ঋতম মুখোপাধ্যায়: কবির কলমে সমালোচনামূলক প্রবন্ধের এক নতুন মাত্রা সূচিত করেছিলেন বুদ্ধদেব বসু। রবীন্দ্রনাথের সৃজনশীল সমালোচনা আর প্রমথ চৌধুরীর বিদগ্ধ প্রবন্ধাবলীর পাশে তিরিশের দশকের বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্য–‌সমালোচনা যুক্তিবোধ আর স্পষ্টতায় উজ্জ্বল। সেই ধারার উত্তরজাতক পঞ্চাশের কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের প্রবন্ধাবলী হীরকখণ্ডের মতো দ্যুতিময়, যদিও দীক্ষিত পাঠকের মুখাপেক্ষী। তাঁর প্রবন্ধে মিশে আছে কবির অনুভব এবং বিশ্বসাহিত্যপাঠের মূল্যবান অভিজ্ঞতা। পত্রলেখার প্রথম সংস্করণ (২০১২) নিঃশেষিত হওয়ার পর পাঠকের উদ্যোগে নব সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে ‘রবীন্দ্র–‌আলোকবর্ষে’(২০১৯) প্রবন্ধ ‌সংকলন। পুরো বইটিই অপরিবর্তিতভাবে ছাপা হয়েছে, কেবল শেষে ২০১৫ সালে লেখা ‘একটি নমস্কারে’ নতুন সংযোজন।
বইটির দুটি পর্যায়: ‘তোমারই গান গেয়ে’ পর্যায়ে রয়েছে পূর্বপ্রকাশিত ও বিভিন্ন গ্রন্থে ছড়িয়ে–‌থাকা রবীন্দ্রবিষয়ক এগারোটি প্রবন্ধের সন্নিবেশ আর দ্বিতীয় পর্বের নাম ‘তোমায় নতুন করে পাব বলে’। সেখানে দশটি সাম্প্রতিক প্রবন্ধে অলোকরঞ্জন ইউরোপে রবীন্দ্র–‌‌জন্মের সার্ধশতবর্ষের উদ্‌যাপন এবং তাঁর অনুভব ও সক্রিয় ভূমিকার পরিচয় দিতে চেয়েছেন। তাঁর রবীন্দ্র–‌সমালোচনার প্রতিটি পাঠই নিছক তথ্য বা তত্ত্বসঙ্কুল নয়, বরং তা আমাদের নতুন করে রবীন্দ্রনাথকে পড়তে ও ভাবতে শেখায়।
প্রথম পর্বের লেখাগুলির সঙ্গে অলোকরঞ্জনের অনুরাগী পাঠকদের পরিচয় ছিলই। তবে দুই মলাটে রবীন্দ্র–‌বিষয়ক সেই বীজগর্ভ লেখাগুলি আবারও পড়তে গিয়ে বিস্ময় ও সম্ভ্রম জাগে। কবিতায়, গানে, নাটকে, উপন্যাসে আর সুন্দরের অভ্যর্থনায় এই কবি–‌অধ্যাপকের পাণ্ডিত্য, তুলনামূলক আলোচনার প্রতিভা আর অন্তর্দৃষ্টি বঙ্গদেশের রবীন্দ্র–‌সমালোচনার চিরকালীন সম্পদ। নিরুদ্দেশ যাত্রার অনুষঙ্গে সিন্ধুপারে, ‘শেষলেখা’র ব্যাখ্যায় ইয়ুঙের মনোদর্শন কিংবা অনুবাদ, চিত্রকল্প, রবীন্দ্রচিত্রকলা, আধুনিক কবিদের রবীন্দ্র–‌পরিগ্রহণ এবং জার্মান সাহিত্যের অনায়াস প্রতিতুলনা রয়েছে এই পর্বে। একটু ব্যতিক্রমী লেখার মধ্যে রয়েছে: ‘শব্দের মুক্তি, কবিতার উত্তরাধিকার ও রবীন্দ্রসঙ্গীত’ এবং ‘অস্তরবির রশ্মি–‌আভায়’ প্রবন্ধদুটি। অন্যদিকে, দ্বিতীয় পর্বের কয়েকটি লেখায় স্মৃতিচারণ আর কয়েকটিতে বিভিন্ন আলোচনাচক্রে প্রদত্ত বক্তব্যের ভাবনির্যাস রয়েছে। ‘আলোকবর্ষের দায়’ এবং ‘বাঁশির ধারেই একটু আলো’ রচনাদুটি এই দ্বিতীয় অংশের ভাবনির্যাস বলা চলে। ‘গীতাঞ্জলি’–‌র কবিরূপে পরিচিত রবীন্দ্রনাথ ইউরোপের চোখে যেন ধর্মগুরু, এই ভ্রান্ত ধারণাকে বারংবার ভাঙতে চেয়েছেন অলোকরঞ্জন। গীতাঞ্জলি ও বলাকা–‌উত্তর কবিতা আলোচনা করে তিনি লেখেন:‌ ‌‌একটি অধিবেশনে যেই আবৃত্তি করে বসি: ‘কালো অশ্ব অন্তরে যে সারারাত্রি ফেলিছে নিঃশ্বাস/ সে আমার অন্ধ অভিলাষ’‌ (কালো ঘোড়া), একটি অভিনব রবীন্দ্রমুহূর্ত উদ্‌ঘাটিত হয়ে ওঠে। কবিতাটির জার্মান ভাষান্তর দ্রুত সম্পন্ন হয়। এই কবিতা রচনার পিছনে যে সিগমুন্ড ফ্রয়েড এবং ফ্রানৎস্‌ কাফ্‌কার প্রভাব সক্রিয় হয়ে আছে, মনোবিজ্ঞান এবং কথাসাহিত্যের শিবিরের সুদীক্ষিত বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে তা নিয়ে দিনের পর দিন অনুপুঙ্খ বিনিময়ও ঘটে। (আলোকবর্ষের দায়)
এই সময়েরই প্রতিস্পর্ধী, দুর্দমনীয় এক আধুনিক কবিরূপে তিনি রবীন্দ্রনাথকে দেখতে চান। অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদত্ত ‘ম্যান’ (১৯৩৪) বক্তৃতামালার নিরিখে নবজাতকের ‘রাতের গাড়ি’ কবিতা নতুন করে পড়েন তিনি। ডারউইনের উদাহরণ দিয়ে তৈরি হওয়া এই কবিতার জগতে পেয়ে যান আলো–‌অন্ধকারের সমার্থদ্যোতনা। কখনও বা উদ্ভট রসের রবীন্দ্র–‌ছড়ায় খুঁজে পান আবহতত্ত্ববিদ এডোয়ার্ড লরেন্সের দুর্মর প্রজাপতিপনা (Butterfly-effect)। বাঁশির ধারে রণিত হয় একটুখানি আলো, যা আসলে কবির স্বনির্মাণ। পল ভালেরির ‘সত্তার সংকট’–‌ই যে রবীন্দ্রনাথের ‘সভ্যতার সংকট’–‌এর অন্যতম প্রেরণা, তা জেনে আমরা চমকিত হই। এছাড়া ডিকিনসন, ব্রেশট্‌, শান্তিনিকেতনের স্মৃতি, গ্রিক নাট্যচিন্তা, গীতাঞ্জলির ত্রিভাষী সংস্করণ ইত্যাদির প্রেক্ষাপটে জার্মানি–‌প্রবাসী অলোকরঞ্জন রবীন্দ্রনাথকে এই অদ্ভুত আঁধারেও আলোকদূত করে তোলেন। ইকোলজি–‌সচেতন এই সময়ে রবীন্দ্রনাথকেই একুশ শতকের অনন্য স্মরণ ও ভবিষ্যভরসা ভাবতে ভাল লাগে তাঁর। আনুষ্ঠানিক উদ্‌যাপন ছাড়িয়ে এই আধুনিকতম বিশ্বকবির অপরিহার্যতা আমরা টের পাই। ১৯৬১ থেকে ২০১৫— মনস্বী কবির এই রবীন্দ্রায়ণে আমরাও তাঁর সঙ্গী হয়ে মননের মধু পান করি। পরিচ্ছন্ন মুদ্রণ, শোভন প্রচ্ছদ ও বাঁধাইয়ের পরিপাট্যে এই প্রবন্ধ সঙ্কলন আরও একবার অলোকরঞ্জনের মনীষার মুখোমুখি আমাদের দাঁড়াবার সুযোগ করে দেয় বলে পাঠক প্রকাশনাকে অকুণ্ঠ ধন্যবাদ জানাই। ■

জনপ্রিয়

Back To Top