ভোলানাথ ঘড়ই: তিনি একাধারে শিক্ষাবিদ, সমাজসংস্কারক, নারী–‌আন্দোলনের নেতা এবং সাহিত্যিক। কখনও অন্ধকারের সঙ্গে লড়াই করতে যাননি। জানতেন অন্ধকার মানে আলোর অভাব। তাই সমাজে আলো জ্বালানোর চেষ্টা করেছেন। সবকিছুকে ছাপিয়ে তিনি একজন মানুষ। তাঁকে কি আদর্শ নারীবাদী বলা যায়?‌ আজকের নারীবাদীরা বলতেই পারেন,ধর্মের গণ্ডিতেই থাকা ঘোমটা দেওয়া এই মহিয়সী নারী কতটা নারীবাদী ছিলেন?‌ উত্তরের প্রয়োজন নেই। কারণ আজ যাঁরা নারীবাদ, নারীমুক্তি নিয়ে আন্দোলন করছেন, বেগম রোকেয়া না থাকলে সেটুকু শুরুও করতে পারতেন না।
ঊনবিংশ শতাব্দীর পর্দাপ্রথায় আটকে থাকা যে সময়টাতে তিনি নারীদের শিক্ষা এবং মুক্তির জন্য লড়াই করেছেন, আজকের এই একবিংশ শতকেও আমরা সেই সাহস দেখাতে পারি কি?‌ নিজে শিক্ষিত হয়েছেন এবং সমাজের অন্যান্য নারীর জন্য শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে লড়াই করে গেছেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি একজন নারীর চোখে সেই দৃষ্টি তুলে দিতে চেয়েছিলেন, যা দিয়ে নারী নিজেকে বুঝবে, বিবেচনা করবে। মজার ব্যাপার সকাল বিকেল নিজেকে একজন আধুনিক নারীবাদী হিসেবে প্রমাণ করতে ব্যস্ত এমন অনেক নারীই আছেন, যাঁরা রোকেয়া পড়েননি। যথেষ্ট অনুধাবন করতে পারেননি বিদ্যাসাগর, রামমোহনকেও। ফলে আজকের নারীবাদ তাঁদের কারও কারও কাছে হয়ে উঠেছে নারীমুক্তি নয় নিছক পুরুষবিদ্বেষ। 
বিশেষ করে এঁদের কথা ভেবেই বিশেষভাবে ধন্যবাদ সম্পাদক গৌতম রায়কে ও প্রকাশক দে’‌জ-কে। দুই মলাটে সুদৃশ্য মোড়কে হাজির করেছেন রোকেয়া রচনাসমগ্র। উনিশ শতকের নবজাগরণের ইতিহাসে বেগম রোকেয়া একজন উজ্জ্বলতম জোতিষ্ক।  যদিও  তৎকালীন পর্দাপ্রথার কারণে প্রথাগতশিক্ষার সুযোগ তাঁর ছিল না। শিক্ষানুরাগী ও উদার স্বামী সৈয়দ শাখাওয়াত হোসেনের সৌজন্যে সুযোগ ছিল সাহিত্যপাঠের। এখান থেকে একজন মহিলা নিজের উদ্যমেই কঠিন অধ্যবসায়ে স্বশিক্ষিত হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর গোটা জীবনকে তিনভাগে ভাগ করা যায়। সাহিত্যচর্চা, নারীশিক্ষা বিস্তার ও সমাজসংস্কার। তবে কি সাহিত্য, কি শিক্ষাবিস্তার, কি সমাজসংস্কার— সর্বত্রই তাঁর মূল সুর ছিল নারীমুক্তি। তাঁর নারীমুক্তি আসলে মানবমুক্তি। বিশ্বাস করতেন, সমাজের দুটি পা। একটি পুরুষ, অন্যটি নারী। একটি দুর্বল হলে সমাজ সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না, এগোতে পারবে না। এ জন্যই দরকার নারীমুক্তি, নারীশিক্ষা, নারীস্বাধীনতা। আর এই সুরেই বাঁধা মতিচূর, পদ্মরাগ, অবরোধবাসিনী থেকে কবিতাগুচ্ছ। এই সুরেই বাঁধা তাঁর সাহিত্য, শিক্ষাপ্রসারের উদ্যোগ এবং সামাজিক সংস্কারমুখী প্রবন্ধ।
ঘোমটা পরা ধর্মবিশ্বাসী বেগম রোকেয়ার নারীবাদ নিয়ে যে নাস্তিকেরা নাক সিঁটকোবেন, তাঁদের অবশ্যই তাঁর অবরোধ‌বাসিনী পড়া উচিত। সে সময় বিশেষ করে মুসলমান সমাজের মেয়েরা পর্দাপ্রথায় কতটা লাঞ্ছিত ছিল, তার একেবারে জলজ্যান্ত উদাহরণ দিয়েছেন বেগম রোকেয়া‌। যার ভূমিকায় লেখা ছিল ‘‌পাক অবরোধ-‌বাসিনীদের লাঞ্ছনার ইতিহাস ইতিপূর্বে আর কেহ লিখেন নাই।’‌ পর পর ৪৭টি এমন লাঞ্ছনার ইতিহাস পড়ে আজকের মেয়েরা আঁতকে উঠবেন, কিন্তু এক নিঃশ্বাসে না পড়ে থাকতে পারবেন না। এই চিত্রটি দেখার পর বিচার করতে হবে, রোকেয়ার শিক্ষাসংস্কার ও সামাজিক সংস্কারের কথা। নারীশিক্ষায় উদ্যোগী রোকেয়া কেমন পরিবেশ পেয়েছিলেন?‌ বঙ্গীয় নারীশিক্ষা সমিতির একটি সেমিনারে তিনি বলছেন, এ দেশে প্রত্যেক ২০০ বালিকার মধ্যে একজনও অক্ষর চেনে না। দশ হাজারের মধ্যে একজনও প্রকৃত শিক্ষিতা নেই। বঙ্গদেশেই তিন কোটি মুসলমানের বাস। মুসলমান ধর্মে বিশ্বাসী হয়েও স্ত্রীশিক্ষার প্রসার ঘটাতে গিয়ে বিদ্যাসাগর, রামমোহনের মতোই স্বধর্মীয়দের সরাসরি আক্রমণের মুখোমুখি হতে হয়েছিল রোকেয়াকে। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। গোঁড়া মুসলমান, স্ত্রীশিক্ষায় বিরোধী যাঁরা, তাঁদের সঙ্গে তর্কে রোকেয়া বলছেন, ‘‌মুসলিম ভ্রাতৃগণ যতদিন আমাদের দুঃখসুখের প্রতি মনোযোগ না করিবেন, ততদিন তাহাদের কথাও ভারতের অপর ২২ কোটি লোকে শুনিবে না। আর যতদিন ওই ২২ কোটি লোকে ৮ কোটি মুসলমানকে উপেক্ষা করিবে, ততদিন পর্যন্ত তাহাদের রোদনও ব্রিটিশ গভর্ণমেন্টের কর্ণকুহরে প্রবেশ করিবে না।’‌ তিনি বিশ্বাস করতেন, মুসলমানদের যাবতীয় দৈন্য-‌দুর্দশার একমাত্র কারণ স্ত্রীশিক্ষায় ঔদাস্য। 
নারীশিক্ষায় পুরুষের উদ্যোগ যে কতটা জরুরি, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ রোকেয়া নিজে। তাঁর স্বামী বিদ্যানুরাগী শাখাওয়াত হোসেন তখন ওড়িশায় কর্মরত। মূলত তাঁরই উদ্যোগে বেগম রোকেয়া শুধু যে ইংরেজি ভাষা রপ্ত করেছিলেন তাই নয়। ‘সুলতানাজ ড্রিম’ নামে একটি বইও লিখে ফেলেন ইংরেজিতে। সম্ভবত এটিই বাংলা ভাষায় কোনও বাঙালির লেখা প্রথম কল্পবিজ্ঞানের কাহিনি। নারীপুরুষের সম্মিলিত সহযোগিতায় যে নিজের এই উত্তরণ, তা কখনও ভোলেননি রোকেয়া। আর সে জন্যই কখনও ধর্মের সঙ্গে, সমাজের সঙ্গে বা পুরুষের সঙ্গে সরাসরি সঙ্ঘর্ষে জড়াননি তিনি। সমাজের অন্ধকারময় জগদ্দল পাথর সরাতে কখনও অতিবিপ্লবীয়ানা কোনও মঙ্গলজনক পথ নয়। তাই নীরবে নারী জাগরণের চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। স্বামীই রেখে গিয়েছিলেন ১০ হাজার টাকা, নারী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য। শুরুতে ভাগলপুরে স্কুল খুলেও চালাতে পারেননি।  কিন্তু হাল ছাড়েননি। চলে আসেন কলকাতায়। ১৯১১ সালে প্রতিষ্ঠা করেন শাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল। আর হ্যাঁ, যেমনটি চেয়েছিলেন তেমনটিই হয়েছে। এই বালিকা বিদ্যালয়ে শুধু মুসলমানেরা পড়ুক, তা চাননি তিনি। সামাজিক অচলায়তনের বিরুদ্ধে এই লড়াইকে তিনি কখনও ধর্মের গণ্ডিতে বাঁধতে চাননি। বিদ্যালয়টির আজকের সাফল্য তাই নিত্য প্রণাম জানায় বেগম রোকেয়াকে, এক অগ্নিশিখাকে।
এই রোকেয়া রচনাসমগ্রর বিশেষত্ব হল, এতে সংযোজিত হয়েছে রোকেয়ার লেখা বিভিন্ন পত্রাবলী এবং ইংরেজি রচনাও। তাঁর অপ্রকাশিত কবিতাও মূল্যমান বাড়িয়েছে এই সঙ্কলনের। ও বাংলায় কিছুটা হলেও এ বাংলায় রোকেয়া-‌রচনা তেমন সুলভ নয়। সে ক্ষেত্রে বঙ্গবাসী ও বঙ্গভাষীর হাতে দে’‌জ-‌এর এক অনন্য উপহার সন্দেহ নেই। ■

জনপ্রিয়

Back To Top