু, পাঠকের চাহিদা এত উঁচু তারে বাঁধা হয়ে গেল বলেই বোধহয়, দু–‌‌একটি অকিঞ্চিৎকর কথা।
চেনা অচেনা চিন— লেখাটি কি একটু অবহেলিত?‌ নাকি এই পর্বটি কনডাকটেড টুর–‌এর ফল?‌ মাও মসোলিয়ামে সাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ— তথ্যটি ঠিক নয়। কোনও বিশেষ কারণে কোনও দিন বন্ধ থাকতেই পারে। ২০০৯ সালের মে মাসে আড়াই ঘণ্টা লাইন দিয়ে আমি সে দেহ দেখেছি।
প্রকাশক ‘‌পরম্পরা’‌কে ধন্যবাদ। সব কিছুই ভাল, বেশ ভাল মানের। তবু বলি, প্রচ্ছদটি— পরম্পরা পেলাম না। ওষ্ঠরঞ্জনী–‌সহ ম্যানিকিন শোভিত প্রচ্ছদ দেখে মনে হতেই পারে, সিলিকন ভ্যালির এনআরআই জীবনের দীর্ঘশ্বাস নিয়ে উপন্যাস নাকি!‌‌ রক্তমাংসের মানুষ নিয়ে হৃদয় ছোঁয়া যে আখ্যান তার প্রচ্ছদ একটু মানবিক করা যেত না?‌ আর, নামটিও আমার না–‌পসন্দ। এক আঁজলা বিদেশ হলেও মেনে নেওয়া যেত। কিন্তু এক চামচ— ম্যানিকিনের মতো এত প্রাণহীন— দুঃখিত, আমি সত্যিই দুঃখিত। ■
‌এক চামচ বিদেশ • ভাস্কর দাস • পরম্পরা প্রকাশ • ২৭৫ টাকা

জনপ্রিয়

Back To Top