গৌতম রায়: বিশ শতকের মধ্যভাগের অনবদ্য কথাশিল্পী অসীম রায় সম্পর্কে লিখতে গিয়ে কবি বিষ্ণু দে–‌র কাছে সব থেকে বড় হয়ে উঠেছিল তাঁর ‘‌সিরিয়াসনেস’‌। সেই সিরিয়াসনেস–‌এর প্রকাশ সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায়, শব্দচয়নের অহেতুক চাতুর্যের ভেতর দিয়ে নিজের অসামান্য পণ্ডিতি দেখানোর প্রবণতা থেকে মুক্ত থেকে, যেভাবে পরিবেশন করে গেছেন অসীমবাবু, তা পড়লে মনে হয়, হয়তো বা গতরাত্রে লেখক এই গল্পটা শেষ করেছেন।
ষাটের দশকের শেষভাগে বাংলায় একটানা কংগ্রেসের শাসনকালের অবসানে নির্বাচনের ফল বেরোনোর দিন, যেদিন পরিষ্কার হয়ে গেল কংগ্রেস কোনও অবস্থাতেই এ রাজ্যে ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারছে না, সেই প্রেক্ষিতে অসীম রায়ের গল্প ‘‌আরম্ভের রাত’‌, আজকের বাংলা তথা গোটা ভারতের অস্থির রাজনীতির যেন একটা ছায়াচিত্র।
সংসদীয় রাজনীতির ভেতর দিয়ে কেবলমাত্র ক্ষমতা ভোগ করাই কি বামপন্থীদের একমাত্র কর্তব্য? এর বাইরে সমাজবদলের স্বপ্নকে ঘিরে যা কিছু করণীয়, তা শিকেয় তুলে রেখে এখন কোলবালিশে মুখ রেখে ফেসবুক করবার দিন? না, অসীম রায়ের জীবনকালে ফেসবুকের ধারণা তৈরি না হলেও ‘‌আরম্ভের রাত’‌ গল্পে দুই কমিউনিস্ট চরিত্রের কথাবার্তার ভিতর দিয়ে যখন তিনি লেখেন: ‘‌ইলেকশন আর সমাজবাদ প্রতিষ্ঠা এক ব্যাপার নয়। ইলেকশনে বিপ্লব নাই। আছে অনেক রকম ফিকির। সেইসব ফিকির আয়ত্ত না করতে পারলে জেতা যায় না।’‌
অসীম রায় একবার বলেছিলেন:‌ ‘‌আমি চাই, আমার গল্পে নিঃশ্বাস যেন পাঠকের গায়ে এসে লাগে, কখনো যেন ফেকলু মনে না হয়।’ তাঁর ‘‌অনি’‌ গল্পটি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সেরা গল্প হিসেবে পরিগণিত হওয়ার দাবি রাখে। রাজনৈতিক আদর্শবাদের আত্মঘাতী প্রবণতা কীভাবে শোষণহীন সমাজ তৈরির স্বপ্নকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়, শ্রেণীশত্রুর প্রেক্ষিত কীভাবে প্রলম্বিত হয়, দেশভাগের ছিন্নমূল মানুষদের বুকের ব্যথাকে সম্বল করে তাঁদের বাম রাজনীতির দিকে টেনে এনে, তাঁদেরই একটি অংশ কীভাবে পেশাদার রাজনীতিক হয়ে ওঠেন— ষাটের দশকের প্রেক্ষিতে এই ‘‌অনি’‌ গল্পের ভিতর দিয়ে যে ছবি অসীম রায় দেখিয়েছিলেন, দীর্ঘকালের বাম শাসন এবং সেই শাসনের অবসানের পর যে রাজনৈতিক প্রবাহমানতা— তার যেন একটা অমোঘ ভবিষ্যতের ছবি চিত্রিত হয়েছে এই গল্পে।
‘‌ধোঁয়া ধুলো নক্ষত্র’‌–‌তে বিপ্লবের নামে ভাইয়ের বুকে ছুরি বসানো যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয় সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘‌জাগরী’‌ আর তার মুখ্য চরিত্র ‘‌বিলু’‌–‌কে। সতীনাথের উপন্যাস আর অসীমের গল্পের বিশ্বাসের পটভূমি সম্পূর্ণ আলাদা থাকলেও প্রেক্ষিত কিন্তু একই।
বিশ শতকের কুড়ি–‌তিরিশের দশক আর ষাট–‌সত্তরের দশক কিংবা একুশ শতকের প্রথম দ্বিতীয় দশক— সময়ের নিরিখে চরিত্র বদলেছে, চরিত্রের বৈশিষ্ট্যগুলি আবর্তিত হয়েছে নানা ধরনের উত্থান–‌পতনের ভিতর দিয়ে, কিন্তু বাস্তব ঘটনা নির্ভরশীল বিক্ষুব্ধ সময়ের দলিল হিসেবে, এগুলির ঐতিহাসিক অবদান সমাজবিজ্ঞানের ইতিহাস আলোচনার এক–‌একটি আকর।
‘‌শরৎচন্দ্র–‌বাজিতপুর’‌,  ‘‌ঝাড়পোঁছ’‌, ‘‌অবনীভূষণ চাটুজ্জে, সুষমা’‌, ‘‌টকিং মেশিন’‌, ‘‌পদযাত্রা’‌, ‘‌মা–‌ছেলে’‌, ‘‌ট্যাক্সি ড্রাইভার’‌, ‘‌সলবেলো বাড়িওয়ালা বাংলাদেশ’‌— এইসব গল্পের ভিতর দিয়ে একদম সুঁচ ফোটানো ভাষায় সমাজের যে কথাচিত্র অসীম রায় অঙ্কন করে গেছেন, তা সাহিত্যের অঙ্গনকে অতিক্রম করে সমাজবিজ্ঞানের গবেষকদের কাছেও চিন্তার খোরাক হিসেবে বিবেচিত হবে।    
অসীম রায় মার্কসবাদী চিন্তা–‌চেতনায় বিশ্বাসী হয়েও কখনও কোনও দলের গণ্ডিতে নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি। তাই গান্ধীবাদী অন্নদাশঙ্করের প্রতি আমৃত্যু পোষণ করেছিলেন সীমাহীন শ্রদ্ধা। মতাদর্শের তুচ্ছ আচারের মরুবালুরাশিতে বিচারের স্রোতঃপথকে গ্রাস করতে না দেওয়ার এক অব্যর্থ টিপছাপ অসীম রায়ের গল্পসমগ্র। ■
গল্প সমগ্র • অসীম রায় • দেজ • ৫৫০ টাকা‌
(লেখক প্রাবন্ধিক। মুজফ্‌ফর আহমেদ স্মৃতি পুরস্কার প্রাপক)

জনপ্রিয়

Back To Top