সমীরকুমার ঘোষ: শারীরিক রোগের মতো মানসিক রোগও সাধারণ ঘটনা। জ্বর–‌সর্দি হলে যেমন চিকিৎসকের কাছে যাই। তেমনই মানসিক সমস্যা, উদ্বেগ, হতাশাতেও মানসিক রোগের চিকিৎসকের কাছে যাওয়া দরকার। মনোবিদরা বলেন, ঠিক সময়ে চিকিৎসা না করলে বহু শারীরিক রোগ যেমন ক্রনিক হয়ে যায়, তেমনই মানসিক রোগও ক্রনিক হয়ে উঠতে পারে। তখন তার নিরাময় কঠিন হয়ে যায়। মুশকিল হল, সচেতনতার অভাবে আমরা মানসিক সমস্যাকে চিনতে পারি না বা বলা ভাল চিনতে চাই না। উল্টে অনেকেই মানসিক অসুস্থতায় চিকিৎসকের কাছে যেতে বললে, ‘‌আমি কি পাগল নাকি!‌’ বলে বিরূপ হয়ে ওঠেন। তাই এ নিয়ে সচেতনতা খুব জরুরি। আর এই জরুরি কাজটাই শুরু করেছে ‘‌মানুষের মন’‌ পত্রিকাটি। সেই পঞ্চাশের দশকে বিশিষ্ট মনোরোগ চিকিৎসক ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় ‘‌মানব মন’‌ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন। ওঁরই যোগ্য উত্তরসূরি ডাঃ গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়। ওঁরা প্রকাশ করছেন মন বিষয়ক ষাণ্মাসিক পত্রিকা ‘‌মানুষের মন’‌। ভারতে মনোবিজ্ঞানের পুরোধাপুরুষ গিরীন্দ্রশেখর বসুর একটি লেখার পুনর্মুদ্রণ দিয়ে যথাযথভাবেই শুরু হয়েছে। এছাড়াও জয়ন্তী বসুর ‘‌ভারতবর্ষে মনস্তত্ত্ব চর্চা:‌ একটি চিরন্তন যাত্রা’‌, ডাঃ দেবাশিস ভট্টাচার্যের ‘‌মনের পরিচয়পত্র’‌, শঙ্করকুমার নাথের ‘‌কলকাতার ডুলুন্ডা লুনাটিক এসাইলাম’ ইত্যাদি লেখা যেমন তথ্যবহুল, তেমনই কাজের। বৈচিত্র্য আনতে মন নিয়ে কবিতাও আছে। গৌতম মাঝির প্রচ্ছদ বিষয়বস্তুর সঙ্গে মানানসই। এই পত্রিকাটির বহুল প্রচার জরুরি।
মানুষের মন বড় জটিল জিনিস। তাকে চেনা যেমন কঠিন, বাগ মানানো আরও কঠিন। শঙ্করাচার্য বলতেন, যে নিজের মনকে জয় করতে পারে, সে জগৎকে জয় করতে পারে। কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রগতি, গতিময় জটজটিল জীবনযাত্রার ধাক্কায় আমরা বেসামাল। শারীরিক রোগও জন্ম দেয় বহু মনোরোগের। কেমন সেই রোগের চেহারা, কী তার প্রকৃতি, কীভাবে মোকাবিলা ইত্যাদি নিয়ে সরসিজ সেনগুপ্ত লিখেছেন বই ‘অসুখ যখন মনে’। ভীষণ জরুরি উদ্যোগ। সরসিজবাবু পেশায় মনোবিদ নন, উল্টে তিনি নিজেই প্যারানয়েড স্কিজোফ্রেনিয়া ও অবসাদ রোগের শিকার হয়ে প্রায় সাড়ে তিন দশক কাটিয়েছেন। আর সেই রোগকে জয় করে চাকরিবাকরি থেকে স্বাভাবিক জীবনযাপনও করেছেন। মনের জোর থাকলে, সচেতনতা থাকলে যে মনোরোগকেও জয় করা যায়, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ তিনি। এই সব করতে গিয়েই মনোরোগকে আরও কাছ থেকে দেখেছেন, জেনেছেন। সেই অভিজ্ঞতার কথাই লিপিবদ্ধ করেছেন ‘‌অসুখ যখন মনে’‌ বইটিতে। সরসিজের লেখার ভঙ্গিটি ভারি চমৎকার। অনেকটা গল্পের মতো করে তিনি নানা ধরনের সমস্যাকে তুলে ধরেছেন। তার মধ্যে মিশিয়েছেন সরসতাকেও। যেমন, কম্পিউটার নিয়ে কাজ করতে করতে ছোটবেলার বন্ধু বোধিসত্বের অবসেশন এবং তা থেকে মানসিক সঙ্কট নিয়ে লেখা ‘‌গোঁপ গিয়েছে চুরি’‌। বন্ধুর সন্দেহ হয়েছিল তার সমস্ত পাসওয়ার্ড চুরি গিয়েছে। এইরকম ‘‌বুলাদি আর কিং খান’‌, ‘‌মদ খাওয়া বড় দায়, জাত রাখার কি উপায়’‌, ‘‌কবিতার গুঁতো’‌, ‘‌তিন নারী, তরবারি’‌, ‘‌কে বেশি পাগল’‌ ইত্যাদি প্রতিটি লেখা শুধু সুখপাঠ্যই নয়, সচেতন করার উত্তম মাধ্যমও বটে। বইটি ঝকঝকে ছাপা। ভুল খুব কম। এই বইয়ের বহুল প্রচার প্রয়োজন। অন্তত মনোরোগ বিষয়ে আমাদের মতো অসচেতন মানুষদের জন্য। 

জনপ্রিয়

Back To Top