রাজীব ঘোষ: খবরের কাগজের চাকুরের একটা চমৎকার অ্যাডভান্টেজ, দেরি করে ঘুম থেকে ওঠা অ্যালাউড, বাজারেও যথারীতি বেলা কাবার করে। খুব সতর্ক হয়ে থাকতে হয়, না হলেই পচা মাল গছিয়ে দেবে। দামু মুখোপাধ্যায় কসবা বাজারের ‘‌রিজেক্টেড মালের ব্যবসায়ী’‌ ভক্তরামের কথা শুনিয়েছেন, ওইরকম আছে সব বাজারেই। ‘‌কানা বেগুন, ভিতরে দড়ি পাকানো মুলো, পেট ফাঁসা ক্যাপসিকাম, দরকচা মারা টমেটো, বুড়ো আঙুল টনটন করে উঠলেও কিছুতেই লেজ টসকাব না পণ–‌করা শিরা ওঠা ঢ্যাঁটা ঢ্যাঁড়স’‌— সত্যি বলতে কী প্রতিটি গেরস্থের দিনানিপাতের কঠিন পরীক্ষা ফি–সকালে ওই বাজার থেকেই তো শুরু। সারাদিন সবাই তাকে ঠকিয়েই দু ‌পয়সা কামাইয়ের চেষ্টা করে চলেছে, তাই জীবন–বাজাড়ুদের ক্ষেত্রেও ওই ‘‌ক্যাচ দেম ইয়াং’‌ কথাটা খুব খাটে। বাবা–কাকা–জ্যাঠার পেছন পেছন যারা বাজারে ঢুকেছে, তারা কচি থোড় চিনতে শিখেছে, কষা মোচাও চিনতে শিখেছে। আর এক গোত্রের বাজাড়ু টাকার গরম দেখাতে আসেন। গৌরব বিশ্বাস লিখেছেন, ‘‌করলাকে উচ্ছে বলে ভুল করেন, কোনটা তেলাপিয়া, কোনটা লাইলনটিকা সে তালজ্ঞান নেই।’‌ সবে কলেজে ঢুকে সিগারেট খরচা তুলতে বাজার সরকার হয়ে হাতেখড়ি হয় অনেকের, সবজি–মাছ–মাংস কেনার নেশা ধরে যায়। কেনার নেশা, চেনার নেশা। গন্ধলেবুর গায়ে আঁচড় কেটে দেখে নেওয়া, গায়ে শির থাকলে কচি লাউ চিনে নেওয়া, নখের খোঁচা মেরে ‘‌যুবতী’‌ থোড় চেনা। আর এক আমি, স্রেফ নোলার টানে বাজার–পর্যটক। সেদিন হাসনাবাদের লঞ্চঘাট থেকে প্রমাণ সাইজের পাটালি কিনে রেখেছি, বনগাঁর রসগোল্লার ওপর তার রস ছড়িয়ে পরিবেশন করতেই সে কী মৌতাত!‌
এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলা গেল ‌‘‌বাজার ভ্রমণ’‌। এপার বাংলা, ওপার বাংলা ছাড়িয়ে সুদূর নিউ ইয়র্কের বাজারেও মানসভ্রমণ হয়ে গেল। খাদিজা শারমিন হক মাছ চেনালেন, কাতলার পরিপূরক বাফেলো, বোয়ালের বদলি ক্যাট ফিশ খেয়েছি ওদেশেই।
শোল মাছ ওদের দেশে মাড ফিশ, বেলে মাছ স্যান্ড গোবি। জ্যাকসন হাইটস, জ্যামাইকা, কুইন্স–এর বাজার–বৃত্তান্তেই নস্ট্যালজিক হয়ে পড়ি। থার্টি সেকেন্ড লেক্সিংটনে যে ফুলকপির তরকারি আর বেগুনভর্তা খেয়েছি, তা অনির্বচনীয়।
দুই সম্পাদক সামরান হুদা আর সুমেরু মুখোপাধ্যায় দিব্য কাজ করেছেন। আর খাঁটি কথাটি লিখেছেন সুপ্রিয় সেনগুপ্ত। কমার্স তো আছেই, কিন্তু বাজার করা আসলে একটা আর্ট। চালকুমড়ো জুটলে নারকেল চাই, কুচো চিংড়ি জুটলে তার জুটিতে কচি লাউ চাই বইকি। বাজাড়ুরা আসলে ঘটকের মতো রাজযোটক খুঁজে বেড়ান।
শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, প্রফুল্ল রায়, তারাপদ রায়েদের রচনার পুনর্মুদ্রণ ষোলকলা পূর্ণ করেছে, কারণ বাজার ঘিরে সাহিত্য আর দার্শনিকতার মিশেল দিতে ওঁদের মতো ক’‌জনই বা পেরেছেন!‌‌‌‌‌ 

জনপ্রিয়

Back To Top