অনির্বাণ মজুমদার: ‌শিবরাম কুমারের ‘‌সোনার ফ্রেমে মোহনবাগান’‌ এবং রূপক সাহার ‘‌একাদশে সূর্যোদয়’‌— এই দুটির পর দীর্ঘ কয়েক বছরের একটা ফাঁক ছিল। অবশেষে মোহনবাগানের ইতিহাস নিয়ে তৃতীয় বই সুবীর মুখোপাধ্যায়ের ‘‌সোনায় লেখা ইতিহাসে মোহনবাগান’‌। ফুটবলের ভাষায় বললে, প্রথম দুটি গোলের মতো তৃতীয় গোলটিও অসাধারণ। যোগ্য গোলেই মোহনবাগানের হ্যাটট্রিক সম্পূর্ণ হল।
এই বই পড়তে গিয়ে সবার প্রথমে নজরে এল কলকাতার ফুটবল ময়দানে দল‌‌বদলের একটি ঘটনা। কলকাতা ফুটবলে দলবদল নিয়ে যেসব রোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো এক-একটা ইতিহাস। সেগুলোর প্রত্যেকটি নিয়ে পৃথক থ্রিলার তৈরি হতে পারে। কলকাতা ফুটবলে রোমাঞ্চকর দলবদল বলতে সবার প্রথমে মনে আসে ১৯৫৭ সালে মোহনবাগানের কেম্পিয়াকে ছিনিয়ে নেওয়া। তার বদলা হিসেবে ইস্টবেঙ্গলের শুভাশিস গুহকে তুলে নেওয়া। তিন বছর পরে অরুণ ঘোষের ইস্টবেঙ্গল থেকে মোহনবাগানে আসা এবং পরের বছর সুকুমার সমাজপতিকে ইস্টবেঙ্গলের ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা জানলে আজও গায়ে কাঁটা দেয়। 
কিন্তু ১৯৪১ সালে দলবদলের একটি আপাত–অজানা কাহিনী এই বইয়ে তুলে দিয়েছেন লেখক। সে বছর ইস্টবেঙ্গলে খেলবেন বলে গুয়াহাটি থেকে কলকাতার ট্রেন ধরেন শরৎ দাস। কিন্তু ট্রেন শিয়ালদা স্টেশনে পৌঁছনোর আগেই তাঁকে সরিয়ে নেন মোহনবাগানের রিক্রুটার স্বপন দত্ত। বালিগঞ্জে নিজের বাড়িতে একেবারে তালা বন্ধ করে শরৎকে রাখেন। সেটাই কলকাতা ময়দানে প্রথম ফুটবলার অপহরণ। এই বই না পড়লে অনেকেই হয়ত এই তথ্য জানতে পারতেন না। এরকম নানা অজানা তথ্যে সমৃদ্ধ এই বই। 
মোহনবাগানের ফুটবলের সমৃদ্ধ ইতিহাসের পাশাপাশি এই বই থেকে বড় প্রাপ্তি ক্লাবের ক্রিকেট এবং হকির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। তবে সে–ইতিহাসই বা সংক্ষিপ্ত থাকবে কেন?‌ পরবর্তী সংস্করণে লেখক এই দুটি বিষয় নিয়ে আরও তথ্য উপহার দেবেন, এটাই প্রত্যাশা। 
আলাদা করে উল্লেখ করতেই হবে ১০৮ পাতার পরিসংখ্যান বিভাগের। এক মলাটের মধ্যে মোহনবাগানের ফুটবল, ক্রিকেট এবং ইতিহাসের এরকম বিস্তারিত পরিসংখ্যান অভূতপূর্ব। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় মোহনবাগানের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার বছরগুলির পরিসংখ্যান রয়েছে। তবে যেহেতু আই লিগ বা জাতীয় লিগ এই মুহূর্তে দেশের এক নম্বর ফুটবল প্রতিযোগিতা, তাই এক্ষেত্রে অন্য বছরগুলির পরিসংখ্যান থাকলে ভাল হত।‌ কলকাতার অন্য দুই বড় ক্লাব এবং বিদেশি দলের বিরুদ্ধে মোহনবাগানের ম্যাচের ফলাফলও এই বই থেকে বড় প্রাপ্তি।
খেলাধুলো নিয়ে সাহিত্য, সিনেমা, গবেষণার সুযোগ এবং সৃষ্টি এখন বেড়েছে। এ দেশে অধিকাংশ বায়োপিকই তৈরি হচ্ছে খেলোয়াড়দের নিয়ে। মোহনবাগানের ১৯১১–‌র শিল্ড জয় নিয়েই তৈরি হয়েছে ‘‌এগারো’‌ ছবি। ভারতীয় খেলাধুলো নিয়ে যাঁরা গবেষণা করছেন, ইতিহাস ও তথ্যসমৃদ্ধ এই বই তাঁদের অনেকটাই সাহায্য করবে এবং মোহনবাগান নিয়ে আস্ত একটি বায়োপিক তৈরি করতে অনেক পরিচালককেই উৎসাহিত করবে। 
বেশ কিছু মুদ্রণপ্রমাদ, বানান ভুল ও ব্যাকরণগত ভুল চোখে পড়ল। আশা করা যায়, পরবর্তী সংস্করণে এটুকু ত্রুটি শুধরে নেওয়া হবে।‌ ■
সোনায় লেখা ইতিহাসে মোহনবাগান • সুবীর মুখোপাধ্যায় •         নবজাতক প্রকাশন • ৪৫০ টাকা‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top